চোর

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯

জুবায়ের সৈয়দ

এক চোরকে বেদম মারা হলো। চোরটা প্রায় আধমরা অবস্থা। হাত-পা বাঁধা শুধু কোঁ কোঁ শব্দ করছে আর বলছে, একটু পানি-একটু পানি। মুখের বেশ কিছু স্থান দিয়ে রক্ত ঝরছে। জামাকাপড় ছিঁড়ে একাকার। কেউ তার কাছে যায়নি। একটু পানিও দেয়নি। চোরের মার খাওয়া দেখতে সবাই এসেছিল। যেন এক বানর খেলা। দেখে যাবার সময় কেউ একটা লাথি, কেউ একটা থাপ্পড় আবার কেউবা থুথু দিয়েছে। চোরটার নাম কি কেউ জানে না।

আদতে চোর ছিল কিনা, নাকি এবারই প্রথম চুরি করতে ধরা পড়ল, কে জানে? প্রশ্নটা এল বাড়ির বড় মেয়ে জবার মাথায়। সে ঘরে বসে সব শুনেছে কিন্তু দেখেনি। বাসায় সবাই বেশ ধর্ম কর্ম করে। তাই সারাদিন কেউ না কেউ আসার কারণে মেয়েরা বের হতে পারেনি। তবে ছোট মেয়ে জুঁই মাঝে মাঝে দেখে গিয়ে নারীমহলে তথ্য জানিয়েছে। তার এই জানানোর আবার একটা ভঙ্গিমা আছে। চোরের আশপাশে কিছুক্ষণ ঘুরে দেখবে কে কি করছে তারপর ঘরের ভেতরে দৌড়ে গিয়ে খবরপাঠের মতো করে শুনাবে।

জুঁই : এই মাত্র আমরা জানতে পারলাম যে চোরটি তার এক চোখ দিয়ে কিছুই দেখতে পারছে না। ঠোঁটের কর্নার দিয়ে রক্ত ঝরছিল, তা এখনো থামেনি। মাথাও মনে হয় ফেটেছে। ওদিকে আবার জব্বার চাচা চোরকে দেখতে এসে একটি কষে চর মেরে নিজেই ব্যথা পেয়েছেন। উনি আরো বলেছেন, এই চোরের নাকি গা খুবই শক্ত। একে কম মারা হয়েছে, একে আরো ঘণ্টাখানেক পেয়ারা গাছের ডাল দিয়ে পিটানো উচিত। এদিকে আবার চোরকে দেখে নাকি ছকিনা খালার গা গুলিয়েছে। সে ভেবেছিল একটা চর দেবে, কিন্তু চোরের গায়ে হাত লেগে যাবে বলে মুখে থুথু দিয়েছে। এই হচ্ছে এখনকার সংবাদ। পরবর্তী সংবাদ শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকুন।

জবা একটা থাপ্পড় মারল জুঁইকে। এতে জুঁই মোটেও কাঁদলো না, মনোক্ষুণœও হলো না। বরং ভেংচি কেটে গালে হাত দিয়ে দৌড়ে পুনরায় চোরকে দেখতে চলে গেল।

মাগরিবের আজান দিলে সবাই যে যার মতো চলে গেল। চোরটা একাই পরে রইলো উঠানে। হাত-পা বাঁধা। হঠাৎ হঠাৎ পানি পানি বলে ক্ষীণস্বরে আওয়াজ করছে চোরটা। জবা একটা জগ ও মগ নিয়ে চোরটার চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে দিতেই সে নড়েচড়ে উঠল আর বলল পানি খাব। মগটা চোরের ঠোঁটে ধরতেই ঢকঢক করে পানি খেল।

জবা বলল, নাম কি আপনার?

চোর বলল, নাম শুনে কাম কি আপা। চড়-থাপ্পড়, লাথি, থুথু যেটা মনে চায় দেন… আমার ব্যথা লাগে না।

– আমার নাম জবা, শোনেন যদি চড়-থাপ্পড় দিতাম তাহলে পানি নিয়ে আসতাম না।

– ঠিক বলেছেন আসলে মাথাটা কাজ করতেছে না, মাথাটায় এত জোরে মারছে যে কাজ করছে না ঠিকমতো। আপা, আমার নাম লেবু। আর একটু পানি খাব, দম আটকায় আসতেছে।

জবা মগটা ঠোঁটের কাছটায় ধরলে সবটুকু পানি খেয়ে ফেলে চোরটা। এরপর জবা বলল- লেবু আবার কেমন নাম?

– আপনার নাম ফুলের নামে আর আমার নাম ফলের নামে। আপা জবা ফুলটা তেমন সুন্দর কোনো ফুল না আবার সুগন্ধও তেমন নাই। আপনের নাম বেলি হলে ভালো হতো। সুন্দর আবার সুগন্ধী।

– আপনি কথা বেশি বলেন। সেজন্য মাইর বেশি খেয়েছেন। কম কথা বললে কম মারা হতো। আপনাকে তো চোর মনে হয় না। তো কী চুরি করতে ধরা খেয়েছেন?

– ইয়েস, ইউ আর রাইট। আই অ্যাম নট এ থিফ। আই এম এ গ্র্যাজুয়েট ইন ইংলিশ ফ্রম কেসি গভর্মেন্ট কলেজ ইন নাইনটিন নাইনটি সিক্স। হয়েছে কি- কোনো এক চোরকে ধাওয়া করছিল। আমি রাস্তার মোড়ে ট্যাম্পোর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটা লোক দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ভাই দৌড়ান। ওদিকে বিশাল গণ্ডগোল, দৌড়ান। বলেই লোকটা পাশ দিয়ে চলে গেল আর আমি ভয় পেয়ে দৌড় শুরু করলাম। পেছন ফিরে দেখি অনেক লোক দৌড়ে আসছে। আমি ভাবলাম সত্যি কোনো গণ্ডগোল, কিছুদূর যেতেই শুনি সবাই ‘চোর চোর’ বলছে, আমি তখন বুঝতে পারলাম যে চোরটা আমাকে বোকা বানিয়েছে। তাই ধরা পড়ার পর থেকে এক-দুইবার বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কি করা, কেউ তো শুনলো না। তাই হাসিমুখে মার খাওয়া শুরু করলাম।

– ইস্! আপনি মনে হয় অনেক ব্যথা পেয়েছেন? তাই না?

– এটা কোনো ব্যথা না। মাইরের ব্যথা তো থাকে না বেশিদিন। ঠিক হয়ে যায়।

– কী আবোল-তাবোল বলছেন?

লোকটার জন্য খুব মায়া হলো জবার। চোখের কোনায় পানি এসে গেল। তাই দ্রুত হাত-পা’র দড়ি খুলে দিল সে।

লেবু কষ্ট করে উঠে বসল। জবার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। আধো আলোতে লেবু সেটা বুঝতে পারল। আরো খানিকটা পানি খেয়ে চোরটা বলল- এই যে আপনি চোখের পানি ফেললেন এর কাছে এসব মাইর কোনো ব্যথাই না। কারণ ভালোবাসার মানুষগুলো তো ব্যথা দেয় কলিজায়। এই ব্যথার কাছে মাইরের ব্যথা কোন ব্যথা?

– কেন কি হয়েছে? ছলছল চোখে জানতে চায় জবা।

– শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরার পথে গত পরশু রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে আমার স্ত্রী আর মেয়ে। আর আজ গণপিটুনিতে মরতে মরতেও বেঁচে গেলাম আমি। অথচ মরে যাওয়াই ভালো ছিল।

এ কথা শোনার পর জবার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে থাকে। লেবু তার হাতে থাকা পানির মগটা জবাকে দিয়ে বলল- একটু পানি খান আরাম লাগবে।

জবা পানির মগটা ঠোঁটে লাগিয়ে পানি আর চোখের জল একসঙ্গেই খেল, আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj