দোহারের ছদ্মবেশ

শুক্রবার, ১ নভেম্বর ২০১৯

প্রশান্ত মৃধা

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ৯

তার মা তাকে পাঠিয়েছিল, শুনেছে দেবুর দিদিমার শরীরটা বেশি ভালো না, ও যেন একবার দেখে আসে। তাছাড়া দেবুর ইচ্ছা সামনের ধানের সময়ে মামাতো ভাইকে বলবে তার সঙ্গে শ্রীরামকাঠি যাবে কিনা, সেখানে ধানের কারবারের ব্যাপারে খোঁজ নিতে যাবে। যদিও আজকাল এদিককার কেউই আর ওই পুবদিকে কারবার করার কথা ভাবে না। এই উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অর্থাৎ বাঁধাল সাইনবোর্ড আর তালেশ্বরের হাটে আর কচুয়া বাজারেই কারবারিদের বেশি যোগাযোগ। এর কারণ অবশ্যই পুবে বলেশ্বরের দিনকে দিন শুকিয়ে আসা। আর নৌকায় যোগাযোগ তা কমে যাওয়া। নৌকায় যোগাযোগের ব্যাপারটার পাশাপাশি এখন আরও আছে এদিকের বাজারগুলোর সম্পন্ন হয়ে ওঠা। এখানে এখন ধান-সুপারি আর মাছের কারবারি অনেক। কিন্তু দেবু প্রায় নিঃস্ব অবস্থা থেকে শুরু করবে। সেখানে আপাতত পুব দিকই ভালো। বড়ো আন্ধারমানিকের উলটো দিকে বলেশ্বরের ওপারে রঘুনাথপুরসহ অন্যান্য গ্রামে তার মামাতোভাইদের যোগাযোগ ভালো। কিন্তু দেবুর সঙ্গে তার মামাতোভাই মন্মথর কথা এখনও পাকা হয়নি। সেটা হলেই অবশ্য সে শুরু করতে পারে।

সেদিন বড়ো আন্ধামানিক থেকে মলঙ্গিবাড়ির সামনে আসলেই দীনেশ বাড়ির ভিতর থেকে দেবুকে ডাকে। সে দাঁড়ায়, পা থামলেও মনে দোটানা। দীনেশের সঙ্গে দেখা করা প্রয়োজন তার নিজের দরকারে। কিন্তু দীনেশ তাকে কী বলতে পারে তাও সামান্য হলেও যেন বোঝে দেবু। দীনেশ মলঙ্গি কারও কাছে সুদে টাকা লাগবে, সেখানে মাসে মাসে সুদ কম নেবে, আর তার জন্যে কোনো শর্ত দেবে না, তা কি হয়? এমনকি সেই সুযোগে নিজের অনেক দিনের কোনো গোপন ইচ্ছাও সে পূরণ করে নিতে পারে।

কিন্তু এখন তো দেবু দীনেশের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে তাকে ডেকে কোনো কথা বললে তার গুরুত্ব একটু কমই হয়। তবু একটা ইঙ্গিত তো দিয়ে রাখা যায়। রণজয় তাকে আগেই বলেছে দেবুর দরকারের কথা। দেবু নিজেও কয়েকবার বলেছে, সামনের পৌষে তার টাকা লাগবে। তবে সে এখনও কিছু দেরি আছে। সবে ভাদ্র ছাড়াল।

দেবুকে ডাকে দীনেশ। একটানা পথ হেঁটে আসায় দেবু ক্লান্ত। বড়ো আন্ধারমানিকের দিকের রাস্তা উঁচু, তাই কাদাও কম। এই গোড়াখালের রাস্তায় পড়ার পরে কাদায় হাঁটতে কিছু কষ্ট হয়েছে। এসেছেও একটানা হেঁটে। দেবুর হাতের বিড়িটা ছুড়ে ফেলে। গোড়াখালের এই জায়গায় খালটা দক্ষিণ থেকে এসে হঠাৎ পুবে ঘুরে গেছে। এ জায়গাটা চওড়ায় বড়ো, পাশে রাস্তাও বড়ো কিন্তু উঁচু কম। সামনে একপাশে কয়েকটা বাঁশঝাড়। মাঝখানের পথ ঢুকেছে মলঙ্গি বাড়িতে। দীনেশ উঠানের বাইরের দিকে ছিল। দেবু বিড়ি ফেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। দীনেশ এগিয়ে আসে, ‘গেছিলি কোথায়?’

‘ওই বড়ো আন্দারমানিক, মামাবাড়ি-’

‘কোনও কাজে?’

‘না এমনে, দিদিমার শরীলডা খারাপ, মা কইল এট্টু দেইখে আসতি সেই জন্যি। দুই দিন ধইরে ভাবি যাব যাব সময়ই পাই না।’

‘সময় পাও না, করোডা কী সারাদিন বাড়ি বইসে।’

‘কত কাজ। পিছনের ভিডায় উঁচু জমিতে মাডি দেলাম আমি আর শিবু। শিবুরে দিয়ে কাজ করানো সে আর এক কষ্ট-’

‘হয়। এরা খাবে আর ঘোরবে। এগো দিয়ে কাজ করানো ভারি বেকায়দা। আমাগে এট্টি (শিবুর প্রায় সমবয়েসী দীনেশ তার ছেলে বাবুর কথা ইঙ্গিত) আছে গায়ে বাতাস দিয়ে কাটাইয়ে দেল। এহোন কয় রঙিন টিভি কেনবে। আমি কই কারেন্টটা আসুক, সেইয়ার পর-

‘হয় ভালো কথা। এদিক কারেন্ট দেবে টেনে না? ওই ছোট আন্ধারমানিক বড়ো আন্দারমানিকে কারেন্ট আইচে প্রায় বছর দশে হইয়ে গেল আর আমাগে এদিক থানার এত ধারে তাও কারেন্ট দেনা-’

‘আন্ধারমানিকের লোকজন ধনী। সরকার সেয়া বোঝে।’

‘আপনেরা ধনী না?’

‘হয় হইছে। দেহি এবার হিরুভাই আসিল ক’বানে, আমাগে এদিক এট্টু কারেন্ট দেয়ার ব্যবস্থা করেন। কইচো ঠিকই। কাউন্সিল পর্যন্ত কারেন্ট টানছে, সেইয়ার আর আসল না। পল্লি বিদ্যুতের কত বাহানা। এদিক না-আসলিও মেয়াপাড়ায় আসলিও বোজদাম আইচে। সেয়াও না।’

এবার দীনেশ কি বলবে তা জানে দেবু। বলবে, ‘এতদিন ধানের শিষে ক্ষমতায় ছেল, আমাগে একদিক কিছু হওয়ার কথা না, এখন নৌকা মার্কা আইচে এহোন সব হবে।’ কিন্তু দেবুর তো মনে হয়, কী যে হবে? তার কোনো উন্নতি হবে না। সে বাবার অসুস্থতায় যে পথহারা অবস্থা এখান থেকে যে সরকারই আসুক উদ্ধার পাবে না। এই যে বাইরে পরার একমাত্র সাদা জামাটা সে গায় দিয়ে গেছে, এই জামাটাও বছর তিনেকে আগে বানানো, তখনও তার বাপও বেঁচে। এখন এই জামাটা ছাড়া বাইরে, অন্তত আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কি কোনও কাছে উপজেলায় যাওয়ার জামা এই একটা ছাড়া আর নেই। একটা জামা সে কবে বানাতে পারবে জানে না। বোনটার বাচ্চা হবে। সেখানে একদিন দেখতে যাবে, হাতে সে পয়সাও নেই। এইরকম খালি হাতে ঘোরা মানুষ এই গ্রামে একমাত্র সে ছাড়া আর কেউ আছে নাকি! মাঝেমধ্যে বিড়িটাও তার বাকিতে নেওয়া লাগে। কবে যে অমল খুড়োর বউ তারে ধমকে কোন কথা বলে দেবু আজকাল সেই ভয়েও থাকে।

কিন্তু দীনেশ তা বলে না। সব সময় ক্ষমতা আর পয়সার জোর দেখানে লোকটা মুহূর্তে বেশ উলটে যায়। হয়তো তার এখনকার দরকারটা দেবুকে দিয়ে সে সমাধান করতে পারবে। তাই বলে, ‘রাঘবের সাথে তোর কথাবার্তা হইচে দুই-একদিনে?’

‘না, কেন?’

‘ওই যে রসিকমামার হরিসভার পিছনের জায়গার বদলে সামনে রাঘবগো জায়গা বদলা বদলি।’

দেবু দীনেশের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানে নিশ্চিত নতুন কোনো হিসাব আছে তার। সেই হিসাবের কথাই বলবে। দীনেশ তাই বলেও, ‘কিছুদিন আগে ওয়ারও বাবা মারা গেল। এখনই সামনের এই জমি হাতছাড়া করবে, সামনে যদি পাকা রাস্তা হয়, তয় এই জমি আর রসিকমামার পিছনের জমির দাম কোনোভাবে এক হইতে পারে?’

‘না, সেয়াতো পারে না।’ দেবু বলে। কিন্তু বোঝে না মন্দির তোলা নিয়ে এত জমির হিসাব কেন? রসিক জেঠামশাই নিজের ইচ্ছায় জমি দিচ্ছে, দশজনের উপকার হবে। সেই জন্যি বাকিরা সবাই রাজি। রাঘব কি কেষ্টদাও। তার ভিতরে এই গোড়াখালের দীনেশদা প্যাঁচ খেলে কেন? তবু সামনে দেবুর তার কাছেই প্রয়োজন। তাই সে দীনেশের কথায় সমর্থন দেয়। এমনকি দীনেশ যখন বলে, ‘তুই এট্টু রাঘবরে বুঝাইয়ে কইস। আইজ তোরা এট্টা টানাটানিতে পড়ছো, তোগে ভালোমন্দ তো আমার দেখা লাগে। কী কইস?’

‘হয়, ওদা-’

‘তোগে দশজনের কৃপায় দুটো ভাত খাই-’

এই সময় দীনেশকে তার বাবা নগেন্দ্রনাথ মলঙ্গি ডাকে।

নগেন্দ্রনাথ উঠানের মাঝখানে। দিনকে দিন একটু যেন কুঁজো হয়ে যাচ্ছে। দেবু দেখে ভাবে, উঠোনের দিকে এগিয়ে যাবে, নাকি তার কাজ আছে বলে বাড়ির দিকে এগোবে। দীনেশদার কথা শেষ?

তাই মনে হয় শেষ। শেষে কথা বলে সে বাপের ডাকের উত্তর নেয়, ‘আসি, ও বা।’ তার আগে দেবুকে বলে, ‘এটু রাঘবরে বুঝাইয়ে কইস কিন্তু। আমি কয়দিন বাদে শোনবানে তুই কইচিস কি না?’

‘যাই তয়!’

এখন সুনীলের কথায়, জানতে চাওয়ায় অবিনাশের সামনে সে কথা বলে দেবু। জানায়, সে রাঘবকে বলেছে দীনেশ যা বলতে বলেছে। রাঘব শুনবে কিনা, সেটা রাঘব জানে। সুনীল আর অবিনাশের সামনে পিছনের এসব কথা বলতে বলতে দেবু এই হিসাবও করে, তাহলে দীনেশদার কাছে কোনো কিছুর দরকার নেই, নাকি সুনীলদা রাঘবকে বলেছে, উপজেলায় কোনো এনজিওকে বলে রাঘবকে লোন এনে দেবে। তাহলে আর দীনেশের কাছে সুদে টাকা আনতে যেত হতো না।

সুনীল বলে, ‘তুই চলো দীনেশদার বুদ্ধিতে। ওরে বলদার বলদা। হিসাব বুঝলি না?’

দেবু বলে, ‘কী হিসাব?’

‘ওরে আইজকে যদি রসিক জেঠামশাইর সাথে এই জমি নিয়ে কোনো এদিক ওদিক হয় তয় গোড়াখাইলের ক্যাম্পের মাঠে মন্দির বানাতে পারবে, বোঝো সেয়া?’

‘দেবু জানতে চায়, ‘তাই নাকি?’

‘কেন সেয়া তুই বোঝো না?’ অবিনাশ বলে, ‘এ দেহি অংশুমানও জানে। সেদিন কলেজ দিয়ে আইসে আমারে কয়-’

দেবু জানে অথবা জানে না, চোখে এমন ভাব। যদিও এই বিষয়ে কিছু খবরাখবর তো সেও রাখে। তবে এখন অস্তিত্বের সংকটে সে দীনেশের কথায় কাজ করেছে। হয়তো সামনে আরও করবে। তবু এখন কি সুনীলদাকে বলবে, যদি তাকে তার সঙ্গে ধানের কারবারে নেয়, তাহলে যাবে না দীনেশদার কাছে। আজ রাতে একটু পরে এই খাল পাড়ে সুনীলকে ডেকে নিজের ভুলের জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিজের দরকারটা বলবে।

৭.

খুদি চলে গেছে!

খুদি চলে গেছে মানে? এমন তো না, খুদি ছয়-নয় মাসে নিজের স্বামীর বাড়ি যায় না। সেখানে তার ছেলেরা আছে। ছেলেদের সংসারে টিকতে না পেরে সে এখানে এসেছে। কেউ কেউ অবশ্য আগ বাড়িয়ে তার সঙ্গে ভিতরের গল্পটাও হাজির করে। তারা বলে, খুদি এখানে এসেছিল তার জামাইবাবু রসিকের টানে, ছেলেদের সংসারে টিকতে না-পরার কিছু নেই। আবার কেউ হয়তো এর সঙ্গে সহমর্মিতার সুরও তোলে। আসলে রসিক একলা মানুষ, মেয়েটার বিয়ে হয়েছে, স্বামীর সঙ্গে চলে গেছে ভারতে, তাকে দেখতেও একটা মানুষ লাগে! তাই তার কাছে এসে এই বিধবা শালি থাকত। তাতে কারও কোনো সমস্যা তো ছিল না। যা ছিল পিছনে কারও কারও রসিকতা। সেই রসিকতার শেষ ঝাঁজও ছিল এমন যে, আসলে সব সময়ই রসিকের উপর টান ছিল খুদির। একজনের বউ মরেছে, অন্যের স্বামী নেই- তাই দুই টানে মিলে গেছে। ওই যে খুদি বলে, তার ছোট ছেলে বউর জন্যে টিকতে পারত না, সে কথাও পুরোপুরি সত্য নয়। আবার এরই মাঝে নদীর ওপার সেই নাজিপুরের মাটিভাঙা থেকে তাকে এসে দেখে যেত খুদির বড়োছেলে। ছেলেটা কোনোদিনও এ বাড়িতে রাতে থাকেনি। সকাল সকাল আসত, দুপুরে মা ও মেসোমশাইয়ের সঙ্গে কয়টা ভাত খেত, তারপর চলে যেত। কালেভদ্রে ওই ছেলে তার ছেলেমেয়ে কি ভাইপো-ভাইঝিকে নিয়ে এসেছে। তাদের নিয়ে এলেও কখনও রাতে থাকত না। খুদি হয়তো বলতে রাতে থাকতে, কিন্তু জরুরি কাজ আছে এমন কথা বলে খুদির বড়োছেলে চলে যেত। হতে পারে, রাতে কে কোথায় থাকবে কি মেসোমশাইর কাছে নিজের মাকে সে শুয়ে থাকতে দেখতে চাইত না বলেই সে চলে যেত। একবার খুদির নাতনি বারবার থেকে যাওয়ার কথা বললেও বড়োছেলে থাকেনি। খুদি জানত কেন নাতনি অমন করেছিল। ও যখন একদম ছোট তখন তো রাতের পর রাত তার এই ঠাকুরমার সঙ্গেই ঘুমিয়েছে। সে-কথা বাছার (বাচ্চার) এখনও মনে আছে। যদিও খুদি তার ছেলের অমন উদ্যোগে খুশিই হয়েছে। এখানে থাকার জায়গা বলতে দোকানের পিছনে একখানা একচালা ঘর, সেখানে একটা তক্তাপোষ। আর এই দেখতে বড়োসড়ো দোকানটা, যেখানে দুপুরে রসিক গড়াগড়ি দেয়, কোনোদিন রাতে এখানেই মশারি খাটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন দোকানের পিছন পাশের দরজায় কাছে থাকে হারিকেনটা। অল্প আঁচের সেই হারিকেনটা নিভিয়ে খুদি ওই একচালার তক্তাপোষটায় ঘুমায়।

খুদি চলে গেছে। আজ সকালে। এ কথা মল্লিকবাড়ির সবাই জানার পরে যে যার মতো ভাবে বিষয়টা নিয়ে। কেননা, এটা একটা সংবাদ। এই সংবাদ প্রচারের সময়ে রসিক দোকানের মাঝখানে প্রায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। প্রতিদিন সকালে দোকানের ঝাপ তোলে খুদি। আজ সে ঝাপ তোলেনি। এমনকি দোকানের চারপাশে জল ছিটায় ও ঝাঁট দেয়, তাও করেনি। অত সকালে গেল কোথায়?

আবার, এই যে রসিক দোকানের মাঝখানে শুয়ে আছে। খাটো ধুতিটা হাঁটুর কাছে উঠে আছে। গায় একটা হাতঅলা গেঞ্জি, সেটাও তার পেটকে উদলা করে আছে। পেটে ও বুকে প্রচুর লোম রসিকের। সে-সব পেকে সাদা। এখন উন্মুক্ত পেটে হাত বোলাতে বোলাতে সে যে গড়াগড়ি দিতে দিতে জানিয়েছে খুদির চলে যাবার সংবাদ, তাতে কারও অবাক হওয়ার কারণ ঘটে না। তারও কারণ এই, খুদি তা কখনও কখনও একদিন কি একবেলার জন্যে মাটিভাঙা যায়। তেমন তো যেতেই পারে।

না, রসিকের এই গড়াগড়ি, বিলাপ আর অসহায়ত্ব কিন্তু সে কথা বলছে না। আগেও তো মাটিভাঙায় গেছে তখন তো এমন করেনি সে। বরং সেই সারাদিন খুদির অনুপস্থিতিতে রসিক যখন রান্না করেছে কি দোকানের আশেপাশে ঝাড়– দিয়েছে, তখন নাতিবউ হিসেবে পার্বতী একটু আধটু রসিকতা করেছে।

আজও তাই। সবার আগে দোকানে ভিতরে রসিককে অমন গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করতে দেখে পার্বতী। তখন দোকানের সামনে খালপাড়ে দাঁড়িয়েছিল রণজয়ের মেয়ে রচনা ও ছেলে রাতুল। ওদিকে খালের ওপারে ঘরামি বাড়ির বুড়ি তুলসীগাছের ঝড়ায় জল দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ধীরাজের ঘরের পাশে। তার পাশে মাধবের ঘর, সেখানেই বুড়ি নাতি অপর্ণাকে নিয়ে থাকে। মাধব তার বউ-ছেলে নিয়ে ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। মায়ের কাছে রেখে গেছে মেয়ে অপর্ণাকে। খালপাড় দাঁড়ানো অপর্ণার সঙ্গে এপাড় থেকে কথা বলছিল রচনা। রাতুল খালের পাশে শ্যাওড়া গাছের দিকে তাকিয়ে দেখছে প্রত্যেকটায় কেমন ফুল ফুটেছে। তাহলে আজ বিকালে সে ফুল পেড়ে গোড়া কেটে থালায় রেখে দেবে। কাল সকালে তাহলে অনেক মধু খেতে পারবে। এ কথা সে রচনাকে বলে। বলেই ওপারে অপর্ণাকেও জানায়, ‘ও পর্ণাদি, তোমাগে ঘরের কোনায় ছৈলা গাছে যে ফুল ফুটিচে। বিকেলে পাড়বানে-’

অপর্ণা বলে, ‘কাইল সহালে মধু খাওয়ার শোনায় তা’লি আমার ডাহিস কিন্তু-’

এ কথা বলার ভিতরে পার্বতী যে তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, তারা তা খেয়াল করেনি। সে তাদের কথা শোনেওনি। পার্বতী এসেছিল দোকানে। এত সকালে অমলের দোকান খোলে না। রসিকের দোকান খোলে। মনে হয় চা খাওয়ার জন্যে বিস্কুট নিতে এসেছে সে। দোকানের ঝাপ তোলা, কিন্তু ভিতরে কেউ নেই দেখে সে রচনা ও রাতুলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অপর্ণার কথা শেষ হতেই পার্বতী ফোঁড়ন কাটে, ‘তয় তোর সে গুড়ে বালি, ও অপর্ণা। এই রাতুল তোরে দেবেনে ছৈলা মধুর ভাগ! রচনাই ভাগ পায়-না পায়। ওর পেটটা দেইচিস্? খাওয়ার সোমায় কেউর কতা মনে থাহে নিকি ওর।’

অপর্ণা তার কথার উত্তর দেওয়ার আগেই পার্বতী কেন যে উলটো ফিরেছে। হয়তো দেখতে যে রসিক দোকানে এসেছে কিনা। কিন্তু ফিরেই সে এই দৃশ্য দেখবে কেউই কোনোভাবেই ভাবেনি। পার্বতী এই জ্ঞাতি দাদাশ্বশুরের এমন কাণ্ডে অবাক! সে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে ওদিকে ফিরেছে রচনা আর রাতুল! রচনা পার্বতীর কাছে জানতে চায়, ‘ও বউদি, রসিক ভাই দোকানের মদ্যি ওইরামভাবে গড়াগড়ি দিতিচে কী জন্যি!’

পার্বতী এখনও বিষয়টা খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। এমন গড়াগড়ি সে আগেও দিতে দেখেছে রসিককে। তবে তা কখনওই সকালবেলায় নয়। দাদাশ্বশুর বলে এক ধরনের রসিকতারই তো সম্পর্ক, সেজন্যে খুদিকে তখন বলত, ‘ওদি, ভাই ওইরাম গড়াতিচে কী জন্যি? গায়ে ওম হইচে নিকি?’ খুদি কোনো জবাব দিলে সে কথার পিঠে কথা বলেছে, অন্যথায় তারই কথার পরের অংশে বলেছে, ‘ভাইর গায়ের ওম তুমি এট্টু ছাড়াইয়ে দিতি পারো না?’ খুদি সে কথায় হয়তো কিছু বলেছে অথবা বলেনি অথবা ওই জায়গা থেকে সরে অন্যত্র চলে গেছে। পার্বতীর মুখ সম্পর্কে খুদি জানে। কী বলতে কী বলে ফেলে, সেখানে লাগাম দেয় সাধ্য কার।

সে তো রঙ্গর সময়ের। পার্বতীকে ভিতরে ভিতরে খুদি কি রসিক কেউ পছন্দ করুক কি নাই করুক, নাতবউ এ কথা বললে তারাও তাদের সম্পর্কের ভিতরকার খোঁচাটা ভালোই বুঝতে পারে। তবে কদিন আগে পার্বতী যা করেছে সাবিত্রীর সঙ্গে সে কথা মনে উঠলে এখন চেতন থাকলে রসিক হয়তো তার সঙ্গে কথা বলত না।

রচনার কথায় পার্বতী কিছু বলে না। এগিয়ে যায়। দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চির পরে আরও কাছে গিয়ে আধা উঁচু ঝাপ থেকে ভিতরে মাথা ঢোকায়। নিচু গলায় জানতে চায়, ‘ও ভাই, হইচে কী? শরীর খারাপ লাগদিচে?’

রসিক কোনো কথা বলে না। বুকে হাত ডলে। দোকানের ভিতরে গড়াগড়ি খায়। একটু গোঙাচ্ছে নাকি? পার্বতী পিছনে ফিরতেই রচনা আর রাতুল তার কাছে আসে। রচনা পার্বতীর কাছাকাছি গেলে, সে এগিয়ে পাশের ছোট দরজা থেকে মাথা ঢুকিয়ে রসিককে দেখতে চেষ্টা করে। রসিকের মুখে গোঙানির শব্দ তেমন নেই, কিন্তু মাথাটা দুই পাশে দুলিয়ে অসহায় ভঙ্গি করছে।

পার্বতী অসহায়। রচনা ঘাড় ঘুরিয়ে রাতুলকে বলে, ‘এ ভাইডি, যা বাবারে ডাইকে নিয়ে আয়।’

এদিকে পার্বতী দোকানের উপরে উঠে রসিকের বাম হাতখানা ধরে ডাকে, ‘ও ভাই, হইল কী? এরাম করতাচেন কী জন্যি?’

এবার যেন পার্বতীর ডাক শুনতে পায় রসিক। মাথাটা পার্বতীর দিকে আনে। প্রায় বোজা চোখ একটু খুলে তাকায়। কী হয়েছে? সত্যি পার্বতীর বোঝার সাধ্যের বাইরে। এ সময় রসিক বিড়বিড় করে, ‘চইলে গেছে, চইলে গেছে-’

ইতিমধ্যে রচনা রণজয়কে ডেকে নিয়ে এসেছে। খালের ওপাড় থেকে দেখিছিল অপর্ণা, সে তার কাকা ধীরাজকে সংবাদটা জানিয়েছে। আর রণজয় আসতে আসতে পার্বতী দোকানের ছোট দরজা থেকে মাথা বের করে হাঁক দিয়েছে। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj