রূপকথার দুঃসাহস : আহাদ আদনান

বুধবার, ৩০ অক্টোবর ২০১৯

পূর্বদিকের জানালাটা দিয়ে চাঁদ দেখা যায়। চাঁদের আলো ঘরে ঢুকে যেন চোখটাতে আদর বুলিয়ে দেয়। ঘুম না এলে মা যেমন চুলে বিলি কেটে দেয় জোছনার আলোও তেমন করে চোখে বসে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। রূপকথা এই আলোর নাম দিয়েছে ‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি’। কিন্তু সমস্যা হয় যে দিন চাঁদটা ওঠে না। ঘুটঘুটে অন্ধকার কখনোই হয় না তিনতলার এই ঘরটাতে। রাতে একটা ডিমলাইট সবসময়ই জ্বলে। কিন্তু চাঁদের আলো ছাড়া ঘুম যে আসে না নয় বছরের মেয়েটার।

ছোট বোনটার নাম রংধনু। মাত্র এক বছর বয়স। বোনটা রূপকথার চোখের মণি। তবে মাঝে মাঝে মনটা খারাপও হয়। ও আসার পর থেকেই তো আম্মু ওকে সময় দেয় বেশি। ভাত খেতে হয় নিজের হাতে। স্কুলে নিয়ে যায় নিঝুম আন্টি। আর এখন থাকতে হয় অন্য ঘরে। কাজের মেয়েটা গ্রামের বাড়িতে গেছে এক সপ্তাহ। এখন একলা ঘরে রাতে একা থাকতে মন চায় না। চোখে জল আসে সময় সময়। তখন চাঁদটা বলে, ‘ধুর বোকা মেয়ে, আমি তো আছি। কে বলে তুমি একা’। তাই আবার মুখে হাসি ফুটে। ঘুমিয়ে পড়ে রূপকথা।

আজ আকাশে চাঁদ নেই। মেঘলা মেঘলা ভাব। ঘুম আসছে না। কাল শুক্রবার, স্কুল বন্ধ। দেরিতে ঘুম এলেও ক্ষতি নেই। একটা সময় ঘুম এসেও যায়। বারোটায় না একটায় সেটা আর খেয়াল করা যায় না। হঠাৎ একটা ‘খট’ শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। এমনিতেই ঘুম খুব পাতলা রূপকথার। শব্দটা কিসের বোঝা গেল না। বিছানার পাশে রেডিয়ামের ঘড়িটা বলছে সাড়ে তিনটা বাজে। একটু পানি খেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। খুব গরম লাগছে। একটু জানালার পর্দা খুলে দিলে ভালো লাগবে। বিছানায় বসেই পর্দাটা টান দেয় রূপকথা। এ কি, দেয়ালে যেন একটা ছায়া নড়ে উঠল। ওকে দেখেই সরে গেল? নাকি দক্ষিণ দিকের দেয়ালের কাছে গেল? কিসের ছায়া এটা? ভূত, প্রেত, নাকি মনের ভুল?

রূপকথার বান্ধবীদের ঘরভর্তি ভূতের বই। একেকজন ভূত নিয়ে ‘থিসিস’ করে বসে আছে। দিনের ভূত, রাতের ভূত, জলের ভূত, বাতাসের ভূত, অদ্ভুত সব ভূতের কাহিনী ওদের মুখস্ত। শুধু রূপকথার কোনো ভূতের বই নেই। অ্যাডভেঞ্চার বই আছে, গল্পের বই আছে, ভ্রমণ কাহিনী আছে, জীবনী আছে, কিন্তু ভূতের বই নেই। ভূত বলে কিছু নেই। এটা স্রেফ কুসংস্কার থেকে কিছু মানুষের কল্পনার সৃষ্টি। আব্বু অনেক সুন্দর করে ওকে এসব কথা বুঝিয়ে বলেছে।

একবার না, অনেকবার। আজ রাতে ছায়া দেখে ভয় পেলেও রূপকথা মনে মনে বলল, আর যাই হোক, এটা ভূত না।

এরপর চোখে আর ঘুম থাকার কথা না। চুপ করে শুয়েই থাকে সে। দশ মিনিট সব চুপ। এরপর একটা মিহি আওয়াজ। ঝিনঝিন ঝিনঝিন। কিসের শব্দ হচ্ছে? আস্তে করে উঠে ফ্যানটা বন্ধ করে দেয় ও। এইতো, শব্দটা আরো ভালো করে বোঝা যাচ্ছে। অনেক সাহস করে ধীরে ধীরে বারান্দায় চলে আসে রূপকথা। এখান থেকে দক্ষিণ দিকের দেয়াল চোখে পড়ে। কি ভয়ঙ্কর! দুইটা লোক দেয়ালে ঝুলে আছে। ওপরের ফ্ল্যাটটা আতিক আঙ্কেলদের। পরশুই উনারা গিয়েছেন সিঙ্গাপুর। পুরো ফ্ল্যাট খালি। ঝুলে থাকা লোকগুলো বারান্দার গ্রিল কাটছে? অনেক কষ্টে ভয় থেকে চিৎকার আটকে রাখে মেয়েটা। বুক কাঁপছে রীতিমতো। হাত, পা থরথর করছে। দৌড়ে যায় সে আব্বুর রুমে। সবাই ঘুমুচ্ছে। তখনই মনে পড়ল সন্ধ্যা থেকে আব্বুর প্রচণ্ড মাথাব্যথা করছিল। কি একটা ওষুধ খেয়ে আগে আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে আজ। আর আম্মুর শরীর কয়েকদিন থেকেই খারাপ। জ্বরজ্বর ভাব। ডাকলে যদি তারা রাগ করে?

রূপকথা আব্বু-আম্মু কাউকে না দেখে আব্বুর ফোনটা নিয়ে আসে ওর ঘরে। চুপিচুপি একটা নম্বর ডায়াল করে। ‘ওসি আঙ্কেল, আমি রূপকথা। আমাদের ওপরের ফ্ল্যাটে দুইটা চোর এসেছে। গ্রিল কাটছে। আমি সত্যি বলছি। এখন কি করব আঙ্কেল?… আমাদের বাড়ির ঠিকানা হচ্ছে…।’

ফজরের আজান হচ্ছে। আব্বু উঠে পড়েছেন নামাজ পড়তে। ঠিক তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠল। রূপকথা দাঁড়িয়ে আছে দরজার কাছেই। আব্বুকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরল সে। কি হচ্ছে, এত ভোরে কে বেল বাজাচ্ছে, আব্বু কিছুই বুঝছে না। দরজা খুলতেই পুলিশ দেখে আব্বু আরো ঘাবড়ে গেছে।

– ‘রূপকথা কে? ওকে দেখছি না কেন?’

– ‘ওকে কীভাবে চিনেন? কি দরকার? কী করেছে রূপকথা?’

সারা ঘর থমথমে। আম্মুও জেগে গেছে। ভয়ে কাঁপছে রূপকথা।

– ‘কী করেছে মানে? আপনার মেয়ের জন্য আমরা দুইটা দুষ্টু চোরকে হাতেনাতে ধরতে পেরেছি। রূপকথা অসামান্য সাহসের কাজ করেছে। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মামনি।’

আব্বু-আম্মু কিছু বুঝতে না পেরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকে। ওসি সাহেব তাদের আশ^স্ত করলেন, তারপর ড্রয়িং রুমে বসে গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সব খুলে বললেন- ‘ছোট একটা মেয়ে মাঝরাতে ফোন দিয়ে চোরের কথা বলছে বিশ্বাস হচ্ছিল না। তবে আমাদের কাছে রিপোর্ট ছিল আমার থানার আন্ডারে গত দুই মাসে বেশ কয়েকটা বাসায় গ্রিল কেটে চুরি হয়েছে। চাপে ছিলাম বুঝতেই পারছেন। তারপর এসে দেখি চোর বাবাজিরা এখনো ভেতরেই। আর যায় কোথায়। দারোয়ান বলল রূপকথা নামে একটা মেয়ে আছে এই ফ্ল্যাটেই। সেই চিনিয়ে দিল।’

একটু থেমে ওসি সাহেব বললেন- ‘যা বুঝলাম, রূপকথা আপনাদের ডাকেনি। তাহলে আমার নম্বর পেল কীভাবে’।

আব্বু হেসে দিল। তারপর বলল- ‘যে থানাতে থাকি সেই থানার ওসির অফিসিয়াল ফোন নম্বর তো জেনে রাখা উচিত। আমার, ওর আম্মুর, দাদুর, নানুরসহ আত্মীয়দের মোটামুটি কুড়িটা ফোন নম্বর ওর মুখস্ত।’

এরপর আব্বু রূপকথার দিকে তাকিয়ে বলল- ‘মা, তুমি বাইরের কোন কোন নম্বর জানো, বলো তো।’

– ‘কাছাকাছি তিনটা ফায়ার স্টেশনের নয়টা নম্বর, আমাদের স্কুলের অফিসের নম্বর, দশজন স্যারের নম্বর, আমাদের বুয়ার নম্বর, দারোয়ানের নম্বর, বিদ্যুতের কাজ করে এমন দুইটা লোকের নম্বর, পানির লাইনের সমস্যা সারায় এমন দুইটা লোকের নম্বর, একটা নিয়মিত নিয়ে যায় রিকশাওয়ালার নম্বর, আর…।’

আব্বু-আম্মু মুচকি হাসছে। ওসির মুখ হাঁ হয়ে গেছে। বিস্ময় জড়ানো কণ্ঠে তিনি বললেন- ‘তুমি মেয়ে, নাকি কম্পিউটার?’

– ‘আমি রূপকথা। আমার বোন রংধনু’। বেশ গর্বের সঙ্গে বলল রূপকথা। তারপর মিটিমিটি হাসতে হাসতে ওসি সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল- ‘স্যার, আপনার চা কিন্তু ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj