মেয়েটি এখন কী করবে

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

সামি একটি প্রাইভেট ফার্মে জব করে আর শিলা একটি কল সেন্টারে, ফেসবুকে ওদের পরিচয়। সামি ঢাকায় সাবলেট বাসায় ভাড়া থাকে। সে বেশ স্বাধীনচেতা মানুষ। অপরদিকে রক্ষণশীল পরিবারের সঙ্গে অনেকটাই পরাধীনতার শিকল পরে থাকতে হয় শিলার। সামি সবসময়ই উড়– উড়– মনের কাল্পনিক চিন্তা-ভাবনার ছেলে আর শিলা খুবই শান্ত-শিষ্ট বাস্তববাদী মেয়ে। ওদের মাঝে অনেক অমিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো কীভাবে যেন ওরা দুজন দুজনকে ভালোবাসাতে শুরু করেছে। তবে ভালোবাসি কথাটা বলছি বলছি করেও বলা হচ্ছে না।

হঠাৎই একদিন সামি প্রস্তাব করল, আগামীকাল সাপ্তাহিক ছুটির দিন আমরা দেখা করছি। শিলা এড়িয়ে যেতে চাইলেও না করতে পারল না। যথারীতি ঠিক করা সময়ে ঠিক জায়গাতে ওরা দুজন এসে হাজির হলো। শিলা আজ নীল রংয়ের শাড়ি পরে খুবই সুন্দর করে সেজেগুজে এসেছে। নীল রংয়ের শাড়ি পরার কারণ হচ্ছে সামির পছন্দের রং নীল। অসম্ভব সুন্দর লাগছে ওকে, যেন ডানাকাটা নীল পরী। সামি গাঢ় নেভি ব্লু রংয়ের জিন্স পেন্টের সঙ্গে একটি সাদা রংয়ের শার্ট পরে এসেছে। এখানেও কারণ হলো সাদা রং শিলার পছন্দ।

আজ দুজনকে দেখতে লাগছে বেশ। একসঙ্গে বেশ কিছু পথ হেঁটে তারা একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসল। তখন ওরা দুজন দুজনার চোখের দিকে তাকিয়ে কথাই বলতে পারছিল না। কেননা দুজন দুজনকে ভালোবাসি কথাটা বলার জন্য অস্থির হয়ে উঠে ছিল। সব সময়ই লেডিস ফার্স্ট হলেও ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফুটে না। সামিও বলি বলি করে বলতে পারছে না। খানিকটা সময় বসে রেস্টুরেন্টে অল্প কিছু খাবার পেটে গুঁজে বেরিয়ে পড়ল দুজন। মন না চাইলেও সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলে শিলা বিদায় নিতে চাইল কিন্তু প্রেমিক হৃদয় সামি কি করে অসম্পূর্ণ কথা রেখে বিদায় দিতে পারে? সামি বাসা অবধি পৌঁছে দেয়ার প্রস্তাব করলে, মুখে না করলেও শিলা বাধা দিল না। এই প্রথম ওরা দুজন দুজনার গা-ঘেঁষে রিকশায় বসল আর মনের সব জড়তা ধীরে ধীরে দূর হতে লাগল।

আলো-আঁধারি পরিবেশ যেন ওদের মনে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ সৃষ্টি করল, ঠিক যেন চুম্বকের মতো। হঠাৎ করে সামি ওর ডান হাত দিয়ে শিলার বাঁ হাত চেপে ধরল। শিলা প্রথমে অবাক হয়ে কেঁপে উঠল কিন্তু সামির হাত সরিয়ে দিতে পারছে না। শিলা যেন পাথরের মূর্তির মতো শক্ত হয়ে গেল। দুজনের হৃদকম্পন এতটাই বেড়ে গেছে, যেন হৃৎপিণ্ডটাই বেরিয়ে আসবে। আস্তে আস্তে দুজনেই স্বাভাবিক হতে লাগল, কিন্তু ইতোমধ্যেই রাস্তা ফুরিয়ে গেছে। শিলার বাসার সামনে আসতেই সে স্বাভাবিকভাবে সামির হাত সরিয়ে বলল, ‘সামনে আমার বাসা, আমি এখানেই নেমে যাব, তুমি রিকশা নিয়ে চলে যাও’। সামি যেন তখন কল্পনার রাজ্য থেকে বাস্তবে ফিরে এল। শিলা রিকশা থেকে নেমে দু’কদম হাঁটতেই সামি বলে উঠল, শিলা আমি তোমাকে ভালোবাসি। এই কথাটি শিলা শুনতে চাচ্ছিল কিন্তু তার মনের আনন্দের অনুভূতি বুঝতে দিল না। শিলা পেছনে একবার তাকিয়ে এক দৌড়ে বাসায় চলে গেল। বলতে গেলে এই দিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ওদের প্রেমের যাত্রা শুরু…

দিন কয়েক পর শিলা ওর মনের সুপ্ত কথাটা প্রকাশ করল সামির কাছে। তারপর যত দিন যাচ্ছে, দুজন দুজনকে আরো কাছে পেতে চাচ্ছে। অবসর পেলেই রঙিন প্রজাপতির মতো এদিকে ওদিকে কত ঘোরাঘুরি। দিনে দিনে এমন একটা রুটিন হয়ে গেল, শিলা প্রতি সাপ্তাহিক ছুটির দিন সামির বাসায় যাবে। সামির ঘর গুছিয়ে দিবে, ওর পছন্দের খাবার রান্না করবে এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আবার নিজের বাসায় ফিরে আসবে। এভাবেই একটি সুন্দর স্বপ্নের মাঝে কেটে যাচ্ছে ওদের রঙিন স্বপ্নের দিনগুলো। কিন্তু এই সুখ বেশি দিন সইলো না। একদিন পার্কে হাতে হাত ধরে ঘোরার সময় শিলার বড় ভাইয়ের সামনে ধরা পড়ে গেল। শিলার বাবা একজন ধার্মিক ও রক্ষণশীল মানসিকতার মানুষ। যার কারণে তিনি প্রকাশ্য দিবালোকে মেয়ের পার্কে বসে প্রেম করা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না। তিনি রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন। ওইদিন শিলা দুরু দুরু বুকে বাসায় ফেরার পর প্রচণ্ড রকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলো। বাসা থেকে বের হতে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো। ফলে শখের চাকরিটাও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে সে। এমনকি ওর মোবাইল ল্যাপটপ সবকিছুই জব্দ করে রাখা হয়েছে।

সামির বিরহে বিছানার বালিশ ও চোখের জল হলো শিলার বর্তমান অবলম্বন। ওই দিকে সামির জীবনে আসল আমূল পরিবর্তন। সেই সামি আর সামি নেই, পুরোপুরি বদলে গেছে। প্রিয়তমা শিলার বিরহে কোনো কিছুতেই ওর মন বসে না। নিয়মিতভাবে অফিসেও যাচ্ছে না, গেলেও কাজে মন বসে না। দুজন দুজনার দেখা পাওয়ার অপেক্ষা করছিল। যেন তীর্থের কাকের মতো আকাশ পানে চেয়ে থাকা এক ফোঁটা বৃষ্টির আশায়। হঠাৎই একদিন শিলা সুযোগ পেয়ে ওর মোবাইল চুরি করে এনে সামিকে থেকে ফোন করে। দুজন কোনো কথা বলতে পারছিল না, যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। মনের আবেগে বেশ কিছু সময় ওরা কাঁদল। তারপর কিছু কথার ফাঁকে শিলা বলল, তোমার জন্য একটি সারপ্রাইজ আছে। পরশু আমি আমার বান্ধবীর বিয়ের কথা বলে বেশ সময় নিয়ে বের হবো। সে দিন তোমার বাসায় আসব, ঠিক ওই দিনই সারপ্রাইজের কথাটা বলব। সামির মনের যতো জল্পনা কল্পনা, কি হতে পারে সারপ্রাইজ? যথারীতি দুদিন পরে শিলা এসে হাজির। অনেক দিন পর দুজন দুজনাকে দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারছে না, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আবারো সেই কান্না জুড়ে দিল। প্রিয়তমা শিলার চোখের পানি মুছে দিতে লাগল সামি। তারপর শিলার কপালে চুমু দিয়ে সামি আদর করতে লাগল। সামির আদর পেয়ে শিলার মনে এতদিন কাছে না পাওয়ার বেদনা ভুলে গেল। একটু স্বাভাবিকভাবে দুজন দুজনার সঙ্গে কথা বলতেই সামি অস্থির হয়ে সারপ্রাইজের কথা জানতে চাচ্ছিল। কিন্তু শিলার মনে অনেক ভয় ও শঙ্কা নিয়ে মুখে সারপ্রাইজের কথা বলতে পারছিল না।

ওর ব্যাগের চেইন খুলে একটি মেডিকেল রিপোর্ট সামির হাতে দিয়ে মুখে বলল, এই দিকে বাবা-মা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে। সামি মেডিকেল রিপোর্টের দিকে এক নজরে তাকিয়ে আছে আর শিলার হৃদকম্পন বেড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে সামি শিলাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আজ যে সারপ্রাইজ তুমি আমাকে দিয়েছো, এরচেয়ে বড় কোনো সারপ্রাইজ আমার কাছে হতে পারেন না। বাবা হতে পারার কি যে আনন্দ, আমি কোনোভাবেই তা প্রকাশ করতে পারব না। সামির কথাগুলো শুনে শিলার মনের সব ভয় ও আশঙ্কা দূর হয়ে গেল। খুশিতে ওর দুই চোখে অঝোর ধারায় আবারো অশ্রæ ঝরতে লাগল। এ যে কত আনন্দের কান্না যা সামি বারবার চেষ্টা করেও থামাতে পারছিল না। এক সময় শিলা শান্ত হলে, সামি বাসা থেকে বের হয়ে যায় শিলার জন্য বিয়ের শাড়ি কিনতে। কেননা সামি আজি শিলাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে। শিলা ওর দুই একজন বান্ধবীকে সামির বাসায় আসতে বললে, ওরাও ঝটপট চলে আসে। বান্ধবীদের সঙ্গে গল্পে-আড্ডায় বেশ ভালো সময় যাচ্ছে শিলার। আজ ওর বিয়ে বলে কথা।

সামি বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ বের হয়ে গিয়ে ছিল। যাওয়ার সময় বলেছিল একটা বিয়ের শাড়ি কিনেই চলে আসবে। তারপর সোজা কাজি অফিসে গিয়ে বিয়ের কাজটি সেরে নিবে। কিন্তু এখন সাতটা বাজে, সামির এখনো ফেরার নাম নেই। শিলা মোবাইল ফোনে কল দিতেই অপর প্রান্ত থেকে বলছে আপনার ডায়াল করা নাম্বারটি এখন বন্ধ আছে, একটু পরে আবার চেষ্টা করুন। শিলা বারবার চেষ্টা করছে কিন্তু সেই একই কথা। তবে কি হলো সামির, অনেক প্রশ্ন এখন শিলার মনে। রাজ্যের সব ভাবনা শিলাকে ঘিরে ফেলেছে। অপরদিকে বাসা থেকে মোবাইলে কলের পর কল আসছে। আর কত মিথ্যে কথা বলে বাসার মানুষকে বুঝিয়ে রাখা যায়। অবশেষে অনেকটাই বাধ্য হয়ে মোবাইল ফোনটা অফ করে দিল। শিলার বান্ধবীরা যতটা পারছিল, সাহস দিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু সময় যত বাড়ছে, সবাই তত নীরব হয়ে যাচ্ছে। একজন শিলাকে বলছে, চল বাড়ি ফিরে যাই। কাল আমরা এসে সামির সঙ্গে দেখা করে সবকিছু জেনে নেব। কিন্তু শিলার মনে এক অজানা ভয়, সামির কোনো সমস্যা হলো না তো? তাই ওদের কথায় সায় দিল না।

তখন আরেক বান্ধবী বলেই ফেলল, দেখ তোর সামি পালিয়েছে কিনা? শিলা এই কথাটা সহ্য করতে পারলো না। তাই ওর বান্ধবীর গালে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল। তারপর বলল, তোরা সব চলে যা, আমি একাই সামির জন্য অপেক্ষা করব। এদিকে রাত বেড়ে যাচ্ছে, তাই বান্ধবীরা সবাই চলে গেল। এখন রাত ১০টার কাছাকাছি, এখনো সামি ফিরছে না, তবুও শিলার অপেক্ষা…

হঠাৎই পাশের ফ্ল্যাট থেকে টিভি চ্যানেল সংবাদে শুনতে পেল, সড়ক দুর্ঘটনায় বাসে চাপা পড়ে একজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শিলা অজানা আশঙ্কায় তাড়াতাড়ি টিভি চালু করতেই সেই সংবাদটি ধরে ফেলল। টিভির পর্দায় সামির বিধ্বস্ত লাশের ছবি দেখেও চিনতে ভুল হলো না।

সামির গায়ে আজো সেই সাদা রংয়ের শার্ট তবে রক্তের রঙে লাল হয়ে গেছে। শিলা এখন আর কাঁদতে পারছে না, সে বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। কোনো ভাবনাই তার মধ্যে কাজ করছে না, নির্বিকার দৃষ্টিতে এক অজানা ভবিষ্যতের দিকে সে তাকিয়ে আছে। যেন সব অনুভূতি আজ হারিয়ে ফেলেছে।

এদিকে সামির শেষ স্মৃতি তার গর্ভে আর অপরদিকে বাসায় বিয়ে চাপ। শিলা এটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে, যদি সে বাসায় ফিরে যায়, তবে সামির শেষ স্মৃতি অঙ্কুরেই মেরে ফেলা হবে। কিন্তু সে এটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবে না। তাদের ভালোবাসার ফসল কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। কিন্তু শিলা যে বিবাহিত নয়, সামিও আর বেঁচে নেই। তার সামনে দীর্ঘ একটা জীবন পড়ে আছে। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করছে, তার প্রিয় সাদা রংয়ের পোশাক পরে সামির স্মৃতি নিয়ে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিবে নাকি নীল রংয়ের কষ্ট বুকে নিয়ে আবার বাসায় ফিরে যাবে?

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj