শুদ্ধি অভিযান : জাতির জন্য শুভ উদ্যোগ

বুধবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গত ১৮ সেপ্টেম্বর বুধবার বিকেল ৫টা থেকে কলামটা লেখা শুরু করার আগ পর্যন্ত ৬ দিনে ১২৭ ঘণ্টা সময় যেন ক্রাইম থ্রিলারের বা রোমাঞ্চকর সিনেমা দেখার মতো রুদ্ধশ্বাসে কেটে যাচ্ছে। এমন থ্রিলার জীবনে দেখতে পাব তা কল্পনাও করিনি। পাকিস্তান আমল থেকে এই জীবনে দেশে সামরিক শাসন যতবার এসেছে, ততবারই অপরাধ জগৎ থেকে দেশকে ক্লিন করার ঘোষণা দিয়ে অ্যাকশন হয়েছে। কিন্তু তার লক্ষ্য ছিল রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্রাশ করে নতুন দল গঠন করা। আর রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলে দলের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা অবৈধ ও জনবিরোধী কাজের সঙ্গে জড়িত ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কখনো কমবেশি কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হলেও মনে দাগ কাটার মতো তেমন কিছু কখনো হয়নি। তাই মানুষের মনে এমন একটা মিথ সৃষ্টি হয়ে গেছে যে, সরকারি দল হলে সব মাফ। এবারেও কিন্তু সে রকমই একটা ভাবনা মানুষের মনে বাসা বেঁধে যাচ্ছিল।

কিন্তু ক্রাইম থ্রিলারের মতোই যেন মিথ ভাঙতে শুরু করেছে। অন্ধকার জগতের সরকারি দলের নামধারী কায়েমি স্বার্থবাদীদের কেন্দ্রে বজ্রাঘাত পড়েছে। অবৈধ ব্যবসা, কালো টাকা, সন্ত্রাস, মাদক প্রভৃতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বলতে কী বুঝায় তা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে। অন্ধকার সমাজের ব্যাপকতা ও গভীরতা কতটুকু হতে পারে তা মানুষ অনুভব করতে সক্ষম হচ্ছে। আর শত প্রশ্ন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ক্যাসিনো মেশিন কীভাবে দেশে প্রবেশ করল, বিদেশিরা কীভাবে এই অবৈধ কাজে যুক্ত হলো, অস্ত্র-মদ-ইয়াবা কীভাবে আসছে, পুলিশ ও এমপি-নেতাদের নাকের ডগায় কীভাবে ক্যাসিনো বা টর্চার সেল চলছে, এত এত কালো টাকা কীভাবে থাকছে বা জায়েজ হচ্ছে, দলে মাফিয়া চক্র কীভাবে স্থান করে নিল, মাফিয়া চক্রের শিকড় ক্ষমতার কতটা সুউচ্চে রয়েছে, মাফিয়ারা এত এত বিশেষত পুলিশ-আর্মিরও টেন্ডার পায় কীভাবে, কীভাবে মাফিয়াদের সঙ্গে গড়ে ওঠে সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সখ্য, এদেরও গডফাদার কেউ আছে কিনা, অপরাধীরা ধরা পড়ার পর মন্ত্রী-নেতাদের ফোন করে কেন প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জনগণের মাথা আসলেই গুলিয়ে যাচ্ছে। এই সিনেমাটিক থ্রিলারের ভেতর দিয়ে মানুষ কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারছে টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, টর্চারবাজ, দখলবাজ, জুয়াবাজ, মাদকবাজ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্চ পদাধিকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশের শিকড় রসুনের গোড়ার মতো এক জায়গায়।

আওয়ামী লীগ দল ও অঙ্গসংগঠনের ৫শ নেতার তালিকা হয়েছে, ৬৭ জন আওয়ামী লীগ নেতা রয়েছে নজরদারিতে, ক্যাসিনো বিস্তারের নেপথ্যে ৯ রাঘব বোয়াল, ১০৭ নেতার বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, ৬-৭ জন যুবলীগ নেতার গণভবনে প্রবেশের অনুমতি বাতিল, ছাত্রলীগ কমিটির ৭২ জন নেতা ফেঁসে যাচ্ছেন, গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশের কাছে কার কার নাম বলল প্রভৃতি পত্রিকা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবর নানাধর্মী গুজবের ডালপালা ছড়িয়ে দিচ্ছে। গল্প-আড্ডায় ক্ষমতাসীন দলের বাঘা বাঘা নেতা, সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রীর নাম এমনকি একজন বাম নেতা ও সাবেক মন্ত্রীর নাম মুখরোচকভাবে উচ্চারিত হচ্ছে এবং মানুষ কমবেশি সব বিশ্বাস করছে। নেতাদের বক্তৃতা ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ মানুষ গভীর মনোযোগ সহকারে নজরে রাখছে। কোনো কোনো সাংসদ ও নেতা ইতোমধ্যে অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের অনুপ্রবেশকারীরা এসব অবৈধ ও অন্ধকার কাজের সঙ্গে যুক্ত, বিএনপির আমলে এসব শুরু হয়েছে, বিএনপি নেতারা টাকা পায় প্রভৃতি কথা তোলা হচ্ছে। এসব কথা সর্বাংশে সত্য। সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সঠিকভাবেই বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ধোয়া তুলসী পাতা নয়’ কিংবা ‘এখন যারা অপকর্ম করছে তারা আমাদেরই লোক’। এককথায় বলা যায়, আওয়ামী লীগকে দায় নিতে হচ্ছে এবং এই অভিযানের সফলতা অর্থাৎ রাঘব বোয়ালদের যথাসম্ভব গ্রেপ্তার ও বিচার করা ছাড়া এই দায় থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। এ কাজে সফলতা যদি না আসে তবে দায়ের বোঝা আরো বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা অব্যাহত। বিদেশে তিনি প্রশংসিত এবং সফল প্রধানমন্ত্রীর এক উদাহরণ। এ কথা সবারই জানা, ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতাসীন দলে গণশত্রু আগাছারা জন্ম নেয়, বেড়ে ওঠে, নতুন আগাছারা এসে ঠাঁই নেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দলের অভ্যন্তরে এমন ধরনের আগাছার জট কি আদৌ অভিপ্রেত ছিল! বঙ্গবন্ধুর আমলে দলের অভ্যন্তরে গজিয়ে ওঠা ‘চাটার দল’-এর অবস্থান ও বাড়াবাড়িকেও বর্তমানের ক্যাসিনো স¤্রাটরা অতিক্রম করেছে। সপরিবারে জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার নির্মমভাবে জীবন দেয়ার ঘটনা থেকে যে শিক্ষা নিতে আওয়ামী লীগ নামধারী একটি অংশ পারেনি এবং পারবে না, বর্তমান ক্যাসিনো ঘটনা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।

ইতোমধ্যে দেশবাসী বুঝে নিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী অঙ্গীকার জিরো টলারেন্স কথার কথা ছিল না। মানুষ মনে করছে, শেখ হাসিনা যা একবার ধরেন তার শেষ দেখে ছাড়েন। জঙ্গি নির্মূলে জিরো টলারেন্সের সুফল মানুষ ভোগ করছে। এখন মানুষ অপেক্ষায় থাকছে কখন উন্নতি-সমৃদ্ধির অন্তরায় অন্ধকার জগতের অশুভ অর্থনীতি ও রাজনীতি শুভর কাছে পদানত হবে। মানুষ যখন এসব ভাবছে তখন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এসব নাকি লোক দেখানো। লোক দেখানোর মতো কাজ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়া কিংবা খালেদা ক্ষমতায় থাকতে করতে পারল না কেন- এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্লিখিত প্রশ্ন তোলা লোক হাসানোর নামান্তর। তখনো ক্যাসিনো ছিল! হাওয়া ভবনের সঙ্গে খোয়াব ভবনও ছিল। গডফাদারদের নাম ও কর্মকাণ্ডের বিবরণ কমবেশি সব পত্রিকায় উঠেছিল। তাদের গায়ে তো টোকাটি লাগেনি। তাই জামায়াতের সহযোগী বিএনপির মুখে দেশ ও জনগণের স্বার্থে শুভ একটি কাজের সমালোচনা শোভা পায় না। জাতীয় পার্টি ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের জিরো টলারেন্স নীতি সমর্থন করেছে। প্রধানমন্ত্রীর শুভ এই উদ্যোগের পাশে দেশ ও দশের স্বার্থে সবারই তো দাঁড়ানো কর্তব্য। অবস্থা পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে এই অভিযান ব্যর্থ হোক এমন আশা নিয়ে চাতক পাখির মতো কোনো কোনো মহল ফায়দা তোলার জন্য বসে আছে।

লেখাটা লেখার আগে দুজন খেটে খাওয়া মানুষের সঙ্গে সময় নিয়ে কথা হলো। তাদের মুখে এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের সাইনবোর্ড নিয়ে গড়ে ওঠা গণশত্রুদের কথা গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনলাম। একজন গভীর পরিতাপ ও ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, তার বাড়ির সামনে জুয়ার আড্ডার কথা। নির্বাচিত চেয়ারম্যান, মেম্বার, টেন্ডার ও দখল-দাপটের নেতা-ক্যাডার থেকে শুরু করে গ্রামের বাইরে থেকে টাকাওয়ালারা মোটরসাইকেলে আসে এক ডেরায় জুয়া খেলতে। ডেরায় যাওয়ার রাস্তাটা কাঁচা। তাই যাওয়ার সময় তাদের উঠানে মোটরসাইকেল রেখে যায় ওইসব ক্ষমতাবান। এত অসুবিধা সত্ত্বেও তারা মুখ খুলতে পারে না এবং এমনকি ৯৯৯-এ টেলিফোন করতেও ভয় পায়। কেননা এলাকায়ই প্রকাশ্যে চেয়ারম্যান বা তার লোকেরা খুন করেছে অন্তত দুজনকে। গ্রেপ্তার হয়ে নাকি ১৫ দিনে বের হয়ে এসেছে। প্রশ্ন করলাম পুলিশ করে কী? উত্তর এলো, কী করবে ওরা! জুয়াড়িদেরই তো স্যার স্যার করে পুলিশ। ঢাকায় এমপি-নেতাদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ। এসবের নিউজও নাকি পত্রিকায় আসবে না। ধারণা করি এমন ধরনের খবর কমবেশি সবাই জানে।

গল্পের মতো সব শুনে মনে হলো, ঢাকার চেয়েও তৃণমূলে টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজ, দখলবাজ, জুয়াবাজ, টাউটবাজরা ক্রমে ভয়ংকর রূপে মানুষের জীবনে সমুপস্থিত। ক্যান্সরের মতো ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত এসব গণশত্রুর চেইন ছড়িয়ে পড়েছে। একদিনে যে তা হয়নি তা সহজেই অনুমান করা চলে।

সার্বিক বিচারে বলা চলে বড়ই কঠিন ও জটিল জায়গায় হাত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গায়ে আঘাত দিলে সাপ ঘুরে ফণা তুলে ছোবল দেয়। জাতির পিতাকে হত্যা করেছিল কারা! দলে মোস্তাক গংয়ের মতো মীরজাফররা না থাকলে কি পনেরোই আগস্ট হতো! আগে কেন প্রধানমন্ত্রী অন্ধকার অবৈধ জগতের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি প্রয়োগ করতে গেলেন না- এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলে কেবল এই কঠিন ও কঠোর সত্য কথাটাই মনে পড়ে। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে দূরদর্শিতা, সাহস, ধৈর্য নিয়ে যথাসময়ে তা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারদর্শিতা ও দক্ষতা দেখিয়েছেন। ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্ষমতার রাজনীতিকে যথাসম্ভব জনতার দরবারে সাংবিধানিক ধারায় নিয়ে এসেছেন।

ধারণা করি যথাসময়ে ডাক্তার যেমন ফোঁড়া কাটেন, তেমনি সময় ও সুযোগ অনুধাবন করেই প্রধানমন্ত্রী এই অভিযানে হাত দিয়েছেন। শত রিস্ক সত্ত্বেও এই অভিযানকে অগ্রসর করার পথ আছে কিন্তু যথাসম্ভব কিছু একটা না করে ফেরার পথ নেই। তাতে ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। এই কথাগুলো যখন লিখছি, তখন বিগত নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে বসে যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রেরিত খসড়ায় তার নিজ হাতে লেখা অজস্র সংশোধন ও সংযোজন দেখছি, তখনকার স্মৃতি মনের কোণে ভেসে উঠল। শেষ পাতায় এসে বিস্মিত হয়ে থমকে গেলাম। ‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,/এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ কবি সুকান্তের এই কবিতাংশটি ইশতেহারের শেষে সংযোজন করার নির্দেশ রয়েছে। প্রচণ্ড আবেগে চোখ সজল হয়েছিল। প্রকৃত বিচারেই দেশ ও মানুষের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত বলেই ক্ষমতায় থেকে সাপের গায়ে আঘাত হানতে বঙ্গবন্ধুকন্যা পিছপা হননি। দেশবাসী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আছে এবং থাকবে।

শেখর দত্ত : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj