লালন সাঁই : অন্তরে-বাহিরে

শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯

আবুল আহসান চৌধুরী

বাউলের গান যে বাঙালির অন্তর্জগতে ঠাঁই করে নিয়েছে, তার মূলে রয়েছে লালন সাঁই ফকিরের (১৭৭৪-১৮৯০) অবদান। একটি অন্তর্মুখী মরমি স¤প্রদায়ের নিছক সাধন-সঙ্গীত তাঁর স্পর্শে পেয়েছে সঙ্গীত-সাহিত্যের মর্যাদা। আজ প্রায় দুই শতাব্দী লালনের গান একদিকে যেমন বাঙালির মরমি-মানসের অধ্যাত্ম-ক্ষুধা, অপরদিকে তেমনি রস-তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে।

দুই.

কিন্তু এই আত্মনিমগ্ন সংসার-নির্লিপ্ত সাধকের জীবন-কাহিনী রহস্যে ঘেরা। তাঁর জন্ম ও ধর্ম নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। লালন নিজেও তাঁর আত্মপরিচয় সম্পর্কে নীরব ও নিস্পৃহ ছিলেন। তাঁর জীবনীর প্রামাণ্য উপকরণও আজ মেলা ভার। এর ফলে সেই ফাঁক পূরণ করেছে জনশ্রæতি ও অনুমান।

পলাশীর যুদ্ধের ১৭ বছর পর বাংলার সামাজিক ইতিহাসের এক স্মরণীয় সন্ধিক্ষণে লালনের জন্ম। অনেকেরই ধারণা, লালন ফকির জন্মসূত্রে হিন্দু কায়স্থ পরিবারের সন্তান এবং তাঁর জন্ম সেকালের নদীয়ার অন্তর্গত বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার অধীন কুমারখালী থানার ভাঁড়ারা গ্রামে। মাধব কর ও পদ্মাবতী তাঁর জনক-জননী। তীর্থভ্রমণ বা গঙ্গাস্নানে গিয়ে উৎকট বসন্তরোগে আক্রান্ত জ্ঞানহীন লালনকে মৃত-বিবেচনায় তাঁর সঙ্গীরা নদীতে ভাসিয়ে দেয় বা অন্তর্জলি করে। পরে এক মুসলমান তাঁতি তাঁকে উদ্ধার করেন এবং তাঁরই আশ্রয়ে যতেœ ও সেবায় লালনের আরোগ্য হয়। এরপর লালন ঘরে ফিরলে ‘যবন-সঙ্গদোষে’র কারণে রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃত হন। ফলে সমাজ-সংসার-প্রত্যাখ্যাত লালনকে ঘর ছাড়তে হয়। পরে একসময় বাউলের দলে ভেড়েন এবং বাউলগুরু সিরাজ সাঁইয়ের কাছে দীক্ষা নেন। এরপর ছেঁউড়িয়ায় এসে আখড়া স্থাপন করেন এবং কালক্রমে তাঁকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে ওঠে ‘লালন-মণ্ডলি’- ‘সাধুর সাধবাজার’। লালনের নাম ছড়িয়ে পড়ে সারা বঙ্গদেশে। ‘হিতকরী’ (৩১ অক্টোবর ১৮৯০) পত্রিকা জানাচ্ছে, ‘লালন ফকীরের নাম এ অঞ্চলে কাহারও শুনিতে বাকী নাই। শুধু এ অঞ্চলে কেন, পূর্ব্বে চট্টগ্রাম, উত্তরে রঙ্গপুর, দক্ষিণে যশোহর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্য্যন্ত বঙ্গদেশের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক এই লালন ফকীরের শিষ্য; শুনিতে পাই তাঁহার শিষ্য দশ হাজারের উপর।’ লালন তাঁর সাধনপীঠ ছেঁউড়িয়াতেই ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১ কার্তিক ১২৯৭) দেহত্যাগ করেন। দীর্ঘজীবী লালন ১১৬ বছরের আয়ু পেয়েছিলেন।

এর বাইরে লালনজীবনী সম্পর্কে অপর মত হলো, লালন মুসলমান-সন্ততি, তাঁর জন্ম বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু থানার হরিশপুর গ্রামে। তবে এই মতের সমর্থনে কোনো তথ্য-প্রমাণ বা যুক্তি নেই বলে তা ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বে সুধীজনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

তিন.

লালন সাঁই বাউলসাধনার সিদ্ধ পুরুষ। তাঁর সাধনার ভেতর দিয়েই বাউলমতের সর্বোচ্চ বিকাশ। অতুলনীয় সঙ্গীত-প্রতিভা ও তত্ত্বজ্ঞানের সমন্বয়ে লালন বাউলগানের একটি স্বতন্ত্র ‘ঘরানা’ নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর গানে বাউল-তত্ত্ব ও সাধনার গভীর পরিচয় মেলে। লালনের গানে দেহবিচার, মিথুনাত্মক যোগসাধনা, গুরুবাদ, মানুষতত্ত্ব- বাউলসাধনার এইসব বিষয় সঙ্গতভাবেই এসেছে। বাউলের সাধনার মূল অবলম্বন মানবদেহ ও মানবগুরুর নির্দেশনা। তাই দেহজরিপ ও গুরুবন্দনাই রয়েছে বাউলসাধনার মূলে। দেহকে কেন্দ্র করেই বাউলের সাধনা। এই দেহের মধ্যেই পরম পুরুষের বাস। তাই দেহবিচারের মাধ্যমে আত্মস্বরূপ নির্ণয় করতে পারলেই সেই পরম প্রত্যাশিত ‘মনের মানুষে’র সন্ধান মেলে। লালনের গানে এই মানবদেহ কখনো ‘ঘর’, কখনো ‘খাঁচা’, আবার কখনো বা ‘আরশিনগর’ নামে অভিহিত হয়েছে। দেহঘরের বসতির পরিচয়-সন্ধানের ব্যাকুলতা তাঁর গানে প্রকাশ পেয়েছে এইভাবে :

আমার এই ঘরখানায় কে বিরাজ করে।

তারে জনম-ভর একদিন দেখলাম নারে \…

লালন বলেন : ‘এই মানুষে আছে রে মন, / যারে বলে মানুষ-রতন’। কিন্তু বড়ো আফসোস্ এই যে :

আমার ঘরের চাবি পরের হাতে।

কেমনে খুলিয়ে সে ধন দেখব চক্ষেতে \

মানবদেহই বাউলের পুণ্যতীর্থ। এই উপলব্ধি থেকেই লালনের ঘোষণা :

উপাসনা নাই গো তার

দেহের সাধন সর্ব-সার

তীর্থ-ব্রত যার জন্য

এ দেহে তার সকল মিলে \

বাউলসাধনার সঙ্গে ‘মিথুনাত্মক যোগসাধনা’র গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ‘চারিচন্দ্র’-ভেদ কিংবা ‘মীন’-ধরা- এই রূপকের ভেতর দিয়ে সাধনার এই বিষয়টি বাউলগানে এসেছে। ‘তিরপিনির তীরধারে, মীনরূপে সাঁই বিহার করে’- লালনের গানে এই গুপ্ত ‘অধর মানুষ’কে ধরার প্রয়োজন ও কৌশল বর্ণিত হয়েছে :

সময় বুঝে বাঁধাল বাঁধলে না।

জল শুকাবে মীন পালাবে পস্তাবি রে মন-কানা \…

মাস-অন্তে মহাযোগ হয়

নীরস হতে রস ভেসে যায়

করিয়ে সে যোগের নির্ণয়

মীনরূপে খেল্ দেখলে না \

যৌন-সম্ভোগ নয়, যৌন-সংযম ও কাম-নিয়ন্ত্রণই বাউলের মোক্ষের যথার্থ পন্থা। ‘কামলোভী মনে’র ‘মদনরাজার গাঁটরি-টানা’ই যাতে সার না হয়, তাই লালন হদিস দিচ্ছেন সঠিক পথের :

জেন্তে-মরা প্রেম-সাধন কি পারবি তোরা।

যে প্রেমে কিশোর-কিশোরী হয়েছে হারা \

‘কামের ঘরে কপাট’ না মারলে সাধন-ভজনের সকল আয়োজনই তো বৃথা। লালন তাই কামলোভী ভণ্ড সাধকের কৃত্রিম ভজনাকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘প্রেম জানে না প্রেমের হাটের বুলবুলা’, কেন না ‘তাঁর মন মেতেছে মদনরসে, সদায় থাকে সেই আবেশে’।

বাউল গুরুবাদী লৌকিক ধর্ম। গুরুতত্ত্ব তাই এই ধর্মসাধনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। গুরু-বিনা সাধন-ভজন বৃথা। ‘হিতকরী’ পত্রিকা-সূত্রে জানা যায়, লালন ‘বড় গুরুবাদ পোষণ করিতেন’। লালনের গানে বাউলসাধনার এই অনুষঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। লালন বলেছেন :

ভবে মানুষ-গুরু নিষ্ঠা যার

সর্ব-সাধন সিদ্ধ হয় তার।

বাউলসাধনায় গুরুই সার্বভৌম শক্তি। গুরুর মূল্য-মর্যাদা ও প্রয়োজন-গুরুত্বের কথা তাই লালনের গানে বারবার এসেছে :

গুরু-রূপের ঝলক দিচ্ছে যার অন্তরে।

ও তার কিসের আবার ভজন-সাধন লোক-জানিত ক’রে \

তাই সেই গুরুর প্রতিই লালনের বিনীত নিবেদন :

আমার জন্ম-অন্ধ মন-নয়ন

গুরু তুমি নিত্য-সচেতন

চরণ দেখব আশায় কয় লালন

জ্ঞান-অঞ্জন দেও নয়নে \

– গুরু-বন্দনার উজ্জ্বল নিদর্শন শিল্প-শোভিত এই পদটি।

বাউল বেদ ও ব্রাহ্মণ্য আচারবিরোধী ধর্ম। লালন সাধনঘরের বসতিদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘ভুলো না মন বৈদিক ভোলে’, কেন না ‘বেদ-বেদান্ত পড়বে যত বাড়বে তত লখ্ণা’। বেদের জ্ঞান সাধককে কখনো সঠিক পথের সন্ধান দিতে পারে না;- বরঞ্চ এক ধরনের বিভ্রান্তিরই জন্ম দেয়। পরমতত্ত্বের রহস্যভেদাকাক্সক্ষী লালন তাই আফসোস করে বলেন :

কার বা আমি কে বা আর

আসল বস্তু ঠিক নাহি তার

বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার

উদয় হয় না দিনমণি \

বাউলসাধনার ‘মানুষতত্ত্বে’ ‘আরশিনগরের পড়শি’ যিনি তিনিই লালনের ‘মনের মানুষ’, তিনিই ‘অলখ সাঁই’, ‘সাঁই নিরঞ্জন’। এই ‘মানুষে’র অšে¦ষণেই বাউলের সাধনার দিন বয়ে যায়। ‘মানুষতত্ত্ব ভজনের সার’-এই জ্ঞানকে অন্তরে ধারণ করেই লালন বলেন :

মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে

সে কি অন্য তত্ত্ব মানে \

মনের মানুষের সন্ধান, সাহচর্য ও মিলনের জন্যে লালনের মন সর্বদাই আকুল ও উৎকণ্ঠিত :

আমার মনের মানুষের সনে

মিলন হবে কতদিনে \

কিন্তু সাধন-সিদ্ধি হয় না বলে :

সে আর লালন একখানে রয়

তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে \

বাউলের কোনো শাস্ত্র-গ্রন্থ নেই। গানেই এই স¤প্রদায়ের সাধন-ভজন ও আচার-দর্শনের পরিচয়। নিজের সাধনা, চর্চা, অনুশীলন ও উপলব্ধির ভেতর দিয়ে বাউলসাধনাকে বিকাশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন লালন। সাধক লালনের মর্ম-পরিচয় তাই তাঁর গানেই মিশে আছে। সেই হিসেবে, লালন সাঁই-ই বাউলমত ও সাধনার শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার এবং তিনিই ছিলেন এই মরমি-সাধনার প্রাণপুরুষ।

চার.

বাউলগান বাংলার একটি প্রধান লৌকিক ধর্ম-স¤প্রদায়ের সাধনসঙ্গীত। তাঁদের অধ্যাত্ম-সাধনার গূঢ়-গুহ্য পদ্ধতি কেবল দীক্ষিতজনের কাছে প্রচারের জন্যেই এই গানের জন্ম। শিল্প-সৃষ্টির সচেতন প্রয়াস এখানে অনুপস্থিত। লালনও তাই বিশুদ্ধ শিল্প-প্রেরণায় তাঁর গান রচনা করেননি, বিশেষ উদ্দেশ্য-সংলগ্ন হয়েই তাঁর এই গানের জন্ম। তবে প্রায় ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনকে অতিক্রম করে লালনের গান অনায়াসে শিল্পের সাজানো বাগানে প্রবেশ করেছে সমহিমায়। লালনের গান তাই একই সঙ্গে সাধনসঙ্গীত, দর্শনকথা ও শিল্পশোভিত কাব্যবাণী। তত্ত্বসাহিত্যের ধারায় চর্যাগীতিকা বা বৈষ্ণব পদাবলি সাধনসঙ্গীত হয়েও যেমন উচ্চাঙ্গের শিল্প-সাহিত্যের নিদর্শন, তেমনি বাউলগানের শ্রেষ্ঠ নজির লালনের গান সম্পর্কেও এই একই কথা বলা চলে।

দীর্ঘজীবী লালন প্রায় পৌনে এক শতাব্দী ধরে গান রচনা করেছেন। তাঁর গানের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও অনুমান করা যায় তা অনায়াসেই হাজারের কোঠা ছাড়িয়ে যাবে। লালন ছিলেন নিরক্ষর, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের কোনো সুযোগই তাঁর হয়নি। কিন্তু তাঁর সঙ্গীতের বাণীর সৌকর্য, সুরের বিস্তার, ভাবের গভীরতা আর শিল্পের নৈপুণ্য লক্ষ করে তাঁকে নিরক্ষর সাধক বলে মানতে দ্বিধা থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে লালন ছিলেন স্বশিক্ষিত। ভাবের সীমাবদ্ধতা, বিষয়ের পৌনঃপুনিকতা, উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের বৈচিত্র্যহীনতা ও সুরের গতানুগতিকতা থেকে লালন ফকির বাউলগানকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তাঁর সমকালেই তাঁর গান লৌকিক ভক্তমণ্ডলির গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষিত সুধীজনকেও গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। উত্তরকালে লালনের গান দেশের ভূগোল ছাড়িয়ে পরদেশেও স্থান করে নিয়েছে। লোকপ্রিয় লালনের গান আজ সঙ্গীত-সাহিত্যের মর্যাদা পেয়েছে।

এই নিরক্ষর গ্রাম্য সাধককবির শিল্প-ভুবনে প্রবেশ করলে বিস্মিত হতে হয় যে, তিনি কতো নিপুণভাবে শিল্পের প্রসাধন-প্রয়োগে রমণীয় করে তুলেছেন তাঁর গানকে। ভাব-ভাষা, ছন্দ-অলঙ্কার বিচারে এই গান উচ্চাঙ্গের শিল্প-নিদর্শন এবং তা তর্কাতীতরূপে কাব্যগীতিতে উত্তীর্ণ।

সুরের সহযোগে শব্দের জিয়ন-কাঠিই কবিতা কিংবা সঙ্গীত-পদের শরীরে প্রাণ-প্রবাহ সঞ্চার করে থাকে। কুশলী হাতে প্রচলিত শব্দ নতুন ব্যঞ্জনা ও তাৎপর্য নিয়ে ধরা দেয়। প্রয়োগ-নৈপুণ্যে আটপৌরে শব্দও যে কীভাবে নতুন অর্থ-ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে লালনের গান তার উজ্জ্বল উদাহরণ। লালন ছিলেন সচেতন শব্দ-কুশলী শিল্পী। ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর সেথা এক পড়শি বসত করে’ লালনের একটি প্রাতিস্বিক গান। এখানে পরম আকাক্সিক্ষত অচিন এক পড়শির সঙ্গে মিলনের ব্যাকুলতা প্রকাশিত। সেই অধরা মানুষের পরশ-লাভ করলে লালনের ভব-বন্ধন-জ্বালা যেতো ঘুচে। কিন্তু ‘সে আর লালন একখানে রয়,/তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে’। এখানে ‘যোজন’ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষণীয়। দূরত্ব-নির্দেশক ‘যোজন’ শব্দটি এখানে যেভাবে সুপ্রযুক্ত, দূরত্বজ্ঞাপক আর কোনো শব্দই এর যোগ্য বিকল্প হতে পারে না। ‘যোজনে’র পরিবর্তে অন্য কোনো শব্দ এখানে ব্যবহৃত হলে শুধু এই পঙ্ক্তিটিই নয়, স¤পূর্ণ গানটিরই শিল্প-আঁটুনি শিথিল হয়ে যেতো।

লালন তাঁর গানে সমার্থক শব্দের (‘আরশি’, ‘আয়না’, ‘দর্পণ’) ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহারে বিশেষ ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন : যেমন- ক. ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর, খ. ‘আয়নামহল তায়’, গ. ‘জানো না মন পারাহীন দর্পণ’।

‘নিরক্ষর’ লালনের তৎসম শব্দের অজস্র ও উপযুক্ত ব্যবহার বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি-ফারসি শব্দের গভীর আত্মীয়তা-যোগ ঘটিয়ে তিনি তাঁর গানকে আরো আকর্ষণীয় ও শ্রীমণ্ডিত করে তুলেছেন। ক্বচিৎ ইংরেজি শব্দের প্রয়োগও তাঁর গানে দুর্লক্ষ্য নয়। এর থেকে সহজেই অনুমান করা চলে যে, গ্রাম্যসাধক লালনের শব্দ-চেতনা কতো পরিশীলিত এবং তাঁর শব্দ-ভাণ্ডার কতো সমৃদ্ধ ছিল।

লালনের অসাধারণ ছন্দ-জ্ঞান প্রাজ্ঞ ছান্দসিকের মনেও বিস্ময় জাগায়। লালনের গানের ছন্দ-বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা পেয়েছিল। তিনি লালনের ‘আছে যার মনের মানুষ মনে’ এবং ‘এমন মানব-জনম আর কি হবে’- এই গান দুটি উদ্ধৃত করে মন্তব্য করেন : ‘এই ছন্দের ভঙ্গি একঘেয়ে নয়। ছোট-বড়ো নানাভাগে বাঁকে বাঁকে চলেছে। সাধুপ্রসাধনে মেজে-ঘষে এর শোভা বাড়ানো চলে, আশা করি এমন কথা বলবার সাহস হবে না কারো’ (‘ছন্দ’, বিশ্বভারতী, কলকাতা, নভেম্বর ১৯৬২; পৃ. ১৩০)। ছন্দের শাসন যে লালনের গানকে একটি নিটোল শিল্পে পরিণত করেছে, রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যে তার সমর্থন পাওয়া যায়। তাঁর ছন্দ-বোধ অনুশীলনের ফসল নয়, বরঞ্চ তা তাঁর স্বভাবেরই অন্তর্গত শিল্প-ধারণা থেকে সৃষ্ট।

অলঙ্কার-প্রয়োগে লালনের নৈপুণ্যও বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। লাগসই উপমা-রূপক-চিত্রকল্প-উৎপ্রেক্ষা লালন-গীতিকে শ্রীমণ্ডিত করে তুলেছে। উপমা ও চিত্রকল্পের যুগল ব্যবহারে লালনের গান হয়ে উঠেছে দীপ্তিময় :

মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন

লুকালে না পায় অন্বেষণ

কালারে হারায়ে তেমন

ও রূপ হেরিয়ে স্বপনে \

কিংবা আরেকটি উদাহরণ :

এক নিরিখ দেখ ধনি, সূর্যগত কমলিনী

দিনে বিকশিত কমলিনী, নিশিথে মুদিত রহে।

তেমনি জেন ভক্ত যে জন, একরূপে বাঁধে হিয়ে \

রূপকের আড়ালে রয়েছে বাউলগানের নিগূঢ় মর্মার্থ। বাউলগানের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে তাই লালনের গানেও অনিবার্যভাবেই রূপক এসেছে। যেমন নিচের এই গানটি :

লাগল ধূম প্রেমের থানাতে

মন-চোরা পড়েছে ধরা রসিকের হাতে।

ও সে ধরেছে চোরকে হাওয়ায় ফাঁদ পেতে \

প্রচলিত ইঙ্গিতধর্মী প্রবাদ-প্রবচন-সুভাষণের ব্যবহার তাঁর কাব্যগীতিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তাঁর বক্তব্যের যৌক্তিক ভিত্তি-অর্জনের জন্যে এই প্রয়োগ বিশেষ সহায়ক হয়েছে। লালনগীতিতে সংযোজিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রবাদ-প্রবচন-সুভাষণ :

ক. কাক মারিতে কামান-পাতা

খ. পিঁড়েয় বসে পেঁড়োর খবর

গ. হাওয়ার চিড়ে, কথার দধি, ফলার হচ্ছে নিরবধি

ঘ. হাতের কাছে হয় না খবর, কি দেখতে যাও দিল্লি-লাহোর।

অনুপ্রাসের ব্যবহার লালনের গানকে বিশেষ ধ্বনি-ব্যঞ্জনায় মণ্ডিত করেছে। যেমন :

ক. গুরু তুমি তন্ত্রের মন্ত্রী

গুরু তুমি মন্ত্রের মন্ত্রী

গুরু তুমি যন্ত্রের যন্ত্রী

না বাজাও বাজবে কেনে \

খ. যার যেখানে ব্যথা নেহাত, সেইখানে হাত ডলামলা।

গ. ধর রে অধরচাঁদেরে অধরে অধর দিয়ে।

ঘ. কারুণ্য তারুণ্য এসে লাবণ্যে যখন মিশে।

ঙ. আঁখির কোণে পাখির বাসা।

লালনের কবিত্ব-শক্তির পরিচয় তাঁর অনেক গানেই পাওয়া যায়। বহুল উচ্চারিত তত্ত্বকথা ও সীমাবদ্ধ বিষয়ের অনুবর্তন সত্ত্বেও লালন তাঁর সঙ্গীতে সেই গতানুগতিক ধারাকে অতিক্রম করে নতুন ভাব-ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করেছেন। তত্ত্বকথার দুরূহ ও ক্লান্তিকর বদ্ধ আবহে এনেছেন শিল্প-সৌন্দর্যের সুবাতাস। তাই বাংলার মরমি কবিদের মধ্যেই যে কেবল তিনি শ্রেষ্ঠ তাই নয়, বাংলার সঙ্গীতসাহিত্যের ইতিহাসেও তিনি এক কালোত্তীর্ণ স্মরণীয় শিল্পী-ব্যক্তিত্ব।

মূলত লালনের গানের অসামান্য শৈল্পিক বৈশিষ্ট্য, উচ্চাঙ্গের দর্শন ও প্রবল মানবিকতাবোধের জন্যে এ দেশে রবীন্দ্রনাথ থেকে অন্নদাশঙ্কর রায় এবং বিদেশে চার্লস ক্যাপওয়েল থেকে ক্যারল সলোমন- এঁরা লালনের গানের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।

পাঁচ.

বাউলগান লৌকিক সমাজের অধ্যাত্মসাধনার অবলম্বন হলেও লালনের হাতে তা অধিকতর সামাজিক তাৎপর্য ও মানবিক বিশ্বাসে সমৃদ্ধ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। লালনের গানে ধর্ম-সমন্বয়, স¤প্রদায়-স¤প্রীতি, মানব-মহিমাবোধ, অসা¤প্রদায়িক চেতনা, আচারসর্বস্ব ধর্মীয় অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধতা, বর্ণশোষণ-জাতিভেদ ও ছুঁৎমার্গের প্রতি ঘৃণা, সামাজিক অবিচার ও অসাম্যের অবসান-কামনা- এইসব বিষয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। মূলত তাঁর বিদ্রোহ প্রথার আনুগত্য, হৃদয়হীন শাস্ত্রাচার ও প্রচলিত সমাজধর্মের বিরুদ্ধে। এইসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবতাবাদী মনের পরিচয় পাওয়া যায়। আন্তরিক বোধ ও বিশ্বাসকে অকপটে লালন তাঁর গানে প্রকাশ করেছেন। তাঁর আদর্শ ও জীবনাচরণের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের কোনো অমিল হয়নি- বিরোধ বাধেনি কখনো।

লালনের গান মানব-বন্দনা ও মানব-মহিমারও গান- যেমন এই গানটি :

অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই

শুনি মানবের উত্তম কিছুই নাই

দেব-দেবতাগণ করে আরাধন

জন্ম নিতে এই মানবে \

সাধন-ভজনের পথ-নির্দেশের জন্যে দেব-দেউল কিংবা কোনো প্রত্যাদেশ নয়, মর্ত্যরে মানবগুরুকেই লালন ধ্রæবতারা মেনেছেন। দুর্লভ মানব-জনমের গুরুত্ব, মানবমুখীন চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ এইভাবে লালনের গানে জয়ী হয়েছে। এ দেশের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে জাতিভেদ ও ছুঁৎমার্গের অস্তিত্ব ছিল দুষ্টক্ষতের মতোই। এই কুপ্রথা ও কুসংস্কার ধর্মকে আশ্রয় করে সমাজজীবনে শক্ত আসন প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছিল। মানুষের মনে এই সংস্কার ও ভেদবুদ্ধি এমন গভীর ছাপ ফেলেছে যে সহজে ও সমূলে এর উচ্ছেদ সম্ভব হয়নি। লালন এই অপশক্তির বিরুদ্ধেই আজীবন লড়াই করেছেন। লালন জানতেন, শুদ্ধ সাধনভক্তির জোরে অবজ্ঞাত তন্তুবায় কবির ও অস্পৃশ্য চর্মকার রামদাস মহাসাধকে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। তাই তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে :

ভক্তির দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই।

হিন্দু কি যবন বলে তার জাতের বিচার নাই \

লালন জীবনভর জাতিভেদ, ছুঁৎমার্গ ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সংগ্রাম করে এসেছেন। তাঁর নিজের জীবনেও এই ধরনের দুঃখজনক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে অনেকবারই। প্রথম জীবনে মুসলমানের গৃহে অন্ন-জল-আশ্রয় গ্রহণের জন্যে লালনকে শুধু সমাজচ্যুতই হতে হয়নি, স্নেহময়ী জননী ও প্রিয়তমা পতœীকেও হারাতে হয়েছে। এইসব নির্মম ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তো তাঁর ভেতরে গড়ে উঠেছিল একটি প্রতিবাদী সত্তা। লালন তাই কখনোই জাতিত্বের সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে চাননি। একজন মানবপ্রেমী সংস্কারমুক্ত বাউল হিসেবে তিনি জানতেন, জাতের সীমাবদ্ধতা মানুষকে খণ্ডিত ও ক‚পমণ্ড‚ক করে রাখে। তাই জাতধর্মের বিরুদ্ধে চরম বক্তব্য পেশ করে তিনি বলেছেন :

জাত না গেলে পাইনে হরি

কি ছার জাতের গৌরব করি

ছুঁসনে বলিয়ে।

লালন কয় জাত হাতে পেলে

পুড়াতাম আগুন দিয়ে \

লালন মধ্যযুগের সন্ত-সাধক কবির-তুলসিদাস-দাদু-পল্টু-রজ্জবের মতোই ধর্মীয় বিভেদকে তুচ্ছ করে স¤প্রদায়-স¤প্রীতির স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত বিরোধ ও বৈষম্যের বিপক্ষে আন্তরিক ও জোরালো সওয়াল করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর গানে অনবদ্য ও অকাট্য যুক্তি-সন্নিবেশের মাধ্যমে বিভেদকামী মানসিকতাকে ধিক্কার দিয়েছেন তীব্রভাবে :

একই ঘাটে আসা-যাওয়া

একই পাটনি দিচ্ছে খেওয়া

কেউ খায় না কারো ছোঁয়া

বিভিন্ন জল কে কোথায় পান\

আবার পাশাপাশি নিজেই সিদ্ধান্তে এসেছেন এই মরমি সাধক :

এক চাঁদে হয় জগৎ আলো

এক বীজে সব জন্ম হলো

ফকির লালন কয় মিছে কল’

কেন করিস সদাই \

লালনের এই বক্তব্যে ভেদহীন অখণ্ড মানবসমাজের ধারণা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

লালনের আচার-আচরণ ও বক্তব্যে সমকালের মানুষ ধাঁধায় পড়েছিল তাঁর জাত-পরিচয় নিয়ে। লালন বহুবার জাত-ধর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু সা¤প্রদায়িক জাতিত্বে অবিশ্বাসী লালন এই প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করেছেন। তাঁর সেই বক্তব্যের যুক্তিতে জাতবিচারী মানুষের অহঙ্কার চূর্ণ হয়েছে। লালন স্পষ্টই বলেছেন, তিনি হিন্দু না মুসলমান এ প্রশ্ন তার কাছে অর্থহীন ও অসমাধ্য। এ-বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাসের আগুনে পোড়া নিখাদ বক্তব্য :

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।

লালন কয় জেতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে \

মানুষের জাতি-গৌরব-চেতনাকে প্রশ্রয় দেননি লালন, তাই সে ‘জেতের ফাতা’ বিকাতে চেয়েছেন ‘সাধ-বাজারে’।

লালনের গান বাউল স¤প্রদায়ের গুহ্য-সাধনার বাহন হলেও এর ভেতরে মাঝেমধ্যে বিস্ময়কর সমাজচেতনা প্রকাশিত হয়েছে। সামাজিক অবিচার ও অসাম্য, ধর্মীয় গোঁড়ামি, শ্রেণি-শোষণ ও গোত্র-বৈষম্য এই মরমি সাধকের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তাই অধ্যাত্ম-উপলব্ধির অবসরে, প্রক্ষিপ্ত চিন্তার চিহ্ন হলেও, তিনি এসব বিষয়ে তাঁর অকপট-আন্তরিক বক্তব্য পেশ করেছেন। বিত্তবান ও বিত্তহীন, কুলীন ও প্রাকৃত, শোষক ও শোষিতে বিভক্ত সমাজে দরিদ্র-নিঃস্ব-নির্যাতিত নিম্নবর্গের মানুষের প্রতিনিধি ছিলেন লালন।

লালনের সাহসী সামাজিক ভূমিকার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আছে তার পরম-বান্ধব কাঙাল হরিনাথকে জমিদারের সহিংস আক্রোশ থেকে রক্ষার ঘটনায়। হরিনাথ তাঁর ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় শিলাইদহের ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা-পীড়নের সংবাদ প্রকাশ করলে জমিদারপক্ষ তাঁর ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। কাঙালকে শায়েস্তা করার জন্যে তাঁরা দেশীয় লাঠিয়াল ও পাঞ্জাবি গুণ্ডা নিয়োগ করেন। কাঙালের অপ্রকাশিত ‘দিনপঞ্জি’ থেকে জানা যায়, জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর হাত থেকে বিপন্ন বন্ধু হরিনাথকে রক্ষার জন্যে বাউলসাধক লালন ফকির ‘তার দলবল নিয়ে নিজে লাঠি হাতে সেই লাঠিয়ালের দলকে আচ্ছা করে ঢিঢ্ করে সুহৃদ কৃষকবন্ধু হরিনাথকে রক্ষা করেন’ (হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ‘লোকসঙ্গীত সমীক্ষা : বাংলা ও আসাম, কলকাতা, জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৫; পৃ. ৬৭-৬৮)। লালন তাঁর উদার ও প্রগতিশীল মানসিকতার কারণে সমকালীন সমাজে যথেষ্টই নিন্দিত ও নিগৃহীত হয়েছিলেন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় স¤প্রদায়ের শাস্ত্রবাহক মৌলবাদীরাই লালনের বিপক্ষে ছিলেন। উত্তরকালেও লালনবিরোধী আন্দোলন একেবারে থেমে যায়নি। জারি হয়েছে বাউলধ্বংস ফতোয়া। মুসলমানদের চোখে লালন বেশরা-বেদাতি নাড়ার ফকির;- আবার হিন্দুর নিকটে ব্রাত্য-কদাচারী হিসেবে চিহ্নিত। ধর্মগুরু ও সমাজপতি উভয়েরই কাছেই লালনের বাণী ও শিক্ষা অস্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু লালন তাঁর ধর্মবাণীকে সমাজশিক্ষার বাহন করে ক্রমশ তাঁর আকাক্সিক্ষত গন্তব্যে যাত্রা অব্যাহত রেখেছিলেন।

লালনের গান সমাজ-সম্পর্কের ধারা বেয়ে সা¤প্রদায়িকতা-জাতিভেদ-ছুঁৎমার্গ- এইসব যুগ-সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছিল। এই প্রয়াসের মাধ্যমে লালন সমাজসচেতন, মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির যে পরিচয় দিয়েছেন তার স্বরূপ নির্ণয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। লালনের এই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে কেউ কেউ বাংলার সামাজিক জাগরণের পুরোধা রাজা রামমোহন রায়ের অবদানের সঙ্গে তুলনা করতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায় মন্তব্য করেছেন : ‘বাংলার নবজাগরণে রামমোহনের যে গুরুত্ব বাংলার লোক-মানুষের দেয়ালী উৎসবে লালনেরও সেই গুরুত্ব’ (‘লালন ও তাঁর গান’, কলকাতা, ১৩৮৫); পৃ. ২৪। অধ্যাপক অমলেন্দু দে-ও লোকায়ত জীবনে লালনের সুগভীর প্রভাব এবং নবজাগৃতির প্রেক্ষাপটে লালন ও রামমোহনের ভূমিকার তুলনামূলক আলোচনার গুরুত্ব স্বীকার করেছেন (‘বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ’, কলকাতা, ১৯৭৪; পৃ. ৪-৫)। আমাদের বিশ্বাস, নবজাগৃতির পটভূমিকায় রামমোহন ও লালনের তুলনামূলক আলোচনা হলে দেখা যাবে লালনের অসা¤প্রদায়িক চেতনা, মানবতাবাদ, সংস্কার ও জাতিভেদ-বিরুদ্ধ মনোভাবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব কতোখানি। জানা যাবে, লালনের মানবিক মূল্যবোধ ও মানবধর্মী চিন্তাধারার প্রভাব বাংলার গ্রামদেশের প্রাকৃত জনগোষ্ঠী এবং নগরবাসী কিছু শিক্ষিত কৃতী পুরুষের মনেও কী গভীর প্রভাব ফেলেছিল, কতোখানি আন্তরিক ও অকৃত্রিম ছিল সেই প্রচেষ্টা। নবজাগৃতির অন্যতম শর্ত যে অসা¤প্রদায়িক মানবতাবাদ তা এই অশিক্ষিত গ্রাম্যসাধকের বাণী ও সাধনার ভেতরেই প্রকৃত অর্থে সত্য হয়ে উঠেছিল- প্রাণ পেয়েছিল। যথার্থই গ্রাম-বাংলার এই মানবতাবাদী মুক্তবুদ্ধি-আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন লালন সাঁই।

ছয়.

লালন-আবিষ্কারের কৃতিত্ব মূলত রবীন্দ্রনাথের। যদিও তাঁর আগে কেউ কেউ লালনের গান ও জীবনী প্রকাশ করেছেন। কিন্তু যথার্থ অর্থে রবীন্দ্রনাথের সৌজন্যেই বাঙালি সমাজে লালন সম্পর্কে কৌত‚হল ও আগ্রহ জাগে। তাই এই মরমি সাধকের পরিচয়ের পরিধি প্রসারে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াসকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়। রবীন্দ্রনাথ প্রথম লালনের গানের উল্লেখ করেন ভাদ্র ১৩১৪-তে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসে। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’- এই একই গানের প্রথম দু’টি পঙ্ক্তির উল্লেখ মেলে ‘জীবনস্মৃতি’ (১৩১৯) গ্রন্থের ‘গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ’ অধ্যায়ে। এরপর ১৩৩২ সালে ‘ভারতীয় দর্শন সঙ্ঘে’র সভাপতির ভাষণেও এই ‘অচিন পাখি’র গানের উল্লেখ করে এর সঙ্গে তুলনা করেন ইংরেজ-কবি শেলীর একটি কবিতার। জমিদারি কাজে ‘পদ্মা-প্রবাহ-চুম্বিত’ শিলাইদহে বাসের সময়ে রবীন্দ্র্রনাথ ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের দু’টি খাতা সংগ্রহ করেন, যাতে সব মিলিয়ে ২৯৮টি গান ছিল। ১৩২২ সালের আশ্বিন থেকে মাঘ পর্যন্ত চার কিস্তিতে ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ‘হারামণি’ বিভাগে রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের মোট কুড়িটি গান প্রকাশিত হয়। এরপর ১৩৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত ‘ছন্দের প্রকৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে, যা পরে ‘ছন্দ’-গ্রন্থে সংযোজিত হয়, রবীন্দ্রনাথ লালনের তিনটি গান উদ্ধৃত করে এর ছন্দ-সুষমার প্রশংসা করেন। এ-ছাড়া ‘জবষরমরড়হ ড়ভ গধহ’, ‘অহ ওহফরধহ ঋড়ষশ-জবষরমরড়হ’ কিংবা ‘মানুষের ধর্ম’-বিষয়ক বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথ যে মরমি দার্শনিক তত্ত্বের আলোচনা করেছেন, তাঁর মূলেও ছিল লালনীয় তত্ত্ব-দর্শনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব।

লালনের সঙ্গীত ও দর্শন রবীন্দ্রমানসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর ‘রবীন্দ্রবাউলে’ রূপান্তরিত হওয়ার পেছনেও ছিল লালনের প্রভাব। লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’ গানটি রবীন্দ্রনাথের ভাবজগতে পরিচালিকা-শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ‘কে কথা কয় রে, দেখা দেয় না’- লালনের এই গানের ভাব-সত্যকে তিনি তাঁর ‘রাজা’ নাটকে রূপায়িত করেছেন। বাউলগান, বিশেষ করে লালনের গান রবীন্দ্রমননে যেমন তাঁর গানেও তেমনি স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে- প্রেরণা হয়েছে অনেক কবিতার। অনেক ক্ষেত্রেই রবীন্দ্রনাথের বাউলাঙ্গের গানে লালনগীতির কথা ও সুরের প্রভাব ও সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া কষ্টকর নয়। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শক্তিমান, সচেতন, অসামান্য এক শিল্পী-পুরুষ। তাই তিনি লালনের বাণী ও সুরকে ভেঙে ‘আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে’ নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন, যা একান্তই ‘রবীন্দ্রবাউলে’র রচনা। তবে এ কথা বলতেই হয়, রবীন্দ্রনাথের মরমি-মানসে লালন ছিলেন প্রেরণার এক স্বতঃস্ফ‚র্ত উৎস।

সাত.

লালনের পরিচয় ও প্রতিষ্ঠার পরিধি আজ দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বের মানচিত্রকে স্পর্শ করেছে। ইউনেস্কো ২৫ নভেম্বর ২০০৫-এ বাংলাদেশের বাউলগানকে ‘ধ গধংঃবৎঢ়রবপব ড়ভ ঃযব ঙৎধষ ধহফ ওহঃধহমরনষব ঐবৎরঃধমব ড়ভ ঐঁসধহরঃু’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বলাই বাহুল্য এর মূলে রয়েছে লালনের গান। সঙ্গত কারণেই তাঁর প্রতি বাইরের জগতের মনোযোগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদেশে বাউল ও লালন সম্পর্কে আগ্রহ ও অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় চার্লস ক্যাপওয়েল, এডওয়ার্ড সি. ডিমক, জোসেফ কুকার্জ, জুনে ম্যাকড্যানিয়েল, ক্যারল সলোমন, মাসাউকি ওনিশি, জান ওপেন শ’, মাসাহিকি তোগাওয়া প্রমুখের রচনায়। অদূর ভবিষ্যতে বহির্বিশ্বে লালন বাংলাদেশ ও বঙ্গ-সংস্কৃতির প্রতিনিধি-ব্যক্তিত্ব হিসেবে গৃহীত হবেন সে সম্ভাবনা ক্রমশ স্পষ্ট ও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

আট.

লালনের জন্মের পর ২৩৫ আর মৃত্যুর পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ১২৯ বছর। তবু আজও লালন সমান প্রাসঙ্গিক ও আধুনিক। তাঁর গান বাউলসমাজের সাধনার উপকরণ হিসেবে যেমন বিবেচিত, তেমনি সঙ্গীতরসিকের মরমি চিত্তকেও আলোড়িত করতে সক্ষম, পাশাপাশি সমাজভাবনার অনুষঙ্গেও তা মূল্যবান। স¤প্রতি প্রয়াত লালন-গবেষক ডক্টর ক্যারল সলোমন একবার এক আলাপচারিতায় বলেছিলেন, ‘লালন যে সা¤প্রদায়িকতা-বিরোধী, সে ম্যাসেজটা বেশ কয়েকটা গানে পাওয়া যায়।… আবার বেশকিছু গান আছে যা গোঁড়ামি এবং সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে। লালন বিশ্বাস করেছিলেন যে, মানুষ শ্রেষ্ঠ। তা হলে দেখা যায় যে, লালনের গানে বিশ্ব-মানবমৈত্রীর উপকরণ আছে’ (‘মনের মানুষের সন্ধানে’, আবুল আহসান চৌধুরী, ঢাকা, ১৯৯৫; পৃ. ১২৫)। আজ সা¤প্রদায়িকতা-মৌলবাদের উত্থানের কালে- মনুষ্যত্ব-মানবতার লাঞ্ছনার সময়ে- সন্ত্রাস-নৈরাজ্যের বৈরী যুগে লালনের গান হতে পারে প্রতিবাদের শিল্প- শান্তি ও শুভবুদ্ধির প্রেরণা- মানুষের প্রতি হারানো বিশ্বাসকে ফিরিয়ে আনার পরম পাথেয়। আলেক সাঁই।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj