বোকা ভূত : আবুল কালাম আজাদ

বুধবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফজলু আর বজলু। দুই বন্ধু। ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যাকে বলে হরিহর আত্মা।

ফজলু-বজলু। নামে মিল। মিল আরো অনেক কিছুতেই।

দুজনই ভীষণ সাহসী। যে সব স্থানে লোকজন দিনের বেলা যেতে সাহস পায় না, সে সব স্থানে এই দুজন অনায়াসে অমাবশ্যার রাতে চলে যায়। দুজন আবার চালাকও খুব। যে কেউ এদের চালাকির কাছে কুপোকাত হতে বাধ্য। দুজনেরই শখ মাছ ধরা। প্রায়ই পুকুর-খালে-বিলে-নদীতে দুজন মাছ ধরে বেড়ায়। আর মাছ ধরতে পছন্দ করে রাতের বেলায়। দিনের বেলায় মানুষের যাতায়াত, কোলাহল থাকে। তখন মাছেরা অপেক্ষাকৃত গভীর জলে থাকে। আর তখন মাছ ধরায় মনোযোগ রাখাও একটু কঠিন।

সেটা অমাবস্যার রাত ছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। অন্ধকার ফুঁড়ে ঝিঁঝি পোকার ডাক। সেই অন্ধকার রাতে দুজন বের হলো মাছ ধরতে। মাছ ধরতে গেল বাড়ি থেকে বেশ একটু দূরে একটা খালে। খালটা আবার বনের পাশে। অথবা খালের পাশে বন।

রাত বারোটার মতো হবে। ফজলুর কাঁধে একটা ঝাঁপি জাল। খেও জালও বলে অনেকে। আর বাঁ হাতে একটা হারিকেন।

ফজলুর বাঁ হাতে মাছ রাখার পাতিল। ডান হাতে তিন ব্যাটারির একটা টর্চলাইট। টর্চলাইটটা রাখা হয় জরুরি প্রয়োজনের জন্য। অনেক সময় বাতাসে হারিকেন নিভে যায়। অথবা বেসামালে হারিকেন উল্টে পড়ে যেতে পারে। তখন টর্চলাইটই ভরসা। আবার দূরের জিনিস দেখার জন্য টর্চলাইটের দরকার।

ওরা প্রায় খালের কাছে এসে গেছে। সে জায়গাটায় পায়ে হাঁটার কাঁচা মাটির পথটা বেশ সরু। দুপাশের ঝোপ থেকে গাছের ডালপালা বের হয়ে পথটার পেট চেপে ধরেছে যেন। তাই সরু পথ আরো সরু হয়ে গেছে।

সেই সরুপথজুড়ে দাঁড়িয়ে আছে ইয়া মোটা এক লোক। বিশাল তার ভুঁড়ি। মাথায় টাক। গোল চোখ। থ্যাবড়ানো নাক। ডাকাত না তো?

ফজলু-বজলু সাহসী মানুষ। তার ওপর মাথায় আছে চালাকি বুদ্ধি। ওরা ঘাবড়ালো না। এগিয়ে গেল ভুঁড়িওয়ালার দিকে। কাছে গিয়ে ফজলু বলল : আপনি কে ভাই?

: আঁমাকে ভাঁই ডাঁকবে নাঁ।

কেমন নাকি আর চিকন কণ্ঠ। এমন মোটাসোটা মানুষের এত চিকন কণ্ঠ হয়? বজলু বলল, ভাই ডাকলে সমস্যা কী? মানুষ তো সবাই ভাই ভাই।

: আঁমি তোঁ মাঁনুষ নাঁ। তাঁই তোঁমাদের ভাঁই নাঁ।

: মানুষ না! তাহলে আপনি কী?

: আঁমি ভূঁত। বোঁকা ভূঁত। ভূঁত আঁর মাঁনুষের শঁত্রু শঁত্রু সঁম্পর্ক।

: ভূত তা বুঝলাম। কিন্তু বোকা কেন?

: এঁ এঁলাকায় যঁত ভূত আঁছে আঁমি সঁবার চেঁয়ে বোঁকা। দঁক্ষতার সঁঙ্গে মাঁনুষকে ভঁয় দেঁখাতে পাঁরি নাঁ। তাঁই সঁবাই আঁমাকে বোঁকা ভূঁত বঁলে।

তার মানে ওরা ভূতের কবলে পড়েছে। কিন্তু ওরা ভয় পেল

না। কারণ ভূতটা নিজেই বলেছে যে, সে খুব বোকা। বোকা ভূতকে ধোঁকা দেয়া কঠিন হবে না।

ফজলু বলল : তা বোকা ভূত, তুমি কী চাও?

: আঁমি তোঁমাদের ভঁয় দেঁখাতে চাঁই।

: এরকম বলে-কয়ে কাউকে ভয় দেখানো যায় না। ভয় দেখাতে হয় আঁতকা। এখন যদি তুমি খুব ভয়ানক কোনো রূপ ধারণ করো, তাতেও আমরা ভয় পাব না। আমরা তো জেনেই গেলাম, তুমি বোকা ভূত।

বোকা ভূত টাক মাথা চুলকাতে লাগল। বলল : তাঁহলে উঁপায়?

ওরা চিন্তা করল, ভূতের শরীরে তো অনেক শক্তি থাকে। এই বোকা ভূতটাকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নেয়া যেতে পারে।

বজলু বলল, শোনো, আমাদের ভয় দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা বাদ দিয়ে বরং নিজের জন্য কিছু করো।

: নিঁজের জঁন্য…?

: হ্যাঁ, নিজের জন্য। মাছ খেতে তোমার কেমন লাগে?

: অঁনেক ভাঁলো লাঁগে। কাঁচা মাঁছ, ভাঁজা মাঁছ সঁবই ভূঁতের পি্রঁয় খাঁবার। কিঁন্তু মাঁছেরা

পাঁনির নিঁচে থাঁকে বঁলে ধঁরে খেঁতে পাঁরি নাঁ। ভূঁতদের তোঁ জাঁল নাঁই।

: আমরা তোমাকে মাছ খাওয়াব। সাধ মিটিয়ে মাছ খেতে পারবে।

: কীঁভাবে?

: শুধু তোমাকে একটু কাজ করতে হবে।

: কীঁ কাঁজ?

: তুমি জাল ফেলবে আর টেনে তুলবে। প্রতিবারের জন্য তোমাকে একটা করে মাছ দিব।

: প্রঁতিবারে এঁকটা কঁরে মাঁছ? বাঁহ! বেঁশ মঁজা তোঁ।

ভূতের শক্তি বলে কথা। জাল ছুড়ে দেয় প্রায় খালের মাঝখানে। জাল ডুবে গেলে ঝটপট টেনে তোলে। মাছ আর মাছ। ওরা ঝটপট মাছগুলো ছাড়িয়ে পাতিলে রাখে। ফজলু ঝোপের ভেতর থেকে মানকচুর বড় একটা পাতা ছিঁড়ে এনেছে। সেখানে রাখে ভূতের একটা মাছ। কখনো টেংড়া, কখনো পুঁটি। বোকা ভূত তাতেই মহাখুশি।

ফজলু-বজলু যে সময়ে একবার জাল টেনে তুলত, বোকা ভূতটা সে সময়ে তিনবার জাল টেনে তোলে। মাছও তিনগুণ মেলে।

অল্প কিছুক্ষণ পরই মাছে পাতিল ভরে গেল। ওরা নিজেদের জন্যও অনেকগুলো বড় বড় মানকচুর পাতা ছিঁড়ে আনল। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে এত মাছ হয়ে গেল যে, তা বয়ে নেয়াই কঠিন। বজলু বলল, থাক বাবা বোকা ভূত। যথেষ্ট হয়েছে।

ভূতের মাছগুলো ওরা ভূতকে বুঝিয়ে দিল। ভূত মহাখুশি। খেতে খেতে বনের ভেতর ঢুকে গেল।

নিজেদের মাছ নিয়ে ওরা যখন বাড়ি ফিরল তখন সবাই অবাক। এক রাতে এত মাছ তো কোনোদিন ধরতে পারেনি!

ভূতকে দিয়ে যে মাছ ধরিয়েছে, এ কথা ওরা কাউকে বলতে পারল না। বললে কী হবে? কেউ কি বিশ্বাস করবে?

ফজলু আর বজলু রাতে মাছ ধরতে গেলে এখনো সেই বোকা ভূতটাকে খোঁজে। কিন্তু তার আর দেখা মেলেনি।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj