রিকশা চলছে আগের মতোই : চালু করতে হবে চক্রাকার বাস সার্ভিস

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মুহাম্মদ রুহুল আমিন : যানজট কমাতে নগরীর তিন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন। তার ঘোষণা অনুযায়ী, গাবতলী থেকে আজিমপুর (মিরপুর রোড), সায়েন্স ল্যাব থেকে শাহবাগ ও কুড়িল থেকে খিলগাঁও হয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত রিকশা চলবে না। ঘোষণা দেন ফুটপাত দখলমুক্তেরও। তার এই ঘোষণা কার্যকর হয়নি। সড়কগুলোতে রিকশা চলছে আগের মতোই। কমছে না যানজট। বাড়ছে দুর্ভোগ। ট্রাফিক বিভাগের দাবি- পুরোপুরি না হলেও কার্যকর হয়েছে অনেকটাই। ডিএনসিসির মতে, এ ব্যবস্থা টেকসই রূপ দিতে কার্যক্রম চলছে। আর নগরবিদরা বলছেন, রিকশাকে অঞ্চলভিত্তিক যানবাহনে পরিণত করার পাশাপাশি চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু ও ফুটপাতে হাঁটার উপযোগী করে তোলার মধ্য দিয়েই সিদ্ধান্ত কার্যকর সম্ভব।

জানা গেছে, গত ৩ জুলাই ডিএসসিসির নগর ভবনে ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কন্ট্রোল অথোরিটির (ডিটিসিএ) ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, ঢাকা উত্তরের সিইও, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক), রাজউক চেয়ারম্যান, ডিটিসিএ, বিআরটিএ, বিআরটিসিসহ সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। ওই বৈঠকেই তিন সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

মেয়রের ঘোষণা অনুযায়ী, ৭ জুলাই থেকে রিকশা চলাচল বন্ধে সড়কে নামে ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। মনিটরিং হয় সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও। সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে প্রথম দিন থেকেই আন্দোলনে নামে রিকশাচালক ও মালিকরা। প্রধান প্রধান সড়ক অবরোধ করে তারা। চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় পথচারীদের। সমস্যা সমাধানে মালিক-শ্রমিকদের নগর ভবনে চায়ের দাওয়াত দেন দক্ষিণের মেয়র। কয়েক দফা বৈঠকে বসতে হয় উত্তরের মেয়রকেও। তাতে খুব একটা সুফল মিলেনি।

সরেজমিন নগরীর তিনটি সড়কের খিলগাঁও, মালিবাগ, আবুল হোটেল, রামপুরা, বাড্ডা, সায়েন্সল্যাব, এলিফেন্ট রোড, কাটাবন, নিউ মার্কেট, নীলক্ষেত, আজিমপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে অন্যান্য যানবাহনের পাশাপাশি সমানতালে রিকশা চলাচল করছে। ট্রাফিক পুলিশ তাদের বাঁধা দিচ্ছে না। ফলে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে আগের মতোই। লিমন নামের এক পথচারী জানান, তিনটি সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের ঘোষণা সাধুবাদ জানিয়েছিলাম। তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমরা হতাশ। তার মতে, নগরীর যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ রিকশা। ধীরগতির বাহন হওয়ায় এটি প্রধান প্রধান সড়কে বন্ধের দাবি জানান তিনি।

রামপুরার বাসিন্দা হাসান সরকার জানান, রিকশা চলাচলে আমাদের কিছুটা সমস্যা হয়। কিন্তু স্বল্প দূরত্বের জায়গায় যেতে এর বিকল্পও নেই। রিকশা বন্ধের পূর্বে স্বল্প দূরত্বে যেন মানুষ সহজেই চলাচল করতে পারে, সে জন্য বিকল্প পরিবহনের ব্যবস্থা রাখার কথা বলেন তিনি।

উদ্যোগ নেয়ার পরেও ঠিক কি কারণে রিকশা চলাচল বন্ধ হচ্ছে না; এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয় নেতারা, গণমান্য ও রিকশার মালিকদের নিয়ে মিটিং করেছি। তাদের দাবি অনুযায়ী রামপুরা ব্রিজ ক্রস করে আফতাবনগর-বনশ্রী যাওয়ার অনুমতি দিয়েছি। কিন্তু রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তটি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমি আবার তাদের (রিকশা মালিক ও চালক) সঙ্গে মিটিং করব। এই পদ্ধতিটাকে কিভাবে টেকসই করা যায় সেটা আলোচনা চলছে। আশা রাখি, একটা সিদ্ধান্তে পৗঁছাতে পারব।

সড়ক তিনটি পুরোপুরি রিকশামুক্ত হয়নি এমনটা স্বীকার করে ঢাকা মহানগর অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ঢাকা নগরীতে রিকশা সামাাজিক ব্যাধির মতো। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কি কারণে পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রিকশা চালকের অভ্যাস। যাত্রীদের অভ্যাস ইত্যাদি কারণে। তবে মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, হাঁটার অভ্যাস তৈরি হয় সে জন্য ফুটপাতগুলো হকারমুক্ত করা হচ্ছে। ওইসব রোডে বাস চলাচল কাউন্টারভিত্তিক করা হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ২২টি রুটে পর্যায়ক্রমে সাড়ে ৮০০ এসি বাস নামানো হচ্ছে। সবকিছু মিলেই আমরা সড়কে একটা শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছি। তবে ধীরে ধীরে হবে। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

রিকশাকে অঞ্চলভিত্তিক বাহনে পরিণত করতে হবে : নগরবিদ স্থপতি ইকবাল হাবীবের মতে, হলি আর্টিজানের ঘটনার পর গুলশান-বনানী ও বারিধারা অঞ্চলে রিকশা অঞ্চলভিত্তিক সীমাবদ্ধ করে লোকাল যানবাহনে পরিণত করা হয়েছিল। একই সঙ্গে চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু করে বিকল্প বাহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফুটপাতগুলোও উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এগুলোর কোনোটাই যদি এককভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা হতো। তাহলে সাফল্য আসার কোনো সুযোগ ছিল না। যারা হেঁটে যাবে, স্বল্প দূরত্বে যাবে এবং বাসে চলার মতো সামর্থ্য আছে- তাদের সম্পৃক্ত না করে রিকশা বন্ধ করলে স্বাভাবিকভাবে মানুষের চলাচল কোনোভাবেই আটকে রাখা সম্ভব না। এর ফায়দা তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনেই নিতে শুরু করে। অল্প একটু চাঁদা বা টাকার ফাঁক পেলেই তারা ছাড় দেয়।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj