অস্থির বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা চাই

শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯


পেঁয়াজ নিয়ে ক’দিন ধরে বেশ তুলকালাম কাণ্ড ঘটছে। কথা বলতে গেলে সবাই উচ্চকণ্ঠ, প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ কিংবা ক্রোধে উন্মত্ত। কারণ পেঁয়াজের দাম ১২০ টাকায় উঠেছিল। এখন বেশ ক’দিন দেখছি, পেঁয়াজ নিয়ে কোনো খবর হচ্ছে না। অনেকেই বলছেন পেঁয়াজের নাকি দাম কমেছে, এখন ৯০-১০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু সংসারী কোনো মানুষ তো সহজেই প্রশ্ন করতে পারেন পেঁয়াজের দাম কমেছে বলে যারা বলছেন তারা কি ঠিক বলছেন? পেঁয়াজ তো এখন ৪০-৫০ টাকায় পাওয়ার কথা। কিন্তু ১২০ টাকা কেজি হওয়ার আগে ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। তাহলে পেঁয়াজের দাম কমেছে, এ কথা বলি কি করে। দাম যদি ৪০-৫০-এ এসে দাঁড়ায়, তাহলেই হয়তো ‘কম’ শব্দটা ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে শুনেছি নাকি অনেকেই পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছেন, এমনকি তরকারিতেও ব্যবহার করছেন না। তাহলে কি বলা যায় পেঁয়াজের ঝাঁজ কমছে? না। দুয়েকদিন ক্রেতারা হাঁপ ছেড়ে বাঁচতে চাইলেও পেঁয়াজ আমদানিকারকরা সে সুযোগ দিচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে পেঁয়াজ আসছে, গুদামেও আছে অথচ বাজারে আবার দাম বেড়েছে। এ কারসাজি কাদের। এর বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থাই নেয়া যায় না?

আমরা জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে হাহুতাশ করতে থাকি। কিন্তু গরিব মানুষরা প্রয়োজনীয় তরিতরকারি কিনতে না পারলেও মধ্যবিত্ত থেকে উঁচু শ্রেণির মানুষগুলো বাজার কিন্তু করেন ঝোলা বোঝাই করে কিংবা ঝুড়ি ভর্তি। মধ্যবিত্ত যারা, তারা হয়তো জিনিসপত্রের পরিমাণটা কমিয়ে দেন, এই যা।

তবে এটা ঠিক জিনিসপত্রের দাম বেশ বেড়েছে। চাল, ডাল, লবণ, তেল থেকে শুরু করে মাছ-মাংস, শাকসবজি, তরিতরকারি সবকিছুরই দাম চড়া। বৃষ্টি হলে কিংবা অতিবৃষ্টিতে অথবা খরার দিনে দোকানি কিংবা পাইকার অথবা মজুতদারদের মুখে কিন্তু দামের যথার্থতা ‘যুক্তিগ্রাহ্য’ভাবেই উচ্চারিত হয়। এটা সব মৌসুমেই একই রকম। মৌসুমের সবজি বলে এখন খুব একটা ফারাক খুঁজে পাওয়া যাবে না কারণ এখন গরমের দিনেও শীতের অনেক সবজি পাওয়া যায়। তবে পরিমাণে বেশি মেলে না বলে দাম চড়া হয়। অবশ্য শীতের মৌসুম ছাড়া ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, পালংশাক, টমেটো, শিম এমন কতগুলো সবজি আজকাল গরমের দিনেও পাওয়া যায়। আলু, বেগুন, গাজর, বিট, মানকচু, ওলকচু এমন সব তরিতরকারি বাজারে সবসময়ই মেলে।

জিনিসপত্রের দাম বাড়লে পাকিস্তানি জমানায় সামরিক শাসনের অধীনে থেকেও আমরা দ্রব্যমূল্য প্রতিরোধ আন্দোলন করতে পেরেছি। আজ ৪৯ বছর হলো আমরা পাকিস্তানি দখলদারদের সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে আমাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করেছি। কিন্তু আজও যখন জিনিসের দাম বাড়ে কারণে-অকারণে, তখন আমরা কপালে হাত দেই, মুখে মূল্যবৃদ্ধি মূল্যবৃদ্ধি বলে জাবর কাটতে থাকি কিন্তু রাস্তায় নেবে আন্দোলন করতে পারি না। এখন নাকি ধর্মঘট, হরতাল করার প্রয়োজন নেই, যারাই ক্ষমতায় যান তারা এ কথা ভাবেন এবং উচ্চকণ্ঠে বলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলো বাদেও প্রগতিশীল ও সরকারবিরোধী বলে কিছু পার্টি আছে তারাও দেখি এখন তেমন কোনো আন্দোলনের ডাক দিতে সাহস পান না। বড়জোর দ্রব্যমূল্য কমানোর দাবিতে একটি বড় ব্যানার ও ১৫-২০টি ফেস্টুনসহ একটি র‌্যালি বের করে দায়িত্ব শেষ করেন। মাঝেমধ্যে ভাবি, আমরা তো সেই মানুষই রয়ে গেছি দেহে-মনে, চাল-ডাল, মাছ-মাংস, তরিতরকারি সবই খাচ্ছি কিন্তু আমাদের মধ্যে ‘তাপ-উত্তাপহীন’ চরিত্র এলো কোত্থেকে বা কেন! সরিষার তেল, সয়াবিন, ডালডা কিংবা ঘি কেন এত চড়া দরে বিক্রি হচ্ছে। আমরা বাঙালিরা বেশিরভাগ বাড়িতেই সরিষার তেল রান্নায় ব্যবহার করতাম। কিন্তু আজকাল তার ব্যবহার নেই বললেই চলে। দাপট এখন সয়াবিনের, তাও আবার নানান কিসিমের এবং দামও ভিন্ন ভিন্ন। আর ঘি তো ধরাছোঁয়ার প্রায় বাইরেই।

এসব সত্ত্বেও চড়া কিংবা কম দামে কিনে নি¤œ কিংবা মধ্যবিত্ত অথবা অভিজাত শ্রেণির সংসার কিন্তু নিয়মিতভাবেই চলছে। যদিও নি¤œ থেকে মধ্যবিত্তের ঘরে জিনিসপত্রের দাম নিয়ে হরহামেশাই দুশ্চিন্তা লেগে আছে। এই যে দুর্ভোগ, দুরবস্থা এসব কাটিয়ে ওঠার জন্য সাধারণ মানুষ সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকে। কী জানি কী কারণে ক্ষমতার বাইরে প্রগতিশীল রাজনীতির বিভিন্ন দল কিংবা সরকারবিরোধী জোট বা পার্টি তারাও এর কোনো সুরাহা খুঁজে বের করতে পারছে না। আমার মনে হয় জনবিচ্ছিন্নতাই এর মূল কারণ। আমরা তো দেখছি বিরোধী দল কারণে-অকারণে ক্ষমতাসীনদের নায্য কিংবা অনায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কেবলই ‘মুখরোচক’ শব্দাবলি দিয়ে আক্রমণ শানাচ্ছে। অথচ এদের কারো দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধে গণআন্দোলন গড়ে তোলার মুরোদ নেই। অন্যদিকে সরকারও কেমন যেন ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ করে সময়টা পার করে দিতে চাইছে। তাদের আশা সামনেই মৌসুম। সবজি উঠবে প্রচুর পরিমাণে, মাছও ধরা পড়বে অঢেল, তাই বুঝি তেমন কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল টিসিবির ট্রাকে পেঁয়াজ বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন আর সে ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়। চাল নিয়ে মাথাব্যথা খুব একটা নেই কারোই, তেমনি মাছ-মাংসও গা সহা হয়ে গেছে এগুলোর দাম। তেল, লবণ, তেজপাতা, মরিচ কিংবা নানান মসলাপাতি এসবের দামও গা সহা হয়ে গেছে। কিন্তু আমি ভাবছি, কেন এমন হলো। দেশি মুরগি কিংবা ব্রয়লার অথবা কক- এসবের দাম যেভাবে চড়েছে তাতে মানুষের মধ্যে হতাশাই কাজ করছে। ডিমের দাম বেপরোয়া। ফলফলারী- পেয়ারা, আপেল (সবুজ ও লাল), বেদানা, কালো আঙুর, কলা, বাতাবিলেবু, নাশপাতি, আমড়া এসবেরই দাম বেশ চড়া। কিন্তু যারা কিনছেন তাদের মুখে কোন রা নেই, কারণ প্রয়োজনেই এগুলো বাধ্য হয়ে কিনতে হয়।

আমরা বাঙালি, মাছে-ভাতে। কিন্তু গত কয়েক দশকে আমাদের খাদ্যাভ্যাস বেশ খানিকটা পাল্টে গেছে। রোগ-জ্বরায় এত ভুগছি আমরা তাতে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে আমাদের জন্য যে ওষুধ নির্ধারণ করা হচ্ছে, কী আশ্চর্য সেসবেরই দাম বেড়েছে প্রচুর। আবার চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ফলফলারী, মাছ-মাংস বা শাকসবজি খাওয়ার ব্যাপারেও প্রচুর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। দেশের হাসপাতালগুলো এবং ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যে বিপুল হারে মানুষকে চিকিৎসকের কাছে যেতে দেখি তাতে যথার্থই বোঝা যায় আমরা কী পরিমাণে ভেজাল-আক্রান্ত। মানুষের সব রকমের খাবারের মধ্যে নানা ধরনের বিষাক্ত উপাদান যে মিশিয়ে বা ইনজেক্ট করে দেয়া হচ্ছে তারই বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় মানুষের শরীর আজ বিধ্বস্ত। এ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ভেজালবিরোধী অভিযানও চলে মাঝেমধ্যে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় কিংবা উৎপাদনস্থলে অথবা গুদামে গুদামে হানা দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় জরিমানা কিংবা দণ্ডও দিচ্ছেন। কিন্তু তা থেকে আদৌ কি কোনো সুরাহা হচ্ছে? এসব অভিযান আমার কাছে মনে হয়, ‘জলে ঢিল মারা’র মতো। অর্থাৎ ঢিল মারলে তাৎক্ষণিকভাবে জল সরে যায় কিন্তু পরক্ষণেই আবার তা মিশে যায়। আমি বলছিলাম, এই অভিযানগুলো এমনই হচ্ছে। তাই মানুষের ভোগান্তি যেমন ছিল তেমনই আছে। বলা যায় এ জাতীয় অভিযানের কারণে ভোক্তাদের বিড়ম্বনাও বেড়ে যায় কারণ দোকানি বা বিক্রেতারা, মালিক কিংবা মহাজনরা এই দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার জন্য নিজেরা কিছুটা সতর্ক হয় আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ে ভোক্তাদের ওপর।

এতসব কথা বলার পর বলতে ইচ্ছে করছে, মালিক-মহাজন ও দোকানি-বিক্রেতা এদের বিবেককে ‘ধোলাই’ করা দরকার। কিন্তু সে কেমন করে। চূড়ান্ত পর্যায়ে এর জবাব সরকারের কাছেই।

কামাল লোহানী : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

দিল্লিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ঢাকা

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

একজন সৃজনশীল সুভাষ দত্ত

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ধূসর আকাশ, বিষাক্ত বাতাস

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

আসুন, পরিবারকে ডায়াবেটিসমুক্ত রাখি

ফাহিম ইবনে সারওয়ার

গভীর সংকটে জাবি

Bhorerkagoj