প্রতিবন্ধীদের কণ্ঠস্বর ‘মিষ্টি’

সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

‘কয়েক বছর আগেও যারা আমাকে করুণার চোখে দেখত, সহানুভূতির মোড়কে তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিত আজ তারাই আমার কাজের প্রশংসা করে। আমাকে দেখে এগিয়ে এসে কথা বলে। করমর্দনের মাধ্যমে হৃদয়ের উষ্ণতা দিতে চায়। তখন মনে হয়, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি একজন মানুষের জীবনে আর কীইবা থাকতে পারে? যারা হুইল চেয়ারকে আমার অক্ষমতা মনে করত তাদের ভুল ভাঙাতে পেরেছি। এটিই আমার জীবনের বড় অর্জন।’ নিজের প্রাপ্তির মূল্যায়ন এভাবেই করেন আশরাফুন নাহার মিষ্টি।

শত প্রতিক‚লতার মধ্যেও প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষায় প্রায় দুই দশক ধরে কাজ করছেন মিষ্টি। সমমনা সাত বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ২০০৭ সালে গড়ে তোলেন প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন (ডব্লিউডিডিএফ)। প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা আর হুইল চেয়ারটিকে সঙ্গী করে বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে মিষ্টি পৌঁছেছেন আজকের এই অবস্থানে। ডা. আজহারুল ইসলাম ও আমিরুন নেসা দম্পতির ১১ সন্তানের মধ্যে মিষ্টি দশম। বাবা-মা সব সময়ই চাইতেন লেখাপড়ার পর্ব শেষ করে তবেই চাকরি। এর আগে নয়। মূলত সেই অনুপ্রেরণাতেই মিষ্টির এত দূর আসা।

হুইল চেয়ারবন্দি জীবন সম্পর্কে বলতে গিয়ে যশোরের ঝিকরগাছার মেয়ে মিষ্টি জানান, ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর মাস। বৃষ্টি ভেজা একদিন বাড়ির ছাদ থেকে শুকাতে দেয়া কাপড় ও আচারের বোয়াম আনতে গিয়েছিলেন মিষ্টি। হঠাৎই পা পিছলে রেলিং ছাড়া ছাদ থেকে পড়ে অনেক দূরে ছিটকে পড়ে তিনি। স্পাইনাল কডে আঘাতজনিত কারণে বুকের কাছ থেকে নিচের অংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়ে দিয়েছিলেন মিষ্টিকে বাকি জীবন হয় বিছানায় শুয়ে নয়তো হুইল চেয়ার ব্যবহার করে কাটাতে হবে।

মিষ্টি বলেন, আমার পুরোপুরি সুস্থ হতে প্রায় দেড় বছর সময় লেগেছিল। এর মধ্যে আমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সময় চলে আসে। টেস্ট পরীক্ষার মাত্র তিন মাস বাকি ছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম পরীক্ষায় অংশ নেব। কিন্তু আমি যেহেতু বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিলাম তাই শিক্ষকরা কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন আমি পারব কিনা। টেস্ট পরীক্ষায় আমি প্রথম হই এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ নিয়ে আমি পাস করি। অনার্সে ভর্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই। কিন্তু ভাইবার সময় আমাকে শিক্ষকরা বললেন, তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। বিশেষ করে হুইল চেয়ারে করে ক্লাস করা সম্ভব নয়। যশোরে এসে বিকমে ভর্তি হই। বিকম পাস করার পর মোহাম্মদপুর সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি কলেজে অ্যাকাউন্টিংয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হই। সেখানে ভর্তির সুযোগ পেতেও আমাকে দিতে হয়েছে নানা পরীক্ষা। মোকাবেলা করতে হয়ে অনেক চ্যালেঞ্জ। মাস্টার্সে জাতীয় মেধা তালিকায় প্রথম হই আমি। বাবা চেয়েছিলেন পিএইচডি করার পর যাতে চাকরিতে জয়েন করি। বিসিএসসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির লিখিত পরীক্ষায় পাস করার পরও মৌখিক পরীক্ষার জন্য আমার কার্ড আসেনি। ফলে আর চাকরি করা হয়নি। ২০০১ সালে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতিতে কাজে যোগ দেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল কোর্সে ভর্তি হই। এর মধ্যে জাপানে ১১ মাসের একটা স্কলারশিপ পাই। জাপান থেকে ফিরে এসে দেখি আমার এমফিলের ভর্তি বাতিল করা হয়ে গেছে।

মিষ্টি মনে করেন প্রতিবন্ধিতা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। নিজের জীবনের শিক্ষাগুলো থেকেই প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির তাগিদ অনুভব করেন তিনি। এই কাজটি করতে পারলেও তিনি মনে করেন নেতৃত্ব পর্যায়ে এখনো প্রতিবন্ধী নারীরা আসছেন না। আসতে পারছেন না।

মিষ্টি বলেন, পানি খাওয়া থেকে শুরু করে হাঁটাচলাসহ দৈনন্দিন রুটিনের সব কাজে আমাকে প্রতিটি সেকেন্ড মেপে চলতে হয়। কারণ আমার স্পাইনাল কডে সমস্যা এবং হুইল চেয়ারে করে আমাকে চলাফেরা করতে হয়। প্রতিবন্ধীদের সহজভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা সমাজে এখনো তৈরি হয়নি। অবকাঠামো, রাস্তাঘাট কিংবা যানবাহন- এসব ক্ষেত্র এখনো প্রতিবন্ধীবান্ধব করে গড়ে তোলা হয়নি। ফলে প্রতি পদে পদেই আমাদের বাধা পেতে হয়। এ জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার। তবে আমি বলব বর্তমান সরকার প্রতিবন্ধীবান্ধব সরকার। তবে সরকার এবং আমাদের কাজের ব্যাপ্তি আরো বাড়াতে হবে।

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অস্ট্রিয়া, আয়ারল্যান্ড, জাপান, পাকিস্তান থেকে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন মিষ্টি। বাংলাদেশে উইমেন্স ফোরাম পুরস্কার, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ থেকে সম্মাননা এবং অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। আমেরিকান সরকারের আমন্ত্রণে ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর লিডারশিপ প্রোগ্রামে অংশ নিতে তিন সপ্তাহের জন্য ওয়াশিংটন ডিসিতে যাচ্ছেন মিষ্টি। সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন মিষ্টির সব প্রেরণার মূলে থাকা তার ছোট ভাই মাহমুদুল্লাহ আল মামুন। এসব প্রাপ্তি তাকে আরো বেশি কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়। মনে করিয়ে দেয় তাকে আরো কাজ করতে হবে। মিষ্টি বিশ্বাস করেন, ইচ্ছাশক্তি ও একাগ্রতা থাকলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই বাধা হতে পারে না। প্রতিবন্ধিতা নিয়েও মানুষ এভারেস্ট জয় করতে পারে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj