আমাদের রাসেল : মহিউদ্দীন আহ্মেদ

বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯

ছুটির দিন। শরতের বিকেল।

আকরাম সাহেব ড্রইংরুমে বসে চায়ের সঙ্গে পেপার পড়ছিলেন।

খবরের কাগজের একটি পৃষ্ঠা নিয়ে এ-ঘরে দৌড়ে এল তার ছোট ছেলে রাসেল আকরাম।

খবরের কাগজে একটি ছবি ছাপা হয়েছে। হাইনেক জাম্পার পরা একটি কিশোরের ছবি। রাসেল সেই ছবিটিকে দেখিয়ে বলল, ‘বাবা এই যে দেখ। এখানে লেখা আছে- এই ছেলেটির নামও রাসেল!’

আকরাম সাহেব চোখ তুলে সেদিকে তাকালেন। ছবিটা দেখে হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই তো!’

রাসেল বলল, ‘আমার নামও রাসেল আর এই ছেলেটির নামও রাসেল! কী মজার ব্যাপার, তাই না?’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘হ্যাঁ। তা বলতে পারো।’

রাসেল যেভাবে হন্তদন্ত হয়ে এসেছিল সেভাবেই আবার চলে গেল।

আকরাম সাহেব কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। সুযোগ পেলেন না।

তিনি পুনরায় পেপারে মনোযোগ দিলেন।

একটু পরে রাসেল আবার এল। এসে বলল, ‘বাবা একটি কথা বলতে পারি?’

আকরাম সাহেব হেসে বললেন, ‘অবশ্যই বলতে পারো। একটি নয়। তুমি অনেকগুলো কথা বলতে পারো।’

রাসেল বলল, ‘ওই ছেলেটি কে? সে কি স্পেশাল কেউ।’

আকরাম সাহেব মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘ঠিক ধরেছো।’

রাসেল বলল, ‘তার মানে তুমি তাকে চেনো?’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘চিনি। শুধু আমি না। বলতে গেলে দেশের সবাই চেনে।’

রাসেল অবাক হয়ে বলল, ‘সবাই চেনে! কিন্তু আমি তো চিনি না।’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘এখনই চিনবে। মানে আমি তোমাকে চিনিয়ে দেব।’

রাসেল বলল, ‘আচ্ছা! তাহলে চিনিয়ে দাও!’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘চিনতে চাইলে তোমাকে একটু কষ্ট করতে হবে।’

রাসেল বলল, ‘কীরকম?’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘একটু আগে যে পেপারটি এনেছিলে, সেটি আবার নিয়ে আসতে হবে।’

‘ওকে। আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি!’

রাসেল চড়–ই পাখির মতো ফুড়–ৎ করে চলে গেল এবং দুহাত দুদিকে প্রসারিত করে হেলিকপ্টারের মতো যেন উড়ে এল। বাবাকে পেপারটি দিয়ে বলল, ‘এই যে নাও!’

আকরাম সাহেব তার ছেলেকে পাশে বসালেন। তারপর বললেন, ‘তুমি এটা পড়ো!’

রাসেল বলল, ‘তুমি তো জানো বাবা, আমি এখনো ভালোভাবে পড়তে পারি না।’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘যতটুকু পারো তাতেই হবে। বানান করে করে পড়ো। আমি তো আছিই। না পারলে আমি তোমাকে হেল্প করব।’

‘আচ্ছা পড়ছি!’ -বলে রাসেল পেপারের লেখাটি পড়তে শুরু করল থেমে থেমে : ‘১৮ অক্টোবর ১৯৬৪। হেমন্ত কাল। নবান্নের উৎসবকে রাঙাতে এল নতুন অতিথি। যার আগমনে পুরো পরিবারে বয়ে গেল আনন্দের জোয়ার।’

এই পর্যন্ত পড়ে রাসেল আকরাম থামল। বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মানে কী বাবা? আমি তো ব্যাপারটার কিছুই বুঝতে পারছি না।’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘পড়ে যাও। বুঝতে পারবে।’

রাসেল আকরাম পড়তে লাগল : ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বার্ট্রান্ড রাসেলের ভক্ত।’

এই লাইনটি পড়ে চমকে উঠল রাসেল আকরাম। বলে উঠল, ‘আরে! আরেকটা রাসেলের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাবা, বঙ্গবন্ধুকে তো চিনি। কিন্তু বার্ট্রান্ড রাসেল কে?’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘তিনি হচ্ছেন, নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত দার্শনিক! পারমাণবিক যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের একজন নেতা।’

‘কিন্তু উনার সঙ্গে রাসেলের সম্পর্ক কী?’ -অবাক হয়ে জানতে চাইল রাসেল আকরাম।

আকরাম সাহেব বললেন, ‘আরেকটু পড়ো। বুঝতে পারবে।’

রাসেল আকরাম পড়তে লাগল : ‘এই বার্ট্রান্ড রাসেলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধু তার ছেলের নাম রাখেন রাসেল।’

রাসেল আকরাম আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে বলল, ‘ও এইবার বুঝতে পেরেছি। রাসেল হলো বঙ্গবন্ধুর ছেলে। দারুণ তো।’

এরপর আর বলতে হলো না। রাসেল আকরাম নিজেই পড়েতে লাগল :

‘বাবার সঙ্গে ছিল রাসেলের দারুণ সম্পর্ক। সে বাবার চশমাটি নিয়ে চোখে পরতো। বঙ্গবন্ধু তাকে দেখতে দেখতে হাসতেন। আদর করতেন।

ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারের বাড়িতে একটি কুকুর ছিল। নাম টমি। কুকুরটি রাসেলের সঙ্গে খেলত। একদিন হলো কি, কুকুরটি কী কারণে যেন হঠাৎ ঘেউ ঘেউ করে উঠল। রাসেলের মনে হলো, টমি তাকে বকা দিচ্ছে।

রাসেল কাঁদতে কাঁদতে বড় বোন হাসুপার কাছে গিয়ে বলল, ‘টমি তাকে বকা দিয়েছে।’

রাসেল আকরাম পড়া থামিয়ে বলল, ‘হাসু আপাটা আবার কে?’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘চিন্তা করে বের করো।’

রাসেল আকরাম গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগল। তারপর বলে উঠল, ‘পেয়েছি! হাসুপা হচ্ছেন শেখ হাসিনা, রাইট?’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘একদম ঠিক।’

‘স্কুলের যাওয়ার চেয়ে খেলা করতে বেশি পছন্দ করত রাসেল। রাসেলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল। কিন্তু তার স্কুলে যাবার ব্যাপারে ছিল আপত্তি। মাঝে মাঝেই সে স্কুলে যেতে চাইত না। পরে তাকে পড়ানোর জন্য বাড়িতে একজন শিক্ষককে নিযুক্ত করা হয়েছিল।’

রাসেল আকরাম পড়া থামিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিলে যাচ্ছে তো বাবা!’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘কী মিলে যাচ্ছে?’

রাসেল আকরাম বলল, ‘আমারও তো স্কুলের চেয়ে খেলাধুলা করতে বেশি ভালোলাগে।’

আকরাম সাহেব হো হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, ‘কিন্তু বাবা পড়াশুনা তো করতেই হবে। জানো তো- পড়াশুনা করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে।’

রাসেল আকরাম কী যেন চিন্তা করতে লাগল।

আকরাম সাহেব বললেন, ‘কী হলো বাবা?’

‘তুমি কি আমাকে একটি কুকুর কিনে দেবে?’ -বলল রাসেল আকরাম।

আকরাম সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা দেবো।’

রাসেল আকরাম খুশি হয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ তারপর বলল, ‘কিন্তু রাসেল এখন কোথায় থাকে? তাকে তো দেখি না?’

আকরাম সাহেব চুপ হয়ে গেলেন। কী বলবেন বুঝে উঠতে পারলেন না।

‘কী হলো বাবা? কথা বলছো না যে? বলো না, রাসেল কোথায়?’

আকরাম সাহেব বললেন, ‘আমাদের মনে।’

বাবার কথা শুনে ভীষণ অবাক হয়ে পড়ল রাসেল আকরাম। বলল, ‘আমাদের মনে মানে? কী বলছো তুমি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

আকরাম সাহেব চোখ মুছলেন। তারপর বললেন, ‘আজ থাক। এই কথাটি তোমাকে পরে কখনো বলব, কেমন?’

রাসেল আকরাম তার বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। বুঝতে পারল, তার বাবার মন খারাপ হয়ে গেছে। কিন্তু কী কারণে তার মন খারাপ হয়েছে তা বুঝতে পারল না।

আকরাম সাহেব রাসেলের হাত ধরে বললেন, ‘চলো বাইরে থেকে ঘুরে আসি।’

রাসেল আকরাম খুশি হয়ে বলল, ‘ওকে!’

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj