প্রিয় : অন্যপক্ষ প্রতিবেদক

সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

গ্রামের উচ্ছল, প্রাণবন্ত ও সাহসী এক মেয়ে মীনা। নয় বছরের ছোট্ট মীনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় ১৯৯৩ সালে। বয়স কম হলেও মীনা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানিসহ নারী ও শিশুদের অধিকার সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে সচেতন। গ্রামের মানুষের বিপদ-আপদ এমনকি প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও মীনা সবার পাশে দাঁড়ান। শুধু কি তাই? কে হাত না ধুয়ে খাবার খাচ্ছে, কে টয়লেট থেকে এসে হাত ধোয় না, কোন শিশুটা ঠাণ্ডায় আক্রান্ত হচ্ছে, কোন মেয়েটার অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, কোন দুষ্ট ছেলেরা রাস্তায় কিংবা চলতি পথে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে, বন্যার সময় শিশুদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যাবে, মেয়ে ও ছেলের সমান অধিকার, কোন দোকানদার গ্রামের অশিক্ষিত মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাদের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে বেশি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, গ্রামের মানুষের হাঁস-মুরগি চুরি করে যে চোর তাকে ধরিয়ে দেয়াসহ নানা বিষয়ে ছিল মীনার নজর। শুধু নিজে নয়, অন্য মেয়েশিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেও সোচ্চার হয়ে কাজ করেন মীনা।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল তথা দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েশিশুদের প্রতিনিধিত্ব করেন এই ‘মীনা’। তবে বাস্তবে নয় একটি জনপ্রিয় কার্টুনের মেয়ে চরিত্র এই মীনা। সমাজের কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, বিভেদ ও বৈষম্য দূর করে সমৃদ্ধ জাতি গঠনের বার্তাগুলো মীনার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়।

শুরুটা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। মেয়েদের অধিকার সুংসহত করার লক্ষ্যে দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত তৎকালীন সাতটি দেশ- বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও মালদ্বীপ যৌথভাবে ১৯৯০ থেকে ২০০০ পর্যন্ত ‘কন্যাশিশু দশক’ হিসেবে ঘোষণা দেয়। ওই সময়ের মধ্যে সার্বিক সূচকে মেয়েদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য সার্কভুক্ত দেশগুলো দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। এ বিষয়ে জনগণকে কীভাবে সচেতন করা যায় সে সেই লক্ষ্যেই চলে কাজ। তখনই যোগাযোগ করা হয় জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বাংলাদেশের সঙ্গে। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বেছে নেয়া হয় কার্টুন বা কমিক্সের একটি মেয়ের চরিত্র। এর সঙ্গে থাকবে মেয়েটির বাবা, মা, ছোট ভাই এবং পোষা কোনো প্রাণী। এর সঙ্গে আরো কিছু চরিত্র থাকবে। যেহেতু নির্মিতব্য কার্টুনটি দক্ষিণ এশীয় সব দেশেই প্রচারিত হবে, তাই গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরার জন্য গ্রামীণ আবহ তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেই সঙ্গে অনেক ভেবে-চিন্তে কল্পিত সেই মেয়েটি নাম রাখা হয় ‘মীনা’। বিশাল এ কর্মযজ্ঞের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইউনিসেফের অনুষ্ঠান ও যোগাযোগ বিভাগের তৎকালীন প্রধান নিল ম্যাককি, র‌্যাচেল কার্নেগি, রাম মোহন, বাংলাদেশের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, শিশির ভট্টাচার্য, রফিকুন নবী। মীনা কার্টুন নির্মাণে তখন আর্থিক সহায়তা করে ডেনমার্ক।

জানা যায়, মীনা কার্টুন শুধু বাংলা ভাষায়ই তৈরি হয়নি। হিন্দি, উর্দুসহ ২৯টি ভাষায় তৈরি হয়েছে মীনা। আরবিতেও মীনা কার্টুন ডাবিং করা হয়েছিল। প্রথমে মীনার ১৩টি পর্ব বানানো হয়। যেগুলো প্রচার করা হয় সার্কভুক্ত সাতটি দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। এখন মীনার ৩৭টি পর্ব রয়েছে। এ ছাড়া মীনার কার্টুন ছবি নিয়ে ২৩টি কমিক বইও বের হয়েছে। ইউনিসেফ মীনার নামে একটি পুরস্কারের প্রবর্তন করে। ২০১৭ সালে ‘মীনা গেম’ও চালু হয়। যা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়া মীনার উল্লেখযোগ্য কার্টুনগুলো হলো : ‘মুরগিগুলো গুনে রাখ’, ‘বুদ্ধিমতী মীনা’, ‘মীনা এল শহরে’, ‘মীনা কি স্কুল ছেড়ে দেবে’, ‘জীবন বাঁচানো’, ‘মীনার তিনটি ইচ্ছে’, ‘যৌতুক বন্ধ করো’, ‘বিয়ের বয়স হয়নি’, ‘মীনা ও দুষ্টু ছেলেরা’, ‘মেয়েদের যতœ নাও’, ‘জাদুর পাথর’, ‘মীনার বন্ধু অনু’, ‘নতুন বন্ধু পিনুই’, ‘রূপকথার দেশে মীনা’, ‘পরীর গল্প’ ও ‘মীনার যুদ্ধ’ উল্লেখযোগ্য।

মীনার তুমুল জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করে সার্কভুক্ত দেশগুলো ১৯৯৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরকে মীনা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। সেই থেকে প্রতি বছর নানা আয়োজনে দিনটি উদযাপিত হয়ে আসছে। সংখ্যার হিসাবে নব্বইয়ের দশকের নয় বছরের ছোট্ট মীনার বয়স হয়তো বেড়েছে। কিন্তু আজো নানা বয়সী মানুষের মনে ‘মীনা’ বিরাজ করে সেই ছোট্টটি হয়েই।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj