নেই

শনিবার, ২৬ অক্টোবর ২০১৯

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

সন্ধ্যে হয়েছে। আকাশটা টকটকে লাল হয়ে আছে। সেই লাল আভায় শহরটা যেন পুরো রঙিন হয়ে গেছে। কেন যেন এই সময়টাতেই মন খারাপ হয়। মেসের সিঙ্গেলে একটি খাটে শুয়ে আছে রাশেদ। তন্দ্রা-তন্দ্রা ভাব এসেছে। কিন্তু দুপুরে খাওয়া হয়নি বলে চোখে ঘুম আসছে না। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। বৃষ্টি নামবে হয়তো, সন্ধ্যে হয়েছে বলে রাস্তার আলো জ্বালানো হয়েছে। সেই আলোয় ঘর আলোকিত হচ্ছে। মশা ভন ভন করছে। দুয়েকটা এসে হাত-পায়ে কামড়ালেও উঠতে ইচ্ছে করছে না তার।

ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে রাশেদ। বড় হয়েছে চাচার কাছে থেকে। রাশেদের চাচা কৃষক। তার কোনো সন্তান নেই বলে রাশেদকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন। রাশেদ এখন ভার্সিটিতে লেখাপড়া করছে। এইচএসসি পাস পর্যন্ত তার সব খরচই বহন করেছেন চাচা। কিন্তু বার্ধক্যজনিত রোগে তার শরীরটা বিকল হয়ে যাওয়ায় তিনি আর রাশেদের খরচ বহন করতে পারেন না। রাশেদরা পদ্মাপাড়ের মানুষ।

লেখাপড়ার সুবাদে রাশেদ এখন ঢাকায় থাকে। লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করে। সেটা দিয়ে নিজে খরচ বহন করে এবং তার বড় চাচাকে কিছু টাকা পাঠায়। এ পৃথিবীতে আপন বলতে শুধু বড় চাচা এবং চাচি।

প্রতিদিনের মতো আজো টিউশনি করাতে যাচ্ছে রাশেদ। তবে আজ নতুন স্টুডেন্টকে পড়াতে যাচ্ছে সে। রাশেদ ঠিকানা মতো চলে গেল সেখানে। বাড়িটা বেশ সুন্দর এবং বিলাসবহুল। রাশেদের বুক ধুকপুক করতে লাগল; কেন জানি ভয় ভয় অনুভূতিও জাগল।

কিছুক্ষণ পর রাশেদ ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। কাল থেকে পড়াতে আসবে এ বাড়িতে। বেতনটাও ভালো। খুশি মনে এগিয়ে গেল চায়ের দোকানের দিকে।

২.

রাশেদ হেঁটে যাচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক এল এক তরুণীর- এই যে শুনুন।

রাশেদ ঘুরে দাঁড়ালো। রিকশা থেকে একজন তরুণী নেমে বলল- আপনি শ্রাবণীকে পড়ান না?

রাশেদ কাঁচুমাঁচু হয়ে বলল- হ্যাঁ।

– এখন কোথায় যাচ্ছেন?

– শ্রাবণীকে পড়াতে যাচ্ছি।

– আসুন তাহলে। আমি শ্রাবণীর বড় বোন।

মেয়েটি রাশেদের হাত ধরে রিকশায় উঠল। রাশেদের বুক শুকিয়ে এল। কোনো মেয়ের সঙ্গে রিকশায় উঠেছে জীবনের প্রথম। তা ছাড়া এমনিতেও রাশেদ রিকশায় চলে না কখনোই।

রাশেদের প্রচণ্ড অস্বস্তি লাগছে। রিকশাওয়ালা বয়স্ক। রিকশা চলছে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে। রিকশা এখন জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদের পাশে বসে আছে সুন্দরী, রূপবতী এক তরুণী। আর রাশেদ? তার গায়ে তিল পড়া সাদা শার্ট, চুলগুলো তেল ছিপছিপে। মুখজুড়ে তেল। গায়ে ঘাম। মেয়েটা কানে হেডফোন গুঁজে আনমনে গান শুনছে। রাশেদের অস্বস্তি বাড়তে থাকে।

৩.

মেয়েটির নাম ঈশিতা। রাশেদের সঙ্গে ঈশিতার পরিচয়টা আজ থেকে তিন মাস আগে। ঈশিতা বড় ঘরের মেয়ে, বাবা কোটিপতি।

সময় চলে যায়, রাশেদের সঙ্গে ঈশিতার ভাব জমে যায়। কেমন অজানা এক টান অনুভব করে ঈশিতার জন্য। সে কি ঈশিতাকে ভালোবেসে ফেলেছে? ঈশিতাও আনমনে থাকে আজকাল। কে জানে প্রেমে পড়েছে কি না।

আজকাল রাতে ঘুমাতে পারে না রাশেদ। বুকটা ধড়ফড় করে করে। কখনো ভালো লাগে। আবার কখনো ভয় হয়। কারণ ঈশিতার আরো একটি পরিচয় আছে, সে রাশেদের ছাত্রী শ্রাবণীর বোন।

৪.

সময় পেরিয়ে ঈশিতার সঙ্গে মন বিনিময় হয় রাশেদের। দুজন দুজনকে ভালোবাসে। তবে এই ভালোবাসা ঈশিতার বাবার চোখ এড়ালো না। একদিন জ্যামে বসে তিনি দেখলেন- ঈশিতা আর রাশেদ রিকশায় বসে আসে। ঈশিতা হাসছে খিলখিল করে। ঈশিতার কপালের কোণে চুল পড়ছে, রাশেদ হাত দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে চুলগুলো।

ঈশিতার বাবা আনোয়ার সাহেব রাশেদকে ফোন করে ডেকেছেন তার অফিসে। রাশেদ খুশি মনে অফিসের দিকে রওনা হলো। আজ মাসের প্রথম তারিখ। আজ হয়তো মাসের বেতন-টেতন দিতেই ডেকেছেন। রাশেদ ভাবল, কিছু টাকা পাঠাবে বাড়িতে। কিছু টাকা রাখবে নিজের কাছে। বাকি টাকা দিয়ে ঈশিতাকে নিয়ে ঘুরবে।

আনোয়ার সাহেবের অফিস থেকে রাশেদ বের হলো মুখ কালো করে। অজানা এক ভয় জাপটে ধরেছে তাকে। হঠাৎ পকেটে থাকা মুঠোফোন বেজে উঠলো। কেউ একজন কাঁদতে কাঁদতে বলল, তোর চাচা আর নেই।

রাশেদের চোখ থেকে জল গড়ালো। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। রাশেদের কান্না দেখলো না কেউ।

৫.

তিন বছর পরের ঘটনা, রাশেদ একটি অফিসে ম্যানেজার পদে চাকরি করছে। ঢাকায় ছোট একটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে।

রাশেদ এখন দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে।

এই তিন বছরে রাশেদের জীবন থেকে সব আপন মানুষ চলে গিয়েছে। চাচা মারা যাওয়ার এক বছরের মাথায় মারা গিয়েছেন রাশেদের চাচি।

এ পৃথিবীতে রাশেদের আপন বলতে আর কেউ নেই। নেই কোনো ভিটেমাটি। সবকিছু পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গিয়েছে। রাশেদের বাবা, মা, চাচা, চাচি সবার কবর সবকিছু সর্বনাশা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গিয়েছে। রাশেদের কিছু নেই, কেউ নেই।

রাশেদ তাকিয়ে আছে নদীর দিকে। খরস্রোতা নদী বয়ে যাচ্ছে। একটু একটু করে ভাঙছে নদীর পাড়।

:: বাংলাবাজার, সদর, বরিশাল

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj