জাতিসংঘ অধিবেশনে ভাষণ কাল : রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চার দফা প্রস্তাব দেবেন প্রধানমন্ত্রী

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান খোঁজার তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই সংকটের সমাধানে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি সুনির্দিষ্ট চারটি প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন। গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ইসলামী দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত ‘রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: এ ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ওই চার প্রস্তাবের কথা জানান তিনি। ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি এই চার প্রস্তাব তুলে ধরবেন বিশ্বনেতাদের সামনে।

গত মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ, ওআইসি মহাসচিব ড. ইউসেফ বিন আহমেদ আল-ওথাইমেন, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ইব্রাহিম বিন আবদুল আজিজ আল-আসাফ। উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল অব নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডার এন্ড অটিজম অব বাংলাদেশের চেয়ারপার্সন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, বেলজিয়াম, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, সার্বিয়া, ফিলিপাইন ও গাম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা সংকট একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এর মূল মিয়ানমারে গভীরভাবে প্রথিত। এ সংকটের সমাধান মিয়ানমারের ভেতরেই খুঁজে পেতে হবে। রোহিঙ্গাদের টেকসই, নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সংকট সমাধানে শেখ হাসিনার চার প্রস্তাব হচ্ছে- রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন এবং আত্মীকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে। বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের উত্তর রাখাইন সফরের ব্যবস্থা করতে হবে। রাখাইনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক পর্যবেক্ষক রেখে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়ের অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো বিবেচনায় নিতে হবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেদারল্যান্ডসের রানি ম্যাক্সিমার সঙ্গে বৈঠক করেন এবং গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপ্টেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। দুপুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ মহাসচিবের দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

বিকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘লিডারশিপ ম্যাটারস- রিলেভেন্স ও অব মহাত্মা গান্ধী ইন দ্য কনটেমপোরারি ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, ধর্ম, বর্ণ ও জাতি স¤প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাকে মহাত্মার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আমি বঙ্গবন্ধুর বুদ্ধিদীপ্ত চৌকস নেতৃত্ব, ত্যাগ ও সংগ্রামের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর অনেক মিল পাই। তিনি বলেন, সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য গুরুতর সমস্যা সত্ত্বেও মানুষের প্রতি আমাদের বিবেক নিঃশর্ত ভালোবাসা থেকে এ ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই মহৎগুণ আমরা বঙ্গবন্ধু ও মহাত্মা গান্ধীর মধ্যে দেখি। অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সেইন লুং, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লুন-জে-ইন, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরদারনসহ ৭ জন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করেন। রাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নৈশ ভোজে অংশ নেন।

জলবায়ু অর্থায়নে অঙ্গীকার পূরণ করুন : এদিকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স কক্ষে এক অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়নের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একটি কার্বন অনিঃসরণকারী দেশ এবং সম্পদের সীমাবদ্ধতা, সামর্থ্যের স্বল্পতার পরও বাংলাদেশ স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের অংশীদারত্বের অঙ্গীকার এমন একটি প্ল্যাটফর্মের সৃষ্টি করবে, যেখানে উদ্ভাবনী এবং অভিযোজনমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ জলবায়ু পরিবর্তনের সহযোগিতামূলক বিভিন্ন কার্যপ্রণালি নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।

এই বৈঠক আয়োজনের জন্য নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আমাদের সময়ের সবচেয়ে গুরুতর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে রয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমবর্ধমানভাবে আমাদের সভ্যতার ক্ষতি সাধন করছে। তবে বাংলাদেশে কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা প্রক্রিয়ার কারণে হতাহতের সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। আমরা জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পানি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় মোকাবেলা করতে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ সহ অভিযোজন ও সহনশীলতা তৈরির পদক্ষেপ নিয়েছি।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি উদ্ভাবিত রিস্ক ইনফর্মড আর্লি অ্যাকশন পার্টনারশিপ (আরইএপি) একটি উচ্চাকাক্সিক্ষ নতুন পদক্ষেপ। ৫০টির বেশি দেশ ও ২০টির বেশি সংস্থা এই অংশীদারত্বে যোগ দিচ্ছে। ২০২৫ সাল নাগাদ দুর্যোগের কবল থেকে সারা বিশ্বের ১০০ কোটি মানুষকে রক্ষা করাই হচ্ছে আরইএপির লক্ষ্য।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj