‘জড়ভরত’ হয়ে থাকা আর কত?

সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

স্মৃতি কণা বিশ^াস

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা সাড়ে ১১টা। বাসা থেকে বেরিয়ে গলি দিয়ে হেঁটে বড় রাস্তা পার হচ্ছিল রুহি (ছদ্মনাম)। মেট্রোরেলের কাজ চলছে; কিছু নির্দিষ্ট জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। আনুমানিক ৪৭/৪৮ বছরের একটি লোক রাস্তার বিপরীতে যাচ্ছিল। আচমকা চোখে চোখ পড়তেই রুহিকে বাজেভাবে একটা ইঙ্গিত করে লোকটি। ঘেন্নায় রুহির গা গুলিয়ে ওঠে। লোকটি দ্রুত পায়ে রুহির গাঘেঁষে চলে যাচ্ছিল আর বিশ্রী ভাষায় কতগুলো গালি দিল। রুহির মাথায় আগুন চড়ে, এমন বাজে ভাষা বলে কেন পার পাবে সে? দৃঢ় কণ্ঠে রুহির প্রশ্ন, আপনি নোংরা ভাষা বললেন কেন? উত্তর দেয়ার বদলে লোকটি আরো বাজে ভাষায় চিৎকার করতে লাগল। অবস্থা এমন হলো যে, পারলে লোকটি রুহির গায়ে হাত তোলে।

বিনা টিকিটে মজার সিনেমা দেখার মতো রাস্তার সবাই ঘটনাটি উপভোগ করছিল। এত এত মানুষের মধ্য থেকে কেউ টুঁ শব্দটিও করল না। এতে রুহির রাগ যেন আরো বেড়ে যায়। এবার রুহিরও গলা চড়ে। ‘এই তুই মেয়েদের বাজে ভাষায় টিজ করলি কেন জানোয়ার?’ লোকটি গালি দিতে দিতে রাস্তা পার হয়ে উল্টো দিকে দৌড়াচ্ছে। কিছুদূরে গিয়েই একটা দোকানে ঢুকল লোকটি। দোকানদারকে বের করে রুহিকে বলতে লাগল, ‘তুই এখানে আয়…! তোর কথার উত্তর দেই।’ এই বলে আবারো চিৎকার করে রুহিকে গালি দিতে থাকে। রুহি বুঝল ওই দোকান হয় ওই লোকটির না হয় সেখানে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে। এত কিছু ঘটে যাচ্ছে অথচ রাস্তার লোকজনের নীরব দর্শকের ভূমিকা দেখে রাগেকষ্টে রুহির তখন কান্না পাচ্ছিল। সাময়িক ভয়ও পাচ্ছিল। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে না থেকে রুহি দ্রুত একটা বাসে উঠে গেল। নিরাপত্তার অভাব বোধ থেকে বাসে উঠলেও প্রচণ্ড জ্যামে বাস ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। বাসের কাছে এসেও লোকটি রুহিকে গালাগাল করছে। রুহি বাসের লোকদের দিকে তাকিয়ে বলল, ভাই লোকটা আমায় যৌন হয়রানি করেছে। প্রতিবাদ করায় উল্টো গালি দিচ্ছে। কিন্তু বাসের সবাইও রাস্তার লোকজনের মতো নীরবে বসে রইলো! রুহির মনে হচ্ছিল, লোকটা যদি বাসে উঠে তাকে মারতেও শুরু করত কোনো যাত্রী হয়তো থামাতোও না!

রুহির মতো অনেক নারীকেই চলতি পথে শুনতে হয় অনাকাক্সিক্ষত আপত্তিকর অনেক কথা। কেউ মুখ বুজে এসব সহ্য করে। কেউ প্রতিবাদ করেও প্রতিকার পায় না। তবে সব সময় যে এমনটাই হয় তা নয়। কেউ কেউ নারীর পাশেও দাঁড়ায়। কিন্তু নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকা লোকের সংখ্যাই বেশি। তা যদি না-ই হয় তবে কেন এখনো নারীদের কেন এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়?

মহাভারতের যুগ শেষ হয়েছে সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে। কিন্তু আমাদের মানসিকতা এখনো সেই যুগেই। চোখের সামনে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটলেও পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এসব দেখে মনে পড়ে তিন বানরের কথা। খারাপ কিছু দেখব না, খারাপ কিছু বলব না, খারাপ কিছু শুনব না। কিন্তু এটা কি সমাধান? আইন করেই কি সব কিছুর সমাধান সম্ভব? ছোটবেলা পড়েছিলাম, ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’ আমরা কেউ কি মানি তা? নাকি সবাই নাকে সর্ষে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছি? যতক্ষণ না নিজের মা-বোন-মেয়েকে এভাবে কেউ রাস্তায় যৌন হয়রানি না করছে ততক্ষণ কি আমরা সবাই জড়ভরত হয়েই থাকব?

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj