চৈত্রের শেষ বিকেল

শনিবার, ২৬ অক্টোবর ২০১৯

রমজান মাহমুদ

রাত ১:১৩ মিনিট। আমার ঘুম ভেঙে গেল। ইদানীং ঘুম ভাঙা বা ঘুমানো খুব সাধারণ একটি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। কখন যে এ দুটি কাজ আমার দ্বারা ঘটে, তা নিজেই অনেক ক্ষেত্রে টের পাই না! হরিশচন্দ্র বসু স্ট্রিটের এ বাসায় গত এক মাস ধরে উঠেছি। নতুন পরিবেশ বলেই হয়তো এ অনিয়ম ঘটছে। আমার রাতগুলো কাটে বেশির ভাগ সময় বই পড়ে। মাঝে মাঝে ফেসবুকিং, ছাদে হেডফোনে গান শুনতে শুনতে চাঁদ দেখা কিংবা বুড়িগঙ্গার তীরে রাতের নদী উপভোগ। অথচ বেশ কিছুদিন ধরে এসব লোভনীয় ব্যাপারগুলো আমায় খুব বেশি আকর্ষণ করছে না। বিকেলে তপু ফোন দিয়ে বলল, ‘আজ ওরা পদ্মা রিসোর্টে রাত কাটাবে। সারা রাত নদীর তীরে বসে আড্ডা আর বারবিকিউ পার্টি করবে। অতঃপর ভোরে বাড়ি ফিরবে।’ নদী আমায় বরাবরই বেশ টানে, তা সত্ত্বেও ওদের সঙ্গে যেতে ইচ্ছে করছে না।

মাঝরাতে আমার চোখ এমআই সিক্সপ্রোর ডিসপ্লের দিকে। সর্বশেষ চৈত্রের ৩ তারিখে মেঘ ফেবুতে ক্ষুধেবার্তায় লিখেছে, ‘আমাকে ব্লুক করে দিয়েছ? এটা কিন্তু আমি চাইলে অনেক আগেই করতে পারতাম…আমি করতে পারিনি। হয়তো এটাই আমার ভুল! আমি সব সময়ই ভুল করি। ভালো করেছো, থ্যাংক ইউ ফর এভরিথিং…’।

মেঘের পাঠানো এ টেক্সটি আমি ১৭ দিন পর দেখছি। আমি একজন আবেগপ্রবণ মানুষ। সামান্য ব্যাপারে চোখে জল চলে আসে। মেঘের পাঠানো এ টেক্সটি পড়ে চোখ টলমল করছে, নিজের অজান্তেই দুফোঁটা অশ্রæ গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। আচ্ছা, আমি কি তাহলে মেঘকে ভালোবাসি! নাকি এটি ওকে নিয়ে কেবল একটি মোহ। যার স্থায়িত্ব খানিকটা সময়ের!

মেঘের সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশি দিনের নয়। কোনো এক শীতের সন্ধ্যার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আমাদের দেখা, চোখে চোখ রাখা ও পারস্পরিক হাসি বিনিময়। যতদূর মনে পড়ে সে দিন আমাদের কোনো কথা হয়নি। মেঘ পরিচয়ের ঠিক একদিন পর ফেবুতে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো। প্রোফাইলে চমৎকার কার্টুন পিক, মেঘ প্রাইভেসি সেটিংস ভালো জানে! ফেবুতে কিচ্ছু নেই। ছবি, স্ট্যাটাস, বার্থ ডে, রিলেশনশিপ সবকিছুতেই রেস্ট্রিকশন। নীল রংয়ে বোল্ড লাইনে লেখা ‘দিস প্রোফাইল ইজ লক্ড’। মেয়েটি যে এত তাড়াতাড়ি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে, ভাবতে অবাক লেগেছে আমার। আমি মুহূর্ত দেরি না করে ফেবুতে বন্ধু তালিকায় মেয়েটিকে অন্তর্ভুক্ত করে নিলাম। এরপর আমাদের রাত জেগে ফেবু চ্যাটিং শুরু। মেঘকে খুব ভোরে উঠতে হতো, তবুও সাড়ে বারোটা কিংবা একটার আগে বলতো না ঘুম পাচ্ছে। মেঘ ভদ্র একটা মেয়ে, শত কষ্টের মাঝেও চারপাশের মানুষকে আনন্দ উজাড় করে দেয়। ততদিনে আমাদের ভেতর একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক হয়ে এসছে বোধ হয়। প্রতিদিন ফেবু, ইন্সটাগ্রাম ও হোয়াটস অ্যাপে আমাদের ভাব বিনিময় হতো। এভাবেই আমরা একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এলাম।

কোনো একদিন রাতে কথার মাঝে হোয়াটস অ্যাপে মেঘ জানতে চাইলো, কি করছো?

উত্তরে জানালাম, চিরকুটের ‘আমার ঘুমবাসি তারা, একা রাতের-ই আঁধারে’ গানটি শুনছি…।

এক সময় আমিও গানটা অনেক শুনতাম রেডিওতে। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যেতাম, ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে মেঘ জানালো।

আমি একটু হেসে জবাব দিলাম, এখন আমি শুনি! আচ্ছা, গানটা যখন শুনতে তখন স্বপ্ন পুরুষকে নিয়ে খুব ভাবতে, তাই না?

আমার এ প্রশ্নে মেঘ কিছুটা বিব্রত হলো। জবাবে জানালো- না, তখন কাঁদতাম। ছ্যাঁকা খেয়েছিলাম! মাহিনের সঙ্গে সম্পর্কের একচল্লিশ সপ্তাহ আগে।

আমার আর মেঘের সঙ্গে চ্যাটিং কনটিনিউ করতে ইচ্ছে করল না। ব্যালকুনিতে এসে দাঁড়ালাম। আকাশে মেঘের বেশ আনাগোনা। প্রচণ্ড গর্জনের শব্দ সেখানে শোনা যাচ্ছে। আজ কি কালবৈশাখী ঝড় হবে? চৈত্র মাসেই কালবৈশাখী ঝড় হয়। ওই মাঝ রাতেই কেনো জানি বৃষ্টিতে ভেজার তীব্র ইচ্ছে জাগলো।

চৈত্রের শেষ বিকেল সতীশ সরকার রোড ধরে হাঁটছি, স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমে এ রোডটি চলে গেছে। এ রোড ধরে একটু বামে এগুলে আটতলা একটি ভবন চোখে পড়ে, এ ভবনের কোনো একটি ফ্ল্যাটে মেঘদের বসবাস। ভবনটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, খুব বেশি দিন আগে এটি নির্মাণ হয়নি। সম্ভবত তিন কিংবা চার বছর আগে এটি নির্মিত হয়েছে। দেয়ালে রংয়ের উজ্জ্বলতা এখনো কমেনি, বাড়িওয়ালা সম্ভবত বার্জার পেইন্টে দেয়াল রাঙিয়েছেন। দেয়ালটা এখনো বেশ চকচক করছে।

আমি খানিকটা সময় আটতলা ভবনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার কাছে মনে হলো- মেঘ ব্যালকুনিতে দাঁড়িয়ে আছে অতি যতেœ নীল শাড়ি, কপালে নীল টিপ, নাকে নথ আর নখে নীল নেইল পলিশে নিজেকে সাজিয়ে। মেঘকে এখন নীলপরী মনে হচ্ছে! এভাবেই মেয়েটিকে শাড়িতে বেশ মানায়। আর আজ… আমি অদ্ভুত দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছি। মাঝ রাস্তা থেকে একজন রিকশাচালক চেঁচিয়ে বলল, ভাই এমন করে কি দেহেন? শহরে নতুন আইছেননি! আমি হকচকিয়ে গেলাম, কিন্তু আমার দৃষ্টি এখনো আটতলা ওই ভবনের দিকে। ইচ্ছে করছে চেঁচিয়ে মেঘকে বলতে, সব সময় কেন জানি তোমার কথা খুব মনে হয়! এর নাম কি ভালোবাসা? কিন্তু হৃদয়ের সে সুপ্ত কথা আটতলা ভবনে মেঘের কাছে পৌঁছায় না।

:: মুন্সীগঞ্জ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj