দোহারের ছদ্মবেশ

শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯

প্রশান্ত মৃধা

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ৭

নাকি প্রাইভেট পড়িয়ে ভাসায় গিয়েছিল আড্ডা দিতে। ক্লান্ত তো শ্রীধরও। সেই কচুয়া থেকে ফিরেছে। তবে শ্রীধর খুব ধীরে হেঁটে এসেছে। কাউন্সিল পর্যন্ত আসার পরে দক্ষিণপাড়ার আইউব আর শপথকাঠির ইনামের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছে। তারপর ইনামের সঙ্গে ধীরে ধীরে এদিকে এসেছে। ইনাম এখান থেকে গেছে ভাসা। সে সময়েই বাড়িতে হাতের থলিটা রেখে অমলের দোকানের সামনে এসে দেখে পরিতোষ এই এসে বসল। পথে পরিতোষের সঙ্গে নিশ্চয়ই ইনামের দেখা হয়েছে। নাকি অন্ধকারে একজন অন্যের পাশ কেটে গেছে। রাস্তা ধরে টর্চ জ্বেলে যাওয়ার সময়ে অবয়ব দেখে তো সব সময় অনুমান করা যায় না কে গেল। তাছাড়া ভাসা থেকে কাউন্সিল পর্যন্ত রাস্তাটা অপেক্ষাকৃত চওড়াও। সেখানে রাস্তার এপাশ ওপাশ থেকে হেঁটে যাওয়ার সময়ে ডাক না-দিলে তো দেখা হওয়ার কথা না। শ্রীধর প্রথমে সে-ই কথা জানতে চায়, ‘ও পরি, তোর সাথে শপথকাঠির ইনামের দেখা হলো নিকি পথে?’

পরিতোষ জানায়, ‘হ।’ তারপর ধীরাজের সঙ্গে উঁচুগলায় কথা বলছিল সেই কথা চালানোর ফাঁকে শ্রীধর তাকে ডাকে, ‘এট্টু শুনিস এদিক, তোর সাথে কথা আছে।’ পরিতোষ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উঠে আসে। জানতে চায়, তাকে ডেকেছে কেন? কী এমন গোপন কথা। শ্রীধর জানায় কাছে না আসলে সব বলা যাবে না।

শ্রীধর পরিতোষকে নিয়ে হরিসভার দিকে যায়। কাছাকাছি যায় না। ডানদিকে মরা পগার। সেদিকে টর্চ মারে। এরপরে মণ্ডলবাড়ির রান্নাঘর। চুলায় আগুন জ্বলছে, তা বোঝা যায় একদিকের বেড়ার ফাঁক থেকে আগুন দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে এই অন্ধকার শ্রীধর পরিতোষকে বলে, ‘শোন, এই হরিসভা মন্দির সামনে যাবে, না এই জায়গায় থাকপে- এইয়ে নিয়া যে কথা তোলছে দীনেশ, এর পিছনে কেডা কেডা আছে এট্টু খবর নেতে হয়।’

‘আমি খবর নেব কোয়ানদে?’ পরিতোষ কখনও কখনও যেমন অসহায় গলায় কথা বলে। সেভাবেই বলল যেন তার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয়। কিন্তু শ্রীধরকে গোটা বিষয়টাই বুঝিয়ে দিয়েছে সুনীল, বলেছে প্রয়োজনে পুলকের সঙ্গে আলাপ করতে। আর শ্রীধর নিজেও তো বোঝে, পার্বতীর সঙ্গে পরিতোষের যা সম্পর্ক, তাতে যদি পার্বতী আর দীনেশের কোনো কথা হয়ে থাকে, তাও সে বের করতে পারবে। কিন্তু পরিতোষ একবারেই তা স্বীকারই-বা করবে কেন? সে এড়ায়ে যেতে চায়। তাই স্বাভাবিক। বরং, তার পক্ষে বলা সম্ভব এই কাজটা সুনীল নিজেই করলে পারে। তখন শ্রীধর একটু চেতে ওঠে, ‘কী, পারবি না? তুই পারবি না। বাড়িঘরে থাহি না, কিন্তু কৃপার বউর (পার্বতী) সাথে তো তার খায়খাতির কীরাম সে খোঁজ তো পাই।’

‘কীরাম খাতির?’

‘এ চোদনা, কীরাম খাতির, এহোন তোরে ক’তি হবে। কৃপা গোপালপুর গেলেই তো যাইয়ে বউদি কইয়ে শুইলে পড়িস, সেয়া মানসি জানে না।’

‘কী কও? কৃপা তোমার ভাইপো, ওয়ার বউ সম্পর্কে এইয়ে কলা-’

শ্রীধর জানে না, এ কথা বলা তার উচিত হয়েছে কি হয়নি। ভাবেও না। তার গুষ্টির ভাইপো আর সুনীলের সম্পর্কে ভাইপো। কিন্তু সুনীল এমন সব কথা কী অনায়াসে বলে। শ্রীধর বলতে পারে না। অথবা শ্রীধর কখনওই এমন সব বিষয়ে নেই। অমন কথায়ও না। কিন্তু এখন দীনেশের জন্যেই তাকে মুখ খারাপ করতে হলো। সেই ছোটবেলা থেকে সে দীনেশকে চেনে, একসঙ্গে ইস্কুলে গেছে। দীনেশের মতন প্যাঁচমাস্টার এই জীবনে দেখেনি। এখন সবাই বুঝছে পারছে, অন্তত দুই দিক থেকে প্যাঁচ খেলেছে দীনেশে। এই তালে শেষমেশ যদি পুরো ব্যাপারটাই ভেস্তে যায়, তাহলে বেশ হবে। তখন হিরুভাইকে বলে ওই আনসার ক্যাম্পের মাঠে নতুন মন্দির করতে পারবে গোড়াখালের লোকজন। আর তাতে সায় দেবে খাঁবাড়ির সর্বজিৎ! আর মধ্যপাড়ার লোকজন তো আছেই। তাদের কতদিনের ইচ্ছা। যদিও সেখানে এই কেষ্ট মল্লিক কিংবা রসিক মলিকের মতন একজনও বৈষ্ণবভাবাপন্ন মানুষ নেই। তাছাড়া আগেও এই গ্রামে কতজন পরমবৈষ্ণবের বাস ছিল; কেউ গত হয়েছে, কেউ দেশ ছেড়ে গেছে। তাদের জন্যেও হলেও এই হরিসভা মন্দির এখানেই থাকা দরকার। আজ এই কাজে শ্রীধর পরিতোষকে বলছে, কিন্তু পরিতোষের এসব নিয়ে এত আদিখ্যেতা নেই। কাল যদি দীনেশের কাছে কোনো সুবিধা পায়, তাহলে সেখানে ছুটে যাবে।

যাক, এখন পরিতোষ তাকে উলটো ঠেলা না দিলেই হয়। কিন্তু অন্য কথা বলে, ‘তুমি আর সুনীল ভাইপো মিলে আমারে এই কোন ফ্যাসাদে ফেললা? আমি এইয়ে জানতে পারব নিকি?’

‘পারবি। এট্টু চেষ্টা করলিই পারবি, দেখ ব্যাডা। আমাগে গেরামের মানুষজনের এট্টা মান ইজ্জত আছে না। এতকাল ধইরে এই জায়গায় মন্দির, যদি সইরে যায়?’

পরিতোষ জানায় সে চেষ্টায় ত্রুটি করবে না। যদিও তাকে একথাও বলতে হয়েছে যে, আর কেউ আছে কি না পিছনে তা জানার দায়িত্ব সে (শ্রীধর) আর সুনীল নেবে। যদিও তখন পরিতোষ বলছে, আর কে কে থাকতে পারে। সে সব সন্দেহই। তবে থাকতে পারে রসিকের শালি খুদি, অর্থাৎ তাদের কারও খুদি মাসি কারও খুদি দিদি! থাকতে পারে রাঘব। সে অনেকের কথাতেই উঠে বসে। সেই অনেকের ভিতরে যদি দীনেশ কিংবা বর্ণচোরা হরষিত থাকে তো থাকতে পারে। হরষিতের কাকা যতীনের অনেকদিন ধরেই ইচ্ছা ওই আনসার ক্যাম্পের কাছে চলে যাক মন্দির! আর? আরও আছে সে-সব নিয়ে পরিতোষকে পরে বলবে।

এ কথা শুনে পরিতোষ জানায়, এর চেয়ে তার রাঘবের কাছ থেকে জানার দায়িত্ব নেয়াই সহজ। সুনীলের সঙ্গে বরং পার্বতীর খাতির ভালো। সুনীল নয় এসে পার্বতীর কাছ থেকে কথা শুনুক। কিন্তু না, সুনীল আজকাল গ্রামে আসার সুযোগ তেমন পাচ্ছে না। বাঁধাল বাজারে এখন তার কাজ। সেই সকালে যায়, ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা!

শ্রীধরের এত আয়োজন, এত অনুনয়ে কিছু কাজ হয়। দিন কয়েকের ভিতরই এক সন্ধ্যারাতে পরিতোষ তাকে জানায়, কথায় কথায় খবর যা বের করার সে বের করতে পেরেছে। আবার শ্রীধরও তাকে জানায়, সে আর সুনীল রাঘবের বিষয়টাও জানতে পেরেছে রথীনের কাছ থেকে। দুই দিকেই আপাতত ঘটনা দীনেশের দিকে। দীনেশ ঘুঁটি চেলেছে, তাতে কাজও হয়েছে। যদি আসছে দুর্গাপূজার আগে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে কোনো দিন হয় সৈয়দ হিরুকে এনে ওই ক্যাম্পের মাঠের পাশে নতুন মন্দিরের কাজে হাত দেবে গোড়াখালে লোক। তাতে কার কী হবে? হবে একটাই, এদিকের হালদার মল্লিক মণ্ডল আর হাজরাদের উপরে এতদিনে একটা টক্কর দিতে পারল, ওপারের মলঙ্গি-মাঝি-ঘরামি আর খাঁ-রা। তবে সাড়ে আট আনি আর সাড়ে সাত আনির রেষারেষিতে আপাতত গোড়াখালের জিৎ হবে। সেই জিতের রেষ তারা বহুদিন বয়ে বেড়াতে পারবে! কোনোভাবেই তা ঘটতে দেওয়া যাবে না। এখনই যা করার করতে হবে। হরষিতকে একটু দূরে রেখে।

পরিতোষ জানতে পারে ও জানায়। সবার পরিকল্পনা অনুযায়ী মন্দির যেখানে আসবে, তা মল্লিকবাড়ির সামনে পুবদিকে। সেখানের মন্দির হলে সাবিত্রীকে কেষ্ট মল্লিক যে চার কাঠা জমি লিখে দিয়েছে তা পড়ে ঠিক সামনে। ফলে আজ হোক কাল হোক, মন্দির সামনের এই রাস্তা যখন ইট লাছা কি পিচের হবে, তখন এই জমির দাম বাড়বে। তাহলে মন্দির হওয়ার কারণে সাবিত্রী অনায়াসে ধনী হয়ে যাবে। আর এখন যেখানে পার্বতীর ঘর তা তো একটু ভিতরে। সে জমি সব সময়ই একই থেকে যাবে। তাই পার্বতী দীনেশকে বলেছে, সে যদি পারে মন্দির যেন সামনে না আসে সেই ব্যবস্থা করে। সেজন্যে পার্বতী যদি গোপনে কোথাও দীনেশের সঙ্গে দেখা করতে হয় তাই করেছে। কিন্তু করেছে কি না, সবই অনুমান। হয়তো এ কথাও সে বলতে পারে, আগে কাজ হোক, তারপর দেখা যাবে।

ওদিকে রাঘবের সঙ্গে ঘটনাটাও ঘটেছে প্রায় একই। রাঘবকেও বুদ্ধি দিয়েছে দীনেশ। তবে সরাসরি দীনেশ নয়। দীনেশ সে কাজে হরষিতকে লাগিয়ে ছিল। বাপের অসুস্থতায় রাঘব আর রথিন টাকা পয়সায় কাবু। পারলে জনই খাটে। আর রথিনের ইচ্ছা খুলনা কিংবা ঢাকায় কোনো ছোটখাটো চাকরিতে যায়। ফলে হরষিতকে দিয়ে দীনেশের পক্ষে রাঘবকে কিছু প্রস্তাব পাঠানো আসলেই সোজা।

রথীনকে কচুয়ায় পেয়ে সব জানতে পারে সঞ্জয়। শ্রীধর সঞ্জয়কে বলে রেখেছিল, যদি সুযোগ হয়, ঘটনাটা যেন একটু জানে। সঞ্জয় রথিনের সঙ্গে স্কুলে পড়েছে। ফলে দীনেশের চালে তার দাদা রাঘব যদি নিজের গুষ্টির লোকজনের সঙ্গে এই কাজ করে তাহলে তা কোনোভাবেই ভালো হয় না। রাঘবকে হরষিত বুঝিয়েছে, এই জায়গায় জমি ছেড়ে পিছনে, ওই চিকন রাস্তার পাশে আজকের হরিসভার জায়গার জমি না-নেওয়াই ভালো। ভাসা থেকে কাউন্সিল পর্যন্ত রাস্তা পাকা হয়ে গেলে, ওই হরিসভার পাশের রাস্তা এক সময়ে আর কোনো কাজেই লাগবে না। তখন? তার চেয়ে ওইখানে রসিকের জমিতে হরিসভা আছে থাকুক, বদল করার দরকারই-বা কী? এসবই তাকে ভাবতে বলেছে।

ঘটনা যখন এই, তা প্রকাশ্যে হয়তো আনা যাবে না। কারণ প্রকাশ্যে আনার মতো করে তো কিছু ঘটেনি। তবে দীনেশের তৎপরতায় সবাই তৎপর হয়েছিল তখন একদিন, সুনীল এসে রণজয়কে নিয়ে রসিকের সামনে কথা তোলে। রসিক তার কথা জানায়। তার তো এ নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই। সে মন্দিরের নামে দানপত্র করে দেবে। তাহলে এখন আর এ নিয়ে তার নতুন করে বলার কী থাকতে পারে?

কী থাকতে পারে তা রসিকের মতো উদাসী মানুষের এই জীবনেও বোঝা সম্ভব নয়। সে তো জমি দিয়েই খালাস। ভিতরে কত পদের হিসেব থাকে। সেসব হিসাবের কোনো কিছুতেই তো সে কোনোকালে বুঝল না। বুঝবেও না। আজ তারা যে এভাবে তৎপর, তাও তো দুটো কারণে। একটা হলো ওখানে মন্দিরটা হোক। আর তার মতো মানুষ যে নিজের দিকে না-তাকিয়ে গ্রামের মানুষজনরে এই জমি দান করেছে, সেই চেষ্টা যেন কোনোভাবেই বৃথা না যায়।

এ সময়ে অমল জানায়, সে আপাতত তার দোকান মন্দিরের উঠানের নিচে যে ঢাল, তার পাশে নিয়ে যাবে। তাতে দোকানের জায়গাও একটু বড়ো হবে, আর এই রসিক দাদার দোকানে বয়স্করা বসে, তার থেকে একটু তফাতে হবে তার দোকানে। সেখানে জোয়ানরা বসে অনেক সময় উঁচু গলায় কথা বলে। তার চেয়ে ওইখানে যাওয়াই ভালো।

এই প্রস্তাবও সবাই সাধুবাদ জানায়। আর এবার হবে না, সামনের বারের দুর্গাপূজার আগে মন্দির এখানে আনার চেষ্টা করতে হবে। যদিও তাতে খরচ আছে। নতুন করে পোতা বাঁধতে হবে। পাশাপাশি দুটো মন্দির। বাইরের দিকে প্রথমে জগন্নাথ মন্দির, তারপর দুর্গা ও কালী মন্দির। কথায় রণজয় বলে, চেষ্টা করতে হবে যেন এমপি সাহেবকে বলে, কোনোভাবে সাহায্য আনা যায়।

তবে আপাতত এই সবই তো কথার কথা। এই রসিকের দোকানের সামনে আলোচনা। এমন আলোচনা আগেও হয়েছে, পরেও আবার হবে। এই আলোচনার চেয়ে দরকার নিজেরা কী করতে পারে সেই সিদ্ধান্ত করা।

কিন্তু যে যা-ই ভাবুক, যে ভাবেই বলুক, সব ঘটনা সহজে একদিকে ধাবিত হয় না। যেমন, ধীরে ধীরে ছবির কাছ থেকেই হোক কিংবা গুণধরের বউ বিন্দুর কাছ থেকে হোক, সাবিত্রীর কাছে এ কথা যায়। সাবিত্রী কোনো কথা নিয়েই কখনও ঘোট পাকায় না। সে সাহস আর সামর্থ্য তার নেই। সে দুর্বল সে তা জানে। পর পর তিনটি মেয়ে হওয়ায় তার দুর্বলতা আরও বেড়েছে, তাও জানে। এই জগতে, এই এলাকায়, এই বাড়িঘরে কেউ যদি তাকে সামান্য ভালোবাসে, সে ওই বুড়ো ব্যাটা কেষ্ট মল্লিক। আর তার যদি কখনও মনের কথা বলার একটা মানুষ থাকে, সে ওই খুদি মাসি! আর তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তার। সব সময়ে তার পিছনে লেগে আছে ওই পার্বতী!

কিন্তু রাধামাধবের নামে যে মন্দির হবে, সেই মন্দির যেন সামনে আসতে না পারে সেজন্য পার্বতীর ওই কলকাঠি নাড়ার কথা সে জানার পরে শুধু খুদির কাছে গিয়ে বলে, ‘ও মাসি! ও পাডির চাইল চরিত দেহিচেন? আরে, এই জায়গায় মন্দির আসিল সেখানে ভাগবৎ পড়বে তোর এইঘরের দাদাশ্বশুর (রসিক) আর নয় তোর শ্বশুর। আর তুই কাগে সাথে না কাগে সাথে মিশে জোয়ারে বাতাস দিস্!’

খুদি সাবিত্রীকে দেখে। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj