কথামনির মাটির ব্যাংক

বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯

আহমাদ স্বাধীন

স্কুল থেকে ফিরেই কথামনি ওর মাটির ব্যাংকটা বের করে। এরপর স্কুল ব্যাগের চেইন খুলে পেন্সিল বক্স খোলে। তারপর বক্স থেকে বিশ টাকার চকচকে একটা নোট নিয়ে ভাঁজ করে ব্যাংকের লম্বা চিকন ফুটায় ঢুকায়।

তখন কথার মুখে পরিতৃপ্তির একটা সরল হাসি দেখা যায়।

পাশে দাঁড়িয়ে ওর মা জানতে চান- কি ব্যাপার কথামনি আজো কি তোমার টিফিনের টাকা বেঁচে গেল?

কথা ওর কচিমুখের হাসিটুকু ঝুলিয়ে রেখেই জানায়- হ্যাঁ আম্মু। তুমি তো বক্সে অনেক নুডুলস দিয়ে দাও, এ জন্যই তো অন্য কিছু খাওয়া হয় না!

কথার আম্মু জানেন, এটা হচ্ছে ওর

বাহানা। টাকা জমানোর বাহানা।

এই বাহানা চলে প্রায় প্রতিদিন। গত বছর পহেলা বৈশাখ মেলায় বেড়াতে গিয়ে ইয়া বড় একটি আম দেখে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল কথা। ওর বাবার কাছে ভীষণ অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল- এত বড় আম কি করে হলো?

তখন কথার বাবা ওর ভুল ভেঙে দিয়ে জানিয়েছিল যে এটা আম নয়, আমের মতো করে বানানো মাটির ব্যাংক। এরপর কথার বায়নায় ব্যাংকটি কিনে আনতে হয় বাড়িতে।

সেই থেকে শুরু হয় কথার টাকা জমানোর নানান অজুহাত। বেশিরভাগ সময়ই ওর টিফিনের টাকাটা খরচ না করে ব্যাংকে জমায়। শুধু টিফিনের টাকাই না, ছুটির দিনগুলোতে ওর বাবা যদি বিশেষ কিছু কিনে দিতে চায়, তখন কথা সেটা না নিয়ে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে নেয়। আর জমা করে ব্যাংকে। ওর কাছে এটা যেন মজার এক খেলা।

কথা শুধু টাকা জমাই করে না, সেই জমানো টাকা নিয়ে নানান পরিকল্পনাও করে।

যেমন মায়ের কাছে জানতে চায়- আম্মু, আমরা যে ওইদিন মার্কেটের খেলনার দোকানে অনেকগুলো বারবি ডল আর টেডিবিয়ার দেখলাম, ওগুলোর দাম কত হবে?

জবাবে মিষ্টি হাসি দিয়ে মা বলেন- অনেকগুলো টাকা!

এরপর কথামনি ওর ব্যাংকটা দেখিয়ে বলে- আমার ব্যাংকেও তো অনেকগুলো টাকা আছে, এই ব্যাংকটা ভেঙে সবগুলো পুতুল কিনে আনব।

যদিও এই মাটির ব্যাংকের সামান্য কটা টাকা দিয়ে তা সম্ভব নয়, তবু কথাকে খুশি করতে দ্বিগুণ উৎসাহ দিয়ে তিনি বলেন- ঠিক আছে মামনি।

কখনো আবার কথা তার ব্যাংক ভেঙে সব টাকা ওর বাবাকে দিয়ে দিতে চায়। বলে- বাবাকে আমার এই সব টাকা দিয়ে বলো একটা বড় গাড়ি কিনে দিতে। সেই গাড়িতে চড়ে আমরা সবাই বেড়াতে যাবো।

আবার কখনো বলে- আমার জমানো এই সবগুলো টাকা দিয়ে একটা বড় হাতি কিনবো।

কথা হাতি দেখেনি, শুধু বইতে ছবি দেখেছে। আর সেখান থেকেই ওর হাতি পোষার ইচ্ছা!

সে দিন ছিল শুক্রবার। কথার কিন্ডারগার্টেন বন্ধ। ওর বাবার অফিসও বন্ধ।

সপ্তাহের এ দিনটায় কথা সারাদিন বাবার সঙ্গেই থাকে। সকালে উঠেই একসঙ্গে নাস্তা করে বাবার হাত ধরে বেরিয়ে যায় বাজারের উদ্দেশ্যে। সে দিন কথার পছন্দমতোই বাজার করেন বাবা।

বাজার করে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল বাবা-মেয়ে। ওদের বাসা থেকে বাজারের দূরত্ব অল্পই। গাড়ির দরকার হয় না।

পৌষের মাঝামাঝি সময়। শীতের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। বাবার বাঁ হাতের আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল কথা।

আঙুল দিয়ে বাবাকে দেখালো পথের পাশেই নোংরা আবর্জনার মধ্যে এক লোক পড়ে আছে।

বাবা কথাকে নিয়ে ওদিকে এগিয়ে যান। আর জানতে পারেন, মধ্যবয়স্ক ওই লোকটাকে গতকাল রাতে ছিনতাইকারীরা মারধরের পর টাকাপয়সা কেড়ে নিয়ে চোখে মলম লাগিয়ে রাস্তায় ফেলে গেছে।

কথা ছিনতাইকারী কাকে বলে জানে না। তাই বাবার কাছে জানতে চাইলো- বাবা ছিনতাইকারী কি?

বাবা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন- ছিনতাইকারী হচ্ছে খারাপ মানুষ, যারা অন্যদের কাছ থেকে টাকাপয়সা জোর করে কেড়ে নেয়।

কথার চোখে-মুখে বিস্ময়! অবাক হয়ে লোকটাকে দেখছে। লোকটার চোখ লাল হয়ে আছে মলম দেয়ার কারণে। সে বারবার বলছে- আমার পোলা মাইয়ার লাইগ্যা শীতের সোয়েটার নিয়া বাড়ি যাইতাছিলাম। ছিনতাইকারীরা আমার ব্যাগ আর টাকাপয়সা সব লইয়া গেছে। এহোন আমি কি করমু?

লোকটাকে ঘিরে পথচারীরা কিছুক্ষণ দাঁড়াচ্ছে আবার চলেও যাচ্ছে। কেউ কোনোরকম সহানুভূতি দেখাচ্ছে না। কথার কচিমনটা ব্যাকুল হয়ে পড়ে লোকটার এ অবস্থা দেখে।

তাই ও বলে- বাবা, দেখো না উনি কেমন করে কান্না করছেন। ওনার কি শরীরে ব্যথা করছে খুব?

বাবা জবাবে বলেন- হ্যারে মা, ইনি খুব গরিব মানুষ। অনেক কষ্টে কিছু টাকা রোজগার করে ছেলেমেয়ের জন্য শীতের কাপড় নিয়ে গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছিলেন। সেই শীতের কাপড়সহ টাকাপয়সা যা ছিল সব ছিনতাইকারীরা নিয়ে গেছে। এখন শীতের কাপড় কোথায় পাবেন আর বাড়িতেই বা কি করে ফিরবেন? এসব ভেবে কাঁদছেন।

– ও, তাহলে তো ওনার কাছে এখন আর টাকা নেই। না?

– না,

– তোমার কাছে টাকা আছে বাবা? ওনাকে কিছু টাকা দেবে?

হুট করে মেয়ের এমন কথায় বাবা কিছুটা অবাক হন। আবার মেয়ের উদার মানসিকতায় বেশ খুশিও হন। পরক্ষণেই মানিব্যাগ বের করে কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলেন- নারে মা, আমার কাছে যে টাকা আছে তা দিয়ে তেমন কিছুই হবে না। ওনার গ্রামের বাড়ি ফিরে যাওয়া, আবার ছেলেমেয়েদের জন্য শীতের পোশাক কেনা। এতে একটু বেশিই টাকা লাগবে।

বাবার কথায় কথামনি কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলো। তারপর কথার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

ও বলল- বাবা ওনাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাই চলো। তারপর আমার মাটির ব্যাংকের সবগুলো টাকা দিয়ে দেব। সেই টাকা দিয়ে তো উনি আবার শীতের জামা কিনতে পারবেন। বলো পারবেন না?

– হ্যাঁ মা, অবশ্যই পারবেন।

কথার বাবার ভেতরটা গর্বে ভরে উঠল। তিনি একটা রিকশা করে লোকটাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এরপর তাকে গোসল করানো হলো, খাওয়ানো হলো, বাড়ির সমস্ত খোঁজ খবর নেয়া হলো। এই পুরো সময়টা কথা তার পাশেই ছিল।

তারপর যখন তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করলেন, তখন কথা তার হাতে তুলে দিল ওর নিজের অত্যন্ত প্রিয় মাটির ব্যাংকটি।

কথা যখন ব্যাংকটি তার হাতে তুলে দিচ্ছে তখন লোকটির চোখে বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জল।

এই দেখে কথা জানতে চাইল- আপনি এখনো কাঁদছেন কেন আঙ্কেল? এই টাকা দিয়ে আবার শীতের জামা কিনতে পারবেন তো!

লোকটি এবার কথার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন- তুমি একদিন অনেক বড় হইবা মা। আমি আল্লার কাছে দোয়া করতাছি, তোমার যেন কখনো কোনো বিপদ-আপদ না হয়। তুমি মানুষটা এত্ত ছোট, কিন্তু মনডা অনেক বড়। অনেকদিন বাঁইচা থাকবা মা।

কথামনিকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করে মাটির ব্যাংক ভর্তি টাকা নিয়ে লোকটা চলে গেলেন তার ছেলেমেয়ের কাছে।

পেছনে পরিতৃপ্তির হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকল কথামনি।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj