বাটোয়ারা যাদের ঘরে : রিমান্ডে খালেদ ভূঁইয়া-জি কে শামীমের তথ্য

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : রাজধানীতে ক্যাসিনো ও জুয়ার ক্লাবের সঙ্গে জড়িতরা সটকে পড়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ঢাকার ক্যাসিনোর অন্যতম নিয়ন্ত্রক যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম পুলিশকে জানাচ্ছে অন্ধকার এই জগতের রথী-মহারথীর নাম। এতে সাংসদ, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ীদের নামের তালিকা পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের চোখ চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম। যাদের অনেকে ক্যাসিনো ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন আবার অনেকে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। পৃথক জিজ্ঞাসাবাদে খালেদ-শামীমের দেয়া তথ্যের সূত্রে অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে র‌্যাব-পুলিশ খুঁজছে। এর মধ্যে হাই-প্রোফাইলের অনেকের ব্যাপারে ধীরে এগোচ্ছে র‌্যাব।

এদিকে, গতকাল সন্ধ্যায় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার অস্ত্র ও মাদক মামলার তদন্তভার র‌্যাবকে হস্তান্তর করেছে মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। আদালতের মঞ্জুর করা সাতদিনের রিমান্ড চলাকালীন মামলাটি র‌্যাবে হস্তান্তর করা হলো। র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান জানান, খালেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র ও মাদক আইনের মামলা দুটির তদন্ত করবে র‌্যাব। ওই মামলাগুলোর নথিপত্র র‌্যাব ইতোমধ্যে হাতে পেয়েছে।

সূত্র জানায়, খালেদের ৭ দিনের রিমান্ডের গতকাল বুধবার ছিল ষষ্ঠ দিন। মিন্টো রোডে ডিবি অফিসে তাকে একাধিক টিম দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে। ক্যাসিনো ও জুয়া ছাড়াও রাজধানীর চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র ও অপরাধ জগৎ নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খালেদ এই জগতের যাদের নাম প্রকাশ করেছেন তারা সবাই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত।

সূত্র আরো জানায়, মতিঝিল ক্লাবপাড়ার সরাসরি ক্যাসিনো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সংখ্যা হাতেগোনা। কিন্তু সবমিলিয়ে এর সঙ্গে জড়িতের সংখ্যা দীর্ঘ। বিশেষ করে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার অনেককে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলছিল ক্যাসিনো ও জুয়ার আসর। নামের তালিকা ধরে পুলিশের ভেতরে কাজ শুরু হয়েছে। এ ছাড়া অন্যদের ধরার চেষ্টা করছে পুলিশ। পাশাপাশি র‌্যাব কর্মকর্তারা মনে করছেন আলামতসহ জড়িতদের আটক করতে।

অন্যদিকে ১০ দিনের রিমান্ডে থাকা শামীমের গতকাল ছিল চতুর্থ দিন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছেন, ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রক সিন্ডিকেট, ক্যাসিনো মালিকদের সঙ্গে তার যোগসূত্র, টাকা কীভাবে, কোন ব্যাংকে, কার হিসাবে রাখতেন এসব তথ্য। এ ছাড়া বিদেশে যাতায়াত, বৈঠক ও অর্থ পাচারসহ কারা টাকার ভাগ পেতেন তাদের নামের তালিকা জানিয়েছেন তিনি। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা আর্থিক সুবিধাভোগীদের কোন মামলায় আটকাবেন সে ব্যাপারে ভাবছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে ক্যাসিনো অভিযানের পর র‌্যাবের দায়েরকৃত মামলার ধারা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশে জুয়াবিরোধী একটি আইন থাকলেও অভিযানে আটক শতাধিক ব্যক্তির কারো বিরুদ্ধেই ওই আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। পুলিশ বলছে, দেশে পাবলিক গ্যাম্ব^লিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭ নামের যে আইনটি রয়েছে সেটি রাজধানীতে প্রয়োগ করার সুযোগ নেই। এর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকা ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশে ইহা প্রযোজ্য হইবে’। ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ৯২ ধারায় প্রকাশ্যে জুয়া খেলার জন্য মাত্র ১০০ টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে।

ফ্ল্যাট বাড়িতেও ক্যাসিনো : অন্যদিকে বিভিন্ন ক্লাবের পাশাপাশি অভিজাত এলাকার ২১টি ফ্ল্যাটে ক্যাসিনো চলেছে বলে তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ক্যাসিনো পরিচালনা করছেন কয়েকজন নেপালি ব্যবসায়ী। পাশাপাশি নেপাল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা কয়েকজন বাংলাদেশি যুবকও এগুলোতে কাজ করেন। নেপালিদের কেউ কেউ স্টুডেন্ট ভিসা, আবার কেউ বাংলাদেশে ঘুরতে আসার ভিসা নিয়ে এসব কাজ করছেন। ফ্ল্যাটের এসব ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের নেতারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীর বেইলি রোডের ৩টি ফ্ল্যাটে, গুলশানে ১টি, বনানীতে ১০টি ও উত্তরায় ৭টি ফ্ল্যাটে অবৈধ ক্যাসিনোর ব্যবসা রয়েছে।

সূত্র জানায়, বেইলি রোডের ক্যাসিনো তিনটির নিয়ন্ত্রক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী স¤্রাট। বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে আহমেদ টাওয়ার, সুইট ড্রিমসের ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাদত হোসেন ওরফে সেলিম। উত্তরা ১ নম্ব^র সেক্টরের পূবালী ব্যাংকের দোতলায় ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক উত্তরা পশ্চিম থানা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী জাকারিয়া।

প্রসঙ্গত, গত ১৮ সেপ্টেম্ব^র রাজধানীর ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে প্রথম অভিযান চালায় র‌্যাব। এখানে জুয়া-ক্যাসিনো চালানোয় ক্লাবের কর্ণধার যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে তার গুলশানের বাসা থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিন মতিঝিলে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও গুলিস্তানে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবেও অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে জুয়া-ক্যাসিনোর বিপুল সরঞ্জাম, টাকা জব্দের পাশাপাশি ১৪২ জনকে আটক করা হয়। যুবলীগ নেতা খালেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক ও মুদ্রাপাচার আইনে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া আটক অন্যদের ছয় মাস থেকে এক বছর মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মাদক রাখা ও সেবনের অভিযোগে তাদের এই সাজা দেয়া হয়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে নিকেতনের বাসা থেকে আটক করা হয় জি কে শামীমকে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj