দৃষ্টি বিভ্রম

শনিবার, ২৬ অক্টোবর ২০১৯

আরাফাত শাহীন

চোখের সামনে দিয়ে কোনো নারীকে হেঁটে যেতে দেখলে কিছু পুরুষ কেমন দৃষ্টিতে যেন তাকায়। মধ্যবয়সী নারী কিংবা অল্পবয়সী কোনো কিশোরী- তাদের দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। নিজের কন্যার দিকে মানুষ যে দৃষ্টিতে তাকায় এটা কি সেই দৃষ্টি? না। সে দৃষ্টিতে কোনো মায়া-মমতা, স্নেহ, সম্মান কিংবা ভালোবাসা কিচ্ছু নেই। আছে কেবল ঘৃণা, প্রতিহিংসা; আরো কী যেন একটা আছে। জহির তা ধরতে পারে না। হয়তো ওদের জিজ্ঞেস করলে বিষয়টা জানা যেতে পারে। আবার কেউ নাও বলতে পারে। তখন যদি জানার জন্য জহির চাপাচাপি করে তাহলে লোকটি কি ওকে মারার জন্য তেড়ে আসবে? এ প্রশ্নের জবাবও জহিরের জানা নেই।

খুলনা রেলস্টেশন। জহির এখানে তিরিশ বছর ধরে কুলিগিরি করে। সেই যে দশ বছর বয়স থেকে লোকের বোঝা টানা শুরু করেছে আজ অবধি তা চলছে। জহিরের জন্ম এই রেলস্টেশনের সঙ্গেই লাগোয়া বস্তিতে। জন্মের সময় মা মারা যায়। আর বাবা কেমন তা নিজ চোখে কোনোদিনও দেখা হয়নি। লোকমুখে শুনেছে, তার বাবা তাকে ফেলে কোথায় যে একদিন উধাও হয়ে গেল কেউ তার খোঁজ কোনোদিনও পায়নি। হয়তো ভালো করে খুঁজলে পাওয়া যেত। কিন্তু কে খুঁজবে! কার এত দায় পড়েছে!

বয়সের তুলনায় একটু বেশি বয়স্ক দেখায় জহিরকে। হয়তো সারাজীবন এমন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের জন্যই। পরনে টকটকে লাল রংয়ের পোশাক। তাতে আবার কয়েক জায়গায় তালি মারা। একটা ভালো জামা অবশ্য ওর আছে। তবে সেটা পরে কখনো কাজ করতে বেরোয় না। যখন সুরতির কাছে যায় শুধুমাত্র তখন সেটা পরে বেরোয়। জামাটা অবশ্য সুরতিই ওকে কিনে দিয়েছিল।

রেললাইনের পাশেই যে বস্তি তার শেষ মাথায় সুরতির ঘর। জহির শুধুমাত্র তার কাছেই মাঝেমধ্যে যায়। সুরতিকে ওর বড্ড ভালো লাগে। সুরতির কাছে যে সকাল-বিকেল বস্তির জোয়ান পোলাপান ঘোরাফেরা করে তাও জানে। তারপরও সুরতির কাছে যায়। না গিয়ে থাকতে পারে না। চল্লিশ বছর আর কী-ই বা এমন বয়স!

একদিন প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। জহির একটু উষ্ণতার আশায় সুরতির ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সুরতি সে দিন সেজেগুজে বসেছিল। ওর অপেক্ষাতেই কি! ঘরে গিয়ে পৌঁছাতেই এগিয়ে এসে আদর করে পাশে বসায়। তারপর আরো আদর করে গা-মাথার জল মুছে দেয়। সুরতি কপট রাগ দেখিয়ে বলে, ‘এই বৃষ্টি মাথায় কইরে না আলি চইলতো না!’

– ‘তুমারে না দেইখে একদম থাকতি পারিনে! কী করবো কও! তুমি ছাড়া আমার আর কিডা আছে!’

– ‘সব পুরুষ মানুষির ওই একই কতা। তুমাগের অস্ত্র তো ওই একখানই।’

– ‘কী যে কও না সুরতি!’

এরপর দুজন ডুবে যায় উষ্ণতা আদান-প্রদানে।

জহিরের আজ খুব ইচ্ছা করছিল সুরতির কাছে গিয়ে কথাটি জিজ্ঞেস করতে। পুরুষ মানুষ নারীকে দেখলেই এভাবে হা-ভাতের মতো তাকিয়ে থাকে কেন। হয়তো প্রশ্নটার জবাব ও দিতে পারবে। ওর কাছে তো অনেক পুরুষের যাওয়া-আসা। আর পুরুষের মনের খবর কেমন করে যেন একমাত্র নারীরাই বলতে পারে। সব নারী কি বলতে পারে! হয়তো পারে। একবার সারাদিন বসে থেকেও তেমন একটা রোজগার হয়নি। এদিকে আবার সুরতির কাছে যেতেও ইচ্ছা করছে। সুরতির জন্য সামান্য খাবার কিনে নিয়ে তারপর গেল। কিন্তু নিজের পেটে দানাপানি কিছুই পড়েনি। মনে যতটা সম্ভব প্রফুল্ল ভাব ধরে রাখল যাতে সুরতি কিছু টের না পায়। তবে সুরতি ঠিকই ধরে ফেলল।

– ‘সারাদিন প্যাটে কিছু পড়িনি তাই না?’

জহির কাঁচুমাঁচু হয়ে বলল- ‘কিডা কইলো তুমারে?’

– ‘শোনো, মাইয়ে মানুষ সব বুজতি পারে। পুরুষ মানুষির প্যাটে কী আছে তাও।’

জহির আর কথা বাড়াল না। বুঝতে পারল ধরা পড়ে গেছে।

সুরতির ঘরে এসে জহির যতক্ষণে পৌঁছালো ততক্ষণে রাত বারোটা বেজে গেছে। বস্তিতে একটা অস্পষ্ট নীরবতা বিরাজ করছে। সুরতি ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি? জহির গুনে গুনে চারবার টোকা দিল দরজায়। আস্তে করে দরজার পাল্লা ফাঁকা হয়ে গেল। সুরতি এখনো জেগে আছে।

– ‘এক গিলাস পানি খাওয়াও আগে।’ বিছানায় বসতে বসতে বলল জহির।

সুরতি পিতলের গøাসভর্তি পানি এগিয়ে দিল।

– ‘আজ তুমারে ক্যামন যুনু কিলান্ত মনে হইচ্চে! কাজকাম ঠিকমতো পাও নাই?’

– ‘টাহা আজকে ভালোই কামাইছি।’

বুক পকেটে জমানো টাকার ওপর হাত বুলাতে বুলাতে বলল জহির।

– ‘তালি পরে মুখখান এমন শূন্য মনে হইচ্চে ক্যা?’

– ‘ও কিছু না।’ বলেই বিছানায় সটান শুয়ে পড়ল জহির।

কিছুক্ষণ বাদে সুরতি এসে তার পাশে বসল। সুরতির কেমন যেন জহিরকে আজ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। কী হলো লোকটার?

– ‘তুমার কাছে একটা বিষয় জানতি খুব ইচ্ছা করতিছে।’

নীরবতা ভাঙে জহির। সুরতি উৎসুক হয়ে ওর দিকে তাকায়।

– ‘আজ তিরিশ বছর হইল কুলিগিরি করতিছি। ইস্টিশনে বহু মানুষরে ট্রেনেরতে নামতি-উঠতি দেখিছি। আজকে কামের ফাঁকে এট্টু পিলাটফর্মে বসার পর দেহি একলোক মহিলাগের দিকি কেমন জ্বলজ্বলে চোহে চাইয়ে রইছে।’

– ‘তুমি আমারে এসব কতা শুনাইচ্চো ক্যা?’

সুরতি অবাক হয়ে গেল। বহু বছর যাবৎ ওর কাছে জহির আসা-যাওয়া করছে। এমন তো কোনোদিনও হয়নি!

– ‘তুমারে শুনাচ্চি কারণ তুমি হয়তো এর উত্তর দিতি পারবা।’

সুরতির বুকটা গর্বে ভরে উঠল। সহসা নিজেকে ওর বড় জ্ঞানী বলে মনে হলো।

– ‘আচ্ছা, কও দেহি পুরুষ মানুষ মহিলাগের দেখলি এমন করে তাকায় কী করতি? এতে তারা এত আনন্দ পায় ক্যা?’

– ‘আমি বুজতি পারতিছি তুমার মনের অবস্তা। তয় সব পুরুষরে আমি খারাপ মনে হরিনে। ভালো করে চাইয়ে দেখবা কিছু পুরুষ মায়ামমতা নিয়েও মহিলাগের দিকি তাকায়। তুমার চোহে এসব ভালো জিনিস পড়ে না? তুমার নিজির চোহেই তো সমস্যা মনে হইচ্চে।’

জহির মনে মনে ভাবে, হয়তো এটা তার চোখের ভুলই হবে। দুনিয়ার সব মানুষ তো আর খারাপ হতে পারে না। হয়তো এখনো ভালোর পরিমাণ বেশি বলেই দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যায়নি। সবাই ওর নিজের মতো খারাপ নয়।

– ‘আমারে তুমি কোন চোহে দ্যাহো, কওতো!’

হাসতে হাসতে প্রশ্ন করল সুরতি। হঠাৎ প্রশ্ন শুনে চিন্তায় ছেদ পড়ে জহিরের।

– ‘তুমারে তো আমি দেবীর চোহে দেহি। তুমি আমার জীবনের একমাত্র আরাধ্য দেবী। তুমারে পুজো করার জন্যি দ্যাহো না কিরহম ছুটে আসি।’

এই কথায় দুজনই খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর হারিয়ে গেল গভীর ভালোবাসায়।

:: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj