বিপজ্জনক হয়ে উঠছে অপরাধীরা

বুধবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সর্বত্র অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কোথাও কোনো স্বস্তি নেই। নেই স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। চলছে অবৈধ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াই। কে হবে চ্যাম্পিয়ন নদীখেকো, বনখেকো, পাহাড়খেকো, শেয়ারখেকো, বালুখেকো, ট্যাক্স ফাঁকি, ঋণখেলাপি, দেউলিয়াপনা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, লুটপাট, দখলদারি প্রভৃতি কাজে। কান পেতে শুনি, চোখ দিয়ে দেখি নদীখেকো, বনখেকো, পাহাড়খেকো, বালুখেকো, দখলদারের কাহিনী কিন্তু কিছুই বলতে পারছি না। যারা বলার তারাও কিছু বলছেন না কোন এক অদৃশ্য ইঙ্গিতে। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? এভাবে চলতে থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এরা পুরো দেশটাকে খেয়ে দখল করে নেবে। এদের শক্তির উৎস কী এবং কারা? এদের কারণে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে বেকারত্ব ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অসহনীয় অবস্থা ছাড়িয়েছে নারী ও শিশু ধর্ষণ, নির্যাতন, গুম, খুন, সিন্ডিকেট, খাদ্যে ভেজাল, নকল, ভেজাল এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের রমরমা ব্যবসা আর ক্যাসিনো নামের জুয়া খেলা।

তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা এবং মাদকের ভয়াল থাবা আমাদের আশঙ্কাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং কালচার। এরা রাতারাতি অঢেল সম্পদের পাহাড় গড়ার নেশার ঘোরে মত্ত। কে বাঁচল আর আর কে সরল তাতে তাদের কিছু যায় আসে না। এই যে সামাজিক ও রাজনৈতিক অধঃপতন ও অবক্ষয় শুরু হয়েছে, এর দায় নেবে কে? ক্ষতি যা তা এ দেশের মেহনতি শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের হচ্ছে। আর অপরাধীরা পেয়ে যাচ্ছে। এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করতে না পারলে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা দুর্নীতি, চাঁদাবাজ, লুটপাট রোধ করা অসম্ভব। তা যত কঠিন আইনই করা হোক। মাঝে মাঝে প্রধানমন্ত্রীর সাহসী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কারণে এদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা আমাদের চোখে পড়ে, যা আমাদের আশান্বিত করে।

অপসংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে তরুণ ও যুবসমাজকে অসুস্থ বানিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে অবিরত। যেই তরুণ ও যুবকদের দেখলে মনে সাহস সঞ্চার হতো কিন্তু আজ সেই তরুণ ও যুবকদের দেখলে মনে মনে ভীত হই। তরুণ ও যুবকদের স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আজ তারা পথহারা, দিশাহারা। এই খেকোরা আজকে নেমেছে মানব পাচারে। মুনাফা নিচ্ছে তারা আর প্রাণ যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। আমরা আর এই পরিণতি দেখতে চাই না। আমাদের পরিবার, সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এদের ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠাকে রোধ করতেই হবে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে সামাজিকভাবে এবং এদের মূলোৎপাটন করতে হবে। শিক্ষার ব্যাপক প্রসার এবং গুণগত মান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলে এই খেকোদের দমন করা সহজ হবে। এখনো সময় হাতে আছে। আর সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে এখনি ওদের টুঁটি চেপে ধরতে না পারলে ওরাই একদিন রাষ্ট্রের টুঁটি চেপে ধরবে।

প্রতিদিন নতুন নতুন অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্ম নিচ্ছে। অনিয়ম এবং দুর্নীতি ভোল পাল্টিয়ে রাষ্ট্রকে ব্যস্ত সময় পার করাচ্ছে। প্রশাসনকে আরো বেশি দক্ষতা এবং দায়িত্বের সঙ্গে এদের প্রতিহত করতে হবে। আইনে যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনোভাবেই আইনের গতি রোধ করা যাবে না। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা দরকার। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আরো বেশি কার্যকর করে তুলতে হবে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশপ্রেম এবং সামাজিক দায়িত্বকে জাগিয়ে তুলতে পারলে এই খেকোদের রোধ করা এবং নির্মূল করা সহজ হবে। রাষ্ট্রের ও সরকারের সব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সদিচ্ছার মধ্য দিয়ে এই খেকোদের নির্মূল করা সম্ভব হবে বলে সাধারণ নাগরিকের মতো আমিও বিশ্বাস করি। আমাদের যা কিছু আছে তা-ই যথেষ্ট, যদি আমরা এর শতভাগ সদ্ব্যবহার করতে পারি।

সুধীর বরণ মাঝি

শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, চাঁদপুর।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj