উত্তরপত্র মূল্যায়নে ‘অবহেলা’ ৫৩ শিক্ষক কালো তালিকায়

সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯

অভিজিৎ ভট্টাচার্য : ঠিকঠাকভাবে চলতি বছরের জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে না পারার কারণে ৫৩ শিক্ষককে কালো তালিকাভুক্ত করেছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড। এর মধ্যে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষায় ৯, এসএসসিতে ১১ এবং এইচএসসিতে ৩৩ জন কালো তালিকায় রয়েছেন। এরা সবাই ঢাকা মহানগরীসহ ঢাকা বোর্ডের অধীনে বিভিন্ন স্কুল এবং কলেজের শিক্ষক পদে কর্মরত। তারা পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পরীক্ষকরা কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় এখন থেকে আর শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরীক্ষাসংক্রান্ত কোনো কাজে তাদের রাখা হবে না। পরীক্ষকদের কালো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি আর্থিকভাবেও জরিমানা করেছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ড। বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মুহা. জিয়াউল হক বিদেশ থেকে ফিরলে কালো তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে শাস্তির কথা জানানো হবে। একইসঙ্গে চিঠির একটি কপি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছেও পাঠানো হবে। জানতে চাইলে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের সচিব প্রফেসর তপন কুমার সরকার ভোরের কাগজকে বলেছেন, চিহ্নিত শিক্ষকদের কালো তালিকাভুক্ত করা ছাড়াও নানা ধরনের শাস্তি দেয়া হবে।

তবে তালিকাভুক্ত একজন শিক্ষক বলেছেন, বোর্ড থেকে উত্তরপত্র বিতরণের সময় আমাদের বলা হয়েছিল, উত্তরপত্রে যা কিছু লেখা থাক না কেন, আমাদের নম্বর দিতে হবে। কিন্তু মূল্যায়নের সময় দেখা যায়, উত্তরপত্রে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ও লেখা ছিল। এ অবস্থায় আমি কী মূল্যায়ন করব? মূলত উত্তরপত্রে বোর্ডের কথামতো নম্বর না দেয়ার কারণে আমাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ঠিকঠাকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে না পারার অভিযোগে ২০১৪ সাল থেকে শিক্ষকদের কালো তালিকাভুক্ত করা শুরু করে। সেবার কালো তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের নাম-পরিচয় বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু শিক্ষকরা বোর্ড কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে বলেন, ওয়েবসাইটে নাম-পরিচয় প্রকাশ করলে শিক্ষকদের মর্যাদাহানী ঘটে। শিক্ষকদের এই আবদার ঢাকা বোর্ড মেনে নিয়ে ২০১৫ সাল থেকে কালো তালিকাভুক্তদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করছে না। অদক্ষ শিক্ষকদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে দিচ্ছে।

তবে বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০১৪ সালের আগে থেকে যে শিক্ষকরা উত্তরপত্রে কম নম্বর দিতেন তাদের পরের বছর উত্তরপত্র মূল্যায়নে নিয়োগ করা হতো না। তাদের মৌখিকভাবে নিষেধ করা হতো। ২০১৪ সালে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শাস্তি পাওয়া শিক্ষকদের চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর আবুল বাশার বলেন, উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সময় শিক্ষকদের এই গাফিলতি ধরা পড়ে। এ সময়ই দেখা যায়, শিক্ষকরা ঠিকঠাকভাবে উত্তরপত্রে নম্বর দিতে পারেননি। এতে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে কালো তালিকাভুক্ত শিক্ষকদের সংখ্যা কমে আসছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক মাস আগে প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে সন্তুষ্ট না হয়ে উত্তরপত্র চ্যালেঞ্জ করে দুই হাজার ৭৩৯ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তন হয়েছে। তার মধ্যে ফেল করা শতাধিক শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ ৫ পেয়ে চমক তৈরি করেছেন। শুধু তাই নয়, নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩০৯ জন। ফেল থেকে পাস করেছেন ৬১৩ জন। প্রতিবছরের মতো এবারো এত বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তনের পেছনে পরীক্ষকদের গাফিলতি রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন বোর্ড কর্মকর্তারা।

শিক্ষকরা বলেছেন, একজন পরীক্ষককে কমপক্ষে ২৫০টি উত্তরপত্র দিয়ে মূল্যায়নের জন্য মাত্র ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে একজন পরীক্ষক দিনের অন্যান্য কাজের ফাঁকে ২৫০টি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে পারেন না। সেক্ষেত্রে সময়সীমা ঠিক রাখার জন্য পরীক্ষকরা তাদের ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করিয়ে নেন। এতে কিছু ভুল থাকে। যা পুনর্মূল্যায়নের সময় ধরা পড়ে। শিক্ষকদের মতে, হয় উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময়সীমা বাড়াতে হবে, নয় একজন পরীক্ষককে আড়াইশ’র বদলে একশটি উত্তরপত্র মূল্যায়নের জন্য দিলে ভুল কমে যাবে। এতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj