শুদ্ধতম জীবন ও কবিতার মানুষ কবি বিমল গুহ

শুক্রবার, ১ নভেম্বর ২০১৯

শ্যামসুন্দর সিকদার

জন্ম-জন্মান্তরে উত্তম স্বজন-প্রাপ্তি এবং সুজন বন্ধুলাভ কয়জনের ভাগ্যে হয়? জন্মান্তরের সাধারণ বিশ্বাস যাদের আছে, তাদের জন্য কবি বিমল গুহকে সামনে দাঁড় করিয়ে এমন প্রশ্ন করতে চাই আনন্দের আতিশয্যে! কারণ তিনি একজন ভাগ্যবান ও সফল মানুষ- যিনি সমৃদ্ধ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ভাষায় ‘কবি হিসেবে সে সমাদৃত, মানুষ হিসেবে সম্মানিত, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত, পারিবারিক জীবনে শ্রদ্ধেয়। তাই বলি- এমন ভাগ্য কয়জনের হয়!

কবি বিমল গুহ সত্তর দশকে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন। হয়তো নিতান্তই শখের বশে। তবে কবিতার প্রতি ভালোবাসার টান ছিল প্রতিদানহীন ও অকৃত্রিম। কিছু প্রাপ্তির আশায় তিনি কবিতা লিখেননি। তাঁর কবিসত্তার মাঝে ছিল স্বতন্ত্র এক পৌরুষদীপ্ত চেতনা, যেখানে তাঁকে কর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো প্রতিরূপ মনে হয়নি। বরং কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা এবং সমকালীন সামাজিক জীবনোপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়ে তিনি মানবতা, দেশপ্রেম, প্রকৃতি ও ন্যায়নীতির ভাবনাকে কবিতায় পরিস্ফুট করেছেন। এজন্য তাঁর সব কবিতাই হয়েছে জীবনঘনিষ্ঠ এবং বাস্তব উপযোগের সমম্বয়ে ঋদ্ধ। তাঁর কবিতার শব্দসংশ্লেষে লক্ষণীয় যে, ভিন্নমাত্রিক দক্ষতায় শব্দ প্রয়োগ, উপমা ব্যবহার, রূপক চিত্রকল্প সৃষ্টি, অনুপ্রাসের দ্যুতি এবং ছন্দ সচেতনতায় তিনি সিদ্ধহস্ত। আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয় যে, তাঁর অধিকাংশ কবিতা আমিত্ব প্রভাবমুক্ত। অর্থাৎ কবিতার বিষয়বস্তুকে তিনি শুধু তাঁর নিজের বলে প্রকাশ করেননি। তাঁর বিষয়বস্তুর মাঝে সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে সর্বজনীনতা। পাঠক যখন তাঁর কবিতা পড়বেন, তখন মনে হবে এটা যেন তার কথাই কবি লিখেছেন। কবির কবিতায় এটাই হলো বড় সার্থকতা।

কবি বিমল গুহ কবিতা ছাড়া সাহিত্যের অন্যান্য বিষয়েও অবদান রেখেছেন। গবেষণা, স¤পাদনা, ভ্রমণগ্রন্থ রচনা এবং বহু প্রবন্ধ রচনা করেছেন তিনি, যা বহুজন প্রশংসিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা চব্বিশটি। এর স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার। কবিতার বিষয়বস্তুতেও নানামাত্রিক সংযোজন ঘটিয়েছেন তিনি। তাঁর কবিতা সম্পর্কে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম লিখেছেন, অহংকার, তোমার শব্দ বেরুবার পর সমাজ ও আত্মসচেতন কবি হিসেবে বিমল গুহ যে পরিচিতি লাভ করেছিলেন, সাঁকো পার হলে খোলাপথ গ্রন্থের মধ্য দিয়ে তা বিস্তৃিত লাভ করবে। বিমল গুহ স্বকালকে এবং স্বকালে নিজের অবস্থানকে খুঁটিয়ে দেখেছেন। প্রেম, যুদ্ধ, অহংকার, পলায়ন- এইসবের মধ্যে বেড়ে ওঠা মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ করেছেন, যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষ আর স্বদেশের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজতে চেয়েছেন। তিনি মানুষের পতনে ব্যথিত হয়েছেন, মানবিক সব সম্পর্কের ভাঙন দেখে শঙ্কিত হয়েছেন। কিন্তু সংকলনের শেষ কবিতা ‘আগামী উৎসব’ একটি বিশ্বাসী-প্রত্যয়কেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন… জীবনকে তিনি বাস্তবতার চোখ দিয়ে দেখেছেন, তার সকল প্রকাশকে মেনে নিয়েছেন; যদিও অমোঘ কোনো নিয়তি হিসেবে নয়। …বিমল গুহ সচেতন কবি, তবে তাঁর সচেতনতা মানবতাভিত্তিক। তিনি মানবতাবাদী কবি। এ কারণে তাঁর কবিতায় যে আবেদন প্রচ্ছন্ন তা সার্বজনীন’।

আমাদের কবি বিমল গুহ অন্য কবিদের মতোই অহিংস মতবাদে বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং সর্বোপরি মানবতাবাদী। এজন্য তিনি বিশ্বমানবতার উদার মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন বর্ণবাদের বিরূদ্ধে। সাদা কালো রঙের সহজ বিভিন্নতায় তিনি মোটেই আস্থাশীল নন, তাঁর আস্থা রক্তলাল ঐক্যের বিনিসুতোর মালায় আবদ্ধ হয়ে মানুষের জন্মগত অভিন্নতায়। সেখানে বর্ণ খুবই ঠুনকো বিষয়, জাতি ও শ্রেণি সেখানে প্রাধান্য পায় না। তাই তিনি কবিতায় সোচ্চার হয়ে সেই মতবাদ প্রচার করেন-

মানুষ- নামের মধ্যে কতদূর এগোলো মানুষ?

শতাব্দীর এই প্রান্তে

আমরা নিমগ্ন শুনি একবিংশ শতকের গান

ব্যস্ততম যৌথ কনসার্ট দিকে দিকে।

হ্যালো, আফ্রিকাবাসী

তিনভাগ জলেধোয়া পৃথিবীর একপ্রান্তে

উত্তর-দক্ষিণ ব্যস্ত একখণ্ড ভূমি

তোমরা কেমন আছো?

(স্বপ্নে জ্বলে শর্তহীন ভোর : বর্ণবাদী পাংশুটে গিঁট)

কবির ভাষ্য মতেও পৃথিবীর যৌথ ঘৃণার দিন কখন আসবে? তার সঠিক দিনক্ষণ জানা নেই বটে, তবে একদিন সে সময় আসবেই- এই বিশ্বাসে বুক বেঁধে কবি ক্রমশ এগিয়ে যান আগামীর পথে। এজন্য এমন নেতৃত্বে তাঁর আস্থা অসীম এবং সে কারণেই তিনি বিশ্বনন্দিত কালনেতা মান্দেলাকে বলেন মুক্ত-বহ্নিশিখা এবং বিংশ শতকে সা¤প্রদায়িক ধারা ভুলে যাবার আহ্বান জানান। আর সেখানে মিল খুঁজে পান বাংলাদেশের একুশেরও-

জোহান্সবার্গে উল্লাসে নরনারী

বর্ণভেদের লজ্জায় নত মাথা

সারা পৃথিবীর বাতাস তখনও ভারী

বর্ণপশুরা চারদিকে ওতপাতা।

(প্রতিবাদী শব্দের মিছিল : মান্দেলা)

তাঁর দেশাত্মবোধের কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা, ভিন্ন ছন্দ, ভিন্ন ধরনের শব্দ-প্রকাশ এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের এক নতুন কবিতা-অস্ত্র। সব কবিই স্বাধীনতার কবিতা লিখেছেন, তবে কবি বিমল গুহের একটি কবিতা একদম আলাদা ঢঙের- যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তীব্রভাবে। যেমন-

কবিতাকে আজ শুইয়ে দিলাম মন্ত্রবাণে ঘাসের কার্পেটে

কবিতারা আজ মন্ত্র পেয়েছে ফিরে তাকাবার

উঠে দাঁড়াবার

কবিতারা আজ নিশানা হয়েছে যুদ্ধে যাবার

ফুঁ-ফুৎকারে গিরিকন্দর পাহাড় পেরিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার

শত্রুর বুকে শত্রুর চোখে মরণবুলেট

ছুড়ে দিয়ে তাকে জব্দ করার।

(প্রতিবাদী শব্দের মিছিল : একাত্তরের কবিতা)

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, এই কবিতায় ভাবপ্রকাশে এবং উপস্থাপনার মুন্সিয়ানায় একেবারেই ব্যতিক্রম পন্থার সফল ব্যবহার করেছেন কবি। শব্দের প্রয়োগ ও ব্যবহারেও নতুনত্ব রয়েছে। কবির এই পারদর্শিতার জন্যই বিশিষ্ট আলোচকগণ তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন একটু অন্যভাবে। কবিতার বিষয়বস্তু ও বর্ণনায় যে বহুমাত্রিকতার স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন তাতে সন্দেহ নেই। এ প্রসঙ্গে একটু ভিন্নধারার যে মূল্যায়ন কবি পেয়েছেন তার প্রমাণস্বরূপ অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষের মন্তব্য এখানে উদ্ধৃত করছি। তিনি কবি বিমল গুহ সম্পর্কে মন্তব্যের একাংশে লিখেছেন- ‘বিমল গুহের কবিতায় ব্যক্তির অনন্বয়চেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটেছে। নগরজীবনের প্রতি আধুনিক মানবচৈতন্যের বে-মানান স্বভাবজাত অনন্বয়, প্রেম বিচ্ছিন্নতা, প্রকৃতি বিযুক্তি, ঈশ্বর বিচ্ছিন্নতা, সমাজছিন্নতা, পরিবার বিচ্ছেদ, আন্তঃমানবিক স¤পর্কবন্ধন বিচ্ছিন্নতা, সত্তা বিচ্ছিন্নতা- এইসব বহুমাত্রিক অনন্বয়বোধে ক্লান্ত পীড়িত ও বিষণœ বিমল গুহের বর্ণমালা। নগরজীবনের প্রেক্ষাপটে বিমল গুহের কবিতায় নিঃসঙ্গতাবোধের ছায়াপাত ঘটেছে’। পরিশেষে বলতে চাই, কবি বিমল গুহ একজন অত্যন্ত সফল ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভরপুর বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ কবি এবং শুদ্ধতম মানুষ- সর্বোপরি দেশপ্রেমিক বাঙালি। গত ২৭ অক্টোবর ছিল কবির জন্মদিন। জন্মদিনের বিনম্র শ্রদ্ধা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj