কানাডার নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য অনুসরণীয়

শুক্রবার, ১ নভেম্বর ২০১৯


কানাডার রাজনীতি একটু অন্যরকম। কেউ যদি হুট করে মন্তব্য করেন- কানাডাতে কোনো রাজনীতির চর্চা নেই, তবে খুব ভুল বলেছে বলে তাকে গালমন্দ করার সুযোগ নেই। কেননা আপাতভাবে এমনটাই মনে হয়। শুধু জাতীয় এবং প্রাদেশিক নির্বাচনের পূর্বেই তাদের রাজনীতির মাঠ গরম থাকে। পাঁচ বছরের বাকিটা সময় এখানে যে কে রাজনীতিবিদ তা বলাই কঠিন। গত ২১ অক্টোবর কানাডার ৪৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্বাধীন লিবারেল পার্টি মোট ৩৩৮ আসনের মধ্যে ১৫৭টি আসন লাভ করে মাইনরিটি সরকার প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে আছে। এন্ড্রো শেয়ারের নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি পেয়েছে ১২১টি আসন। ইভস-ফ্র্যাকোয়া ব্লু্যান্সেটের নেতৃত্বাধীন কুইবেকের আঞ্চলিক ব্লুক কুবেকিয়া ৩২টি আসন নিয়ে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করেছে। শ্মশ্রæমণ্ডিত পাগড়িধারী জগমিত সিংয়ের নেতৃত্বাধীন এনডিপির অবস্থান তার পরে এবং তাদের আসন সংখ্যা ২৪। এলিজাবেথ মের গ্রিন পার্টি ৩টি আসন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেও মেক্সিম বার্নিয়ারের পিপলস পার্টি কোনো আসনই লাভ করতে পারেনি। সরকার গঠন করতে কমপক্ষে ১৭০ আসন প্রয়োজন, যা এককভাবে কোনো দলেরই নেই। এনডিপি নির্বাচনের আগেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, প্রয়োজনে তারা লিবারেলের সঙ্গে থাকবে। তাই এবার লিবারেল তার নীতির মিত্র এনডিপির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

খুব মনোযোগ সহকারে অনুধাবন করার বিষয় ছিল এবারের নির্বাচন। এনডিপি এবং লিবারেল নীতির প্রশ্নে অনেক কাছাকাছি রাজনীতির ধারক। তাই নির্বাচনের আগে এনডিপি ঘোষণা দিয়েছিল যে, প্রয়োজনে তারা লিবারেলকে ক্ষমতায় দেখার জন্য লিবারেলকে সমর্থন জানিয়ে সরকার গঠন করতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে লিবারেল মাথা কুটেও কোনোদিন ব্লুক কুবেকিয়ার সমর্থন আদায় করতে পারবে না। রাজনৈতিক নীতির প্রশ্নে তারা অন্য কোনো পাওয়া না পাওয়াকে রাজনীতিতে স্থান দিতে পারে না এবং কখনো পারেনি। তাই তো নির্বাচনের আগেই তারা ঘোষণা দিয়ে বসে সরকার গঠনে তারা কাকে সাহায্য করবে। আসন বিক্রি, মন্ত্রিত্বের হাতছানি- এসব বোধ হয় কানাডার রাজনৈতিক বাতাসে কখনো আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেনি। হয়তোবা বাংলাদেশ, ভারত কিংবা পাকিস্তানের রাজনীতি থেকে এখনো এই নষ্ট জ্ঞানটুকু তাদের কাছে আসেনি। বাংলাদেশ এ বিষয়ে সম্ভবত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নই হয়ে যাবে। এখানে নির্বাচনের পরে রীতিমতো বেচাকেনার হাট বসে। সেই হাটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বড় খেলোয়াড় ছিলেন সম্ভবত বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ। তিনি দর কষাকষিতে এমন ওস্তাদ ছিলেন যে, তার দলের লোকও অনেক সময় বুঝতে পারতেন না জাতীয় পার্টি ঠিক শেষ মুহূর্তে কার সঙ্গে গিয়ে সরকার গঠন করবে- আওয়ামী লীগ না বিএনপি? তবে সবশেষে বেশি লাভ যার কাছ থেকে আদায় করা যাবে, তার সঙ্গেই তাকে গাঁটছড়া বাঁধতে দেখা যেত। ক’জন মন্ত্রী পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধে যে মামলা ঝুলছে সে ব্যাপারে কতটুকু কার কাছ থেকে ছাড় পাওয়া যাবে অথবা অন্য কোনো স্বার্থের হাতছানি কার কাছ থেকে কতটুকু বেশি পাওয়া যাবে, এরশাদের জাতীয় পার্টি নির্বাচন শেষে কার সঙ্গে থেকে সরকার গঠন করতে সাহায্য করবে এমন সব বিষয় নির্ণায়ক ছিল। দলের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মিল কিংবা আদর্শের জায়গায় মিল- এসব বিষয় বাংলাদেশের নির্বাচনোত্তর ফলাফলে কখনো কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাই তো ধর্মীয় রাজনীতির ধারক ও বাহক বিএনপি এবং জাতীয় পার্টি নির্বাচনের পরে এক টেবিলে নেই। বরং ধর্মীয় রাজনীতির জাতীয় পার্টির জায়গা হয় ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির ধারক-বাহক আওয়ামী লীগে। ক্ষমতায় যাওয়ার নেশায় সেখানে কখনো রাজনীতির বিশ্বাস, নীতি, আদর্শ কোনোটাই গ্রহণযোগ্য মাপকাঠিতে বিবেচনার জায়গায় থাকেনি। অথচ আমরা কানাডাতে দেখলাম, এনডিপিকে নির্বাচনের আগেই তাদের নীতি নির্ধারণের বাঁশি বাজাতে। কেননা তারা তো নীতির ওপর, বিশ্বাসের ওপর এবং আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সরকারে গেলে হালুয়া-রুটি ভাগ করে খেতে পারবে- এমন রাজনীতির দৃষ্টিভঙ্গির অনুশীলন তারা এখনো করতে পারেনি।

কানাডার নির্বাচনের দিকে একবার তাকান। নির্বাচনের রাজনীতি নিয়ে আগেই একটুখানি উল্লেখ করেছি। খুব আগ্রহ করে কানাডার ভোটাররা এদিকে তাকান না। তবে তারা জানেন, যার যেটুকু কাজ সেটুকু তিনি সৎভাবে পালন করবেন। নির্বাচনের সর্বনি¤œ পর্যায়ের একজন অধিকর্তাও তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে এতটুকু অসৎ হওয়ার চিন্তা কখনো করতে পারেন না। এমন চর্চাই নেই এখানে। আমি হলফ করে বলতে পারি, কানাডার প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্টিফেন পেরোল্টের নাম কানাডার শতকরা ১০ ভাগ ভোটারও বলতে পারবেন না। তাদের তেমনটা প্রয়োজনও নেই। কেননা শুধু তিনিই নন, প্রত্যেক কর্মকর্তাই জানেন এবং বুঝেন- নির্বাচনটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং কার্যকর হতে হবে। তাই প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে- তা তারা একেবারেই জানতে চান না। তিনি জনসমক্ষে কখনো আসেন না। টিভিতে তার চেহারা কখনো দেখা যায় না। তিনি জানেন শুধু তার কাজ, তিনি জানেন তার সততা এবং একাগ্রতা। দেশ ও জনগণ ছাড়া তিনি যেন আর কাউকেই চিনেন না, জানেন না। ভাবুন তো একবার বাংলাদেশের কথা! নির্বাচনের আগে টিভিজুড়ে বক্তৃতা-বিবৃতি-সাক্ষাৎকারে ভরপুর থাকে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন। তারপর চলে টানাটানি- কমিশন কার পক্ষে কাজ করছে। কমিশন কি নিরপেক্ষ? সবকিছুই আলোচনায় আসে, সবকিছুই ঠিক হয়- কিন্তু শুধু এটুকু নিশ্চিত হয় না যে, কমিশন দেশ ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।

শুরুতে যা বলছিলাম কানাডার প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়ে। প্রতিটি নির্বাচনী অঞ্চলে তাদের রেজিস্টার্ড মেম্বার আছেন। প্রতি বছর তারা মেম্বার হিসেবে চাঁদাও প্রদান করেন। এক বছর চাঁদা না দিলে মেম্বারশিপ অটোমেটিক বাতিল হয়ে যায়। নির্বাচন এলে তার আগে ওই নির্বাচনী এলাকার রাজনীতিবিদরা যারা প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতে চান, তারা পার্টির কাছে আবেদন করেন। সবার জন্য এই দরজা খোলা। তারপর উৎসাহী প্রার্থীদের নাম তুলে দিয়ে ওই নির্বাচনী এলাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। একদিন ভোট হয়। উপস্থিত সব রেজিস্টার্ড সদস্য ভোট দিতে পারেন। তাদের ভোটেই নির্বাচিত হন ওই দলের প্রার্থী। দল স্থানীয় এই সমর্থনকে মেনে নিতে বাধ্য হয়। ফলে প্রান্তিক থেকেই নির্বাচনের প্রার্থী স্থির হয়ে যায়। দলের প্রধানের হাতে কিংবা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে প্রার্থী নির্বাচনের কোনো সুযোগ থাকে না। বাংলাদেশের দিকে তাকান একবার। তিনটি দলের কথাই বলি। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সব নেতা তাদের নিজ নিজ দলের দলীয় প্রধানকে সর্বোচ্চ এবং একমাত্র ক্ষমতা দিয়ে বসেন। ফলে নির্বাচনে টিকেট পাওয়ার জন্য দলীয় প্রধানের একক সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত। প্রার্থী প্রকৃত জনপ্রিয় কিনা কিংবা সৎ কিনা, যোগ্য কিনা- তা নির্ধারণের রাজনৈতিক কোনো চর্চা বাংলাদেশে নেই। এখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতা ব্যবহারের কারণে প্রার্থী নির্বাচনে চরম ভুল হয়ে যায়। ফলে ভুল নেতা, ভুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসেন। তারপর যা হওয়ার তাই হয়। গর্জন গাছ থেকে গর্জনের কাঠই আসবে। তাই দুদক এখানে এমপিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে ফেলে, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তাইতো এখানে মহিলা এমপি নকল পরীক্ষা দিতে গিয়ে ধরা পড়েন। তার পরীক্ষা দিতে তিনি ভাড়া করেন অন্য কাউকে।

বিবেক যেন সাড়া দিচ্ছে না বাংলাদেশে। বিবেক কি ঘুমিয়ে থাকে, নাকি তাকে ঘুমিয়ে রাখার জন্য বাংলাদেশকে ষড়যন্ত্রের শিকার করে রাখছে কোনো মহল? খুব দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশ আজ এক চরম অবস্থায় এসেছে। পদ্ধতিই যেন নষ্ট হয়ে গিয়েছে এখানে। যাকেই যেখানে বসানো হোক না কেন, নষ্ট পদ্ধতি তাকে যেন খেয়ে ফেলছে। বাঁচার উপায় কী এখানে? মানুষের স্বাভাবিক গতিই যদি থেমে যায় তবে কিসের নির্বাচন, রাজনীতি আর সরকারের ক্ষমতা? সবই এক সময় ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে। কানাডায় এখন বাংলাদেশের অনেক মানুষ বসবাস করছেন। কানাডার এবারের নির্বাচন দেখে তাদের মনে প্রশ্ন জেগেছে- কেন নয় ঠিক এমনটা বাংলাদেশে? কেন সেখানে সরকারকে, পুলিশকে, সরকারি অফিসকে, নির্বাচন কমিশনকে, রাজনীতিকে মানুষ বিশ্বাস করতে পারে না? কেন এখানে বিচার ব্যবস্থা, ফৌজদারি কার্যব্যবস্থাকে মানুষ আস্থার মধ্যে আনতে পারছে না? লোভের, লাভের কি কোনো শেষ নেই? কোনো দিনই কি বাংলাদেশ অভিশাপমুক্ত হতে পারবে না?

মেজর (অব.) সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

মাহফুজা অনন্যা

আবারো আবরারের অপমৃত্যু!

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

কতিপয় ছাত্র এমন উচ্ছৃঙ্খল হয় কেন?

Bhorerkagoj