এ যন্ত্রণার শেষ কোথায়? : সেবিকা দেবনাথ

সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মানিকগঞ্জের জ্যোৎ¯œা বেগম (ছদ্মনাম)। ৩২ বছর বয়সী জ্যোৎ¯œা স্বামী পরিত্যক্তা। স্বামীর সংসার ছেড়ে জ্যোৎ¯œার ঠাঁই হয় তার খালার বাড়িতে। গৃহকর্মী খালার অবস্থাও নুন আনতে পান্তা ফুরায়। জ্যোৎ¯œার এই অভাবের সংসারে তার একমাত্র ছেলে আসতে রাজি হয়নি। ছেলেকে কাছে পাবার এবং অভাবের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে আদম ব্যবসায়ী সাইদের মাধ্যমে সৌদি আরবের রিয়াদে পাড়ি জমায় জ্যোৎস্না। কিন্তু বিধিবাম। ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে গিয়ে তার জীবন চলতে থাকে উল্টো পথে। সেখানে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হতে হয় তাকে। গত বছর মে মাসে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফেরত আসে।

২০১৭ সালে গৃহকর্মী হিসেবে সৌদির রিয়াদে যান ময়মনসিংহের কুসুম বেগম (ছদ্মনাম)। গত বছর আগস্ট মাসে দেশে ফেরত আসেন কুসুম। দেশে এসে কুসুম বলেন, সৌদি আছিলাম ১৫ মাস। এর মইধ্যে সেফ হোমে আছিলাম ছয় মাস। এই ছয় মাসে যা দেখছি কী আর বলব। শুধু একটা কথা কই বুইঝা নিয়েন। সেফ হোমে মানুষ যায় নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু ওইখানেও নরক যন্ত্রণা। যেসব মাইয়া দেখতে সুন্দর তাগরে জোর কইরা, লোভ দেখাইয়া সম্পর্ক করতে বাধ্য করে।

২০১৬ সালের ১৭ মার্চ সৌদি আরব যান রুনা। সেখানে এক বাসায় কাজ করে ৮ মাস বেতন না পেয়ে সৌদির বাংলাদেশি দূতাবাসে শরণাপন্ন হন। কিন্তু সেখানেও রুনা নির্যাতনের শিকার হন বলে জানান। কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে গিয়ে জ্যোৎ¯œা, কুসুম কিংবা রুনার মতো অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিনিয়তই দেশে ফেরত আসছেন। কিন্তু বিদেশের নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে দেশের মাটিতে ফিরে আসলেও তাদের যন্ত্রণা কমেনি। পরিবার এবং স্বজনদের অবজ্ঞা তাদের প্রতিনিয়ত সেই যন্ত্রণাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। নির্যাতিতদের অনেকেই এখনো ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। ওদের সবারই একটা প্রশ্ন এ যন্ত্রণার শেষ কোথায়? কবে ওদের মুক্তি মিলবে?

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ ফেয়ার বোর্ডের তথ্য মতে, বিদেশে নিয়োগকর্তাদের দ্বারা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতি মাসে গড়ে শতাধিক প্রবাসী নারীকর্মী দেশে ফিরছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সবচেয়ে বেশি নারীকর্মী ফিরে আসছে সৌদি আরব থেকে। ২০১৫ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিতে বাংলাদেশের নারীকর্মীদের অন্যতম বড় শ্রমবাজারে পরিণত হয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক এসোসিয়েশনের (বমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীর নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়। নির্যাতিত নারীদের বাঁচার আর্তি কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছায় না বলেই এখনো সেইসব দেশে আমাদের দেশের মেয়েরা যাচ্ছে। নির্যাতিত হচ্ছে। সরকারকে এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, অভাবের তাড়নায় দেশ-পরিবার ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো নারীরা রেমিট্যান্স মেশিন বা পরিসংখ্যান শুধু নয়।

অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা এসব নির্যাতিত নারীদের পাশে সরকারকে দাঁড়ানোর দাবি করে আসছিলেন অনেক আগে থেকেই। জানা যায়, ফেরত আসা এসব শ্রমিকের পুনর্বাসনে এখনো পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোনো কাঠামো বা উদ্যোগ দেখা যায়নি। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) নিজস্ব উদ্যোগে ফিরে আসা শ্রমিকদের, বিশেষ করে নারী শ্রমিক, যারা শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত থাকে, তাদের প্রাথমিক আশ্রয় থেকে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে। যেসব নারী একেবারেই আর বাড়ি ফিরতে পারেন না, তাদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে দুটি গার্মেন্টস পরিচালনা করছে সংস্থাটি। পুনর্বাসন, মানসিক কাউন্সেলিংয়ের মতো সহায়তাগুলো ব্র্যাকও দিচ্ছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের পরিচালক জহিরুল ইসলাম জানান, দেশে ফেরত আসা প্রবাসী নারী কর্মীদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক সহায়তা দেয়ার জন্য অবিলম্বে ঢাকার বিমানবন্দরের কাছে একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করার কথা ভাবা হচ্ছে। প্রবাসী নারী কর্মীদের জন্য কল্যাণমূলক সেবা বাড়াতে ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র কারার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সুমাইয়া ইসলাম বলেন, এটা সময়োপযোগী উদ্যোগ। সরকারের উচিত অবিলম্বে এই আশ্রয়কেন্দ্র খোলা।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj