সেই ভুতুড়ে সন্ধ্যায়

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯

শেখ শামীমা নাসরীন পলি

তখন ঘোর সন্ধ্যা। মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আজানের ধ্বনি। প্রকৃতি নিস্তব্ধ। গাছের পাতারাও দুলতে ভুলে গেছে। গাঁয়ের প্রতিটি ঘরে ঘরে হারিকেন, কুপি জ্বালানো হয়েছে। তখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি। সালটা ছিল ১৯৯৮। মাসটা ছিল ইংরেজি মার্চের প্রথম দিক আর বাংলা ফাল্গুনের শেষের দিকে।

তখন আমার বয়ঃসন্ধিকাল চলছে। আর এ বয়সটা হলো ছেলেমেয়েদের জীবনে মারাত্মক একটা সময়। এজন্য তো বয়ঃসন্ধিকালকে ঝড়ঝঞ্ঝার কাল বলা হয়।

সে সময়টা ছিল আমার জন্য খুব বাজে একটা সময়।

সন্ধ্যা হলে আমার চারপাশটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগত। কোনো কিছু ভালো লাগত না। খুব কান্না পেত। দরজা-জানালা বন্ধ করে কাঁদতাম। রাতে ঘুম হতো না। একা একা উঠানে হাঁটতাম।

তো সেই সন্ধ্যায় আমি আমাদের উঠানে দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের পাড়াটাকে বলা হয় উত্তর পাড়া। গ্রামের মধ্যে উত্তর পাড়াটা সবচেয়ে বড় পাড়া। আমাদের বাড়ির উত্তরে ফাঁকা মাঠ। তারপর যে গ্রাম তার নাম মাজড়া।

আমি মাজড়া গ্রামের দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছি। ও গ্রামের মিটিমিটি হারিকেন, কুপির আলো দেখা যাচ্ছে।

আমার চুল খোলা। বাতাস নেই। গরমও পড়েছে খুব। দেখি ছোট্ট একটি ছেলে সামনের ঘরের কানছি (পাশ) দিয়ে উত্তর দিকে হাঁটছে। আমাদের বাড়ির সব বাচ্চাকে আমি চিনি। কিন্তু এ বাচ্চাটিকে চিনি না। উলঙ্গ শরীরে হেঁটে যাচ্ছে। আমিও পেছন পেছন যাচ্ছি আর ডাকছি, এই তোর নাম কী? কোন বাড়ি থেকে আসছিস? তোর বাপের নাম কী? দাঁড়া, শোন…

না, ছেলেটি আমার কোনো কথা শুনছে না। দ্রুত হাঁটছে। আমি তার সঙ্গে হেঁটে পারছি না। সে বাড়ির নিচে নামতে নামতে পেছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। আমি হতবাক! পলকের মধ্যে এ কী করে সম্ভব? খিলখিল করে এক বুড়ি হাসছে। সাদা কাপড় পরা। হাতে লাঠি। আমাকে ডাকছে, আয় আমার সঙ্গে আয়…।

আমার পা যেন অবশ হয়ে গেছে। আমি একটুও নড়তে পারছি না। আমার মনে হলো দক্ষিণ দিক থেকে জোরে বাতাস উঠতে শুরু করেছে। আমার চুলগুলো মুখের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে। বুড়ি মাথা দুলিয়ে হাসছে। আমার শরীর কাঁপছে। আমি শব্দ করে উচ্চারণ করলাম, লাইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুম মিনাজ জুয়ালেমিন।

মুহূর্তের মধ্যে বড় একটা আগুনের দলা কুণ্ডলি পাকিয়ে মিলিয়ে গেল। তারপর কীভাবে যে এক দৌড়ে রুমে এসেছিলাম জানি না। রাতে এলো জ্বর। সারা রাত সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া ঘটনাটা চোখের মধ্যে ভাসল। সকালে দেখি আমার সারা শরীরে ছোট ছোট ফোঁড়া। কী ব্যথা! দাদি বলল, জলবসন্ত হয়েছে।

:: পাফোস-১৭৮৩, লালবাগ, ঢাকা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj