পলিথিন বর্জন করুন নিজের স্বার্থে

মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পলিথিন ও প্লাস্টিকজাত দ্রব্যসামগ্রীর ব্যবহার না কমে বরং তা দিন দিন বেড়ে চলছে। পলিব্যাগ বা পলিথিনজাতীয় যে কোনো পণ্যের মূল উপাদান অপচনশীল পলিপ্রোপাইলিন, যা মারাত্মক পরিবেশ দূষক। পলিব্যাগ ও প্লাস্টিকজাতীয় দ্রব্য ব্যবহার শেষে নালা-নর্দমা, নদী-খালে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। স্যুয়ারেজ লাইনে আটকে গিয়ে তরল বর্জ্য প্রবাহে বাধা দেয়। খাল-নদীতে পলিব্যাগের স্তর জমে পানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটায় এবং মারাত্মক পানি দূষণের সৃষ্টি করে। কিছুকাল আগে বুড়িগঙ্গার তলদেশে টনের পর টন পলিথিন উত্তোলন করেও নদীকে সম্পূর্ণ বর্জ্যমুক্ত করা যায়নি। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অনিয়ন্ত্রিত পলিথিন ও প্লাস্টিকের বর্জ্য প্রতিনিয়ত স্যুয়ারেজের মধ্যে জলাভূমিতে গিয়ে পড়লে মাছ সেসব খাচ্ছে, আর মাছের মাধ্যমে তা মানুষের খাদ্যশৃঙ্খল বা ফুড-চেইনে ঢুকে পড়ছে। ভয়াবহ পরিবেশদূষক হিসেবে প্লাস্টিক বর্জ্যরে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে পরিবেশ ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে, জীববৈচিত্র্যকে করে তুলছে বিপন্ন। মানুষ শিকার হচ্ছে ক্যান্সারসহ নানা রকম মরণব্যাধিতে।

বাংলাদেশে ১৯৮২ সালে পলিথিন ব্যাগ দৈনিক মাত্র ০.২৫ টন উৎপাদন মাত্রা থেকে শুরু করে কয়েক বছরের মধ্যে এর পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। ১৯৯০ সালে যেখানে দিনে ৬ হাজার ৫০০ টন প্লাস্টিক ব্যবহৃত হতো, সেখানে ২০১৪ সালে তা দাঁড়ায় ২৭ হাজার টনে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০২৫ সালে বাংলাদেশে পলিব্যাগের ব্যবহার দাঁড়াতে পারে প্রতিদিন ৫০ হাজার টনের বেশি। একটি সূত্র বলছে, ঢাকায় একটি পরিবার প্রতিদিন ৪টি করে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করছে। সেই হিসাবে শুধু রাজধানীতেই প্রতিদিন দেড় থেকে ২ কোটির বেশি পলিথিন বর্জ্য হিসাবে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। খাবারের মোড়ক হিসেবে প্লাস্টিকের এখন একচ্ছত্র আধিপত্য। খাবার পানি, কোমল পানীয়, জুস, তেল, চাল, আটা, ময়দা সবই এখন প্লাস্টিকের মোড়কে বন্দি। প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা খাবার ব্যবহারে ক্যান্সার, কিডনি রোগসহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধির বিস্তার ও প্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়ার শিশুর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত এমনকি বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হতে পারে।

বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ বাস্তবে প্রভাব ফেলেনি। প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যাগের বিকল্প হিসেবে সস্তা দামে চটের ব্যাগ সরবরাহের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। এমনকি পলিথিন বন্ধে নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে বাজার থেকে কিছু পলিব্যাগ জব্দ করা হলেও কিছু দিন যেতে না যেতে সবই পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে। ফলে প্লাস্টিক পণ্য ও পলিথিনের অবাধ ব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি চরম পর্যায়ে এসে পৌঁছে যায়। তাই এই মুহূর্তে পলিব্যাগ কারখানা বন্ধ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কেননা উৎপাদন বন্ধ না করে শুধু পলিব্যাগ জব্দ করে এর ব্যবহার কখনোই বন্ধ করা যাবে না। প্লাস্টিক বর্জ্যরে রিসাইক্লিং বা পুনরাবর্তনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেও পরিমাণ সীমিত রাখা সম্ভব।

ইদানীং পাটজাত অনেক শৌখিন পণ্য উৎপাদন করে বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। তাই পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগ ব্যবহার করার সময় এসেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মোবারক আহমেদ খান পাটজাত এক ধরনের পলিমার আবিষ্কার করেছেন- যা পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব। এই পলিমার দিয়ে ব্যাগ ও পণ্যের মোড়ক তৈরি করলে এবং তা পলিথিনের বদলে ব্যবহার নিশ্চিত করলে পরিবেশ দূষণ রোধ করা যাবে। দেশে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। পরিবেশের জন্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের নেতিবাচক প্রভাব সম্বন্ধে দেশের আপামর জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

প্রকৌশলী, ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj