অপুষ্টির কারণে খর্বাকৃতি শিশু!

সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

স্বাস্থ্যসম্মত প্রয়োজনীয় খাবারকে পুষ্টিকর খাবার বলা হয়। অপরদিকে স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের মধ্যে সুষম খাদ্য না পাওয়াকে বলা হয় পুষ্টির অভাব বা অপুষ্টি। প্রথমত আমরা বলতে পারি যে, মাতৃপুষ্টি নিশ্চিত করলে, শিশু অবস্থা থেকেই যদি ভিটামিন-এ, ডি, আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ পুষ্টিকর উপাদান নিশ্চিত করা হয়, তাহলে শিশুর খর্বাকৃতি সমস্যা থাকবে না। চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের মানুষ আর খর্বাকৃতি নয়। তাদের উচ্চতা বাড়ছে। [দৈনিক প্রথম আলো/৪ মে, ২০১৯]

দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ শিশু জন্মায়। এত বিশালসংখ্যক শিশুর পুষ্টিকর খাবার দরিদ্র পরিবারের সব শিশুর ভাগ্যে জোটে না। এ প্রসঙ্গে জানা যায় যে, গত দুই দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় উন্নতি সাধন হলেও, দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে কমে এলেও, প্রধান খাদ্য চালে স্বনির্ভরতা অর্জনে প্রায় সক্ষম হলেও, জন্ম ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেলেও, শিক্ষার হার বেড়ে গেলেও পুষ্টির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। দরিদ্র জনসংখ্যার বসবাসের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

দারিদ্র্য মানচিত্রে চট্টগ্রাম ও সিলেট সবচেয়ে সচ্ছল বিভাগ হিসাবে চিহ্নিত হলেও অপুষ্টির মানচিত্রে ওই দুই বিভাগে অপুষ্টিজনিত কারণে ৫ বছর বয়সের নিচে খর্বাকৃতি ও কম ওজনের শিশুর হার সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ৫ বছর বয়সের কম বয়সী খর্বাকৃতি শিশুর হার সিলেটে ৪৪.৬ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৪ সালে প্রকাশিত দারিদ্র্য মানচিত্রে সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত রংপুর বিভাগে অপুষ্টির কারণে ৫ বছর বয়সের নিচে কম ওজনের শিশুর হার ৩৫.৭ শতাংশ। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫ বছর বয়সের নিচে খর্বাকৃতি শিশুর সর্বোচ্চ হার চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান জেলায়। এ হার ৪৭.৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে একই বিভাগের কক্সবাজার জেলা। এখানে হার ৪৭.০০ শতাংশ। ৫ বছরের নিচে কম ওজনের শিশুর সর্বোচ্চ হার সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায়। এ হার ৪০.৯ শতাংশ। মানচিত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৯টি জেলায় খর্বাকৃতি শিশুর এবং ৫৫টি জেলায় কম ওজনের শিশুর হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি। [দৈনিক যুগান্তর/৯ মে, ২০১৯]

মাতৃত্বকালীন যদি প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পুষ্টি প্রাপ্তি না হয় তখন মায়ের অসুখ দেখা দেয়। এ অবস্থায় অপুষ্টির শিকার হয় গর্ভের সন্তান। কতগুলো কঠিন রোগের কারণে খর্বাকৃতি বা বামনাকৃতি হওয়া অসম্ভব নয়। এমনো বামন হয়, যাদের মাথা বা ধর প্রমাণসই হলেও হাত-পা দারুণ খর্বাকার হতে পারে। আমিষজনিত অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা শিশু জন্মের আগে থেকেই শুরু করা উচিত। এ লক্ষ্যে গর্ভবতী মায়ের উপযুক্ত যতœ নিতে হবে। মায়ের খাবারের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। কারণ গর্ভবতী মা উপযুক্ত পুষ্টি পেলে সন্তানের আমিষজনিত অপুষ্টিসহ অনেক রোগ হওয়ার আশঙ্কাই কমে যাবে। যথাসময়ে গর্ভবতী মা ও শিশুর টিকা নিতে হবে। কেননা বিভিন্ন ইনফেকশন বিশেষ করে অন্ত্রের প্রদাহ (গ্যাস্টোএন্টোরাইটিস) এই রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী হতে পারে। শিশু যতটুকু খাবারই পাক অন্ত্রের পীড়ার কারণে বিভিন্ন খাদ্য উপাদান মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। জন্মের পর শিশুকে পূর্ণ দুই বছর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। বুকের দুধই শিশুর প্রয়োজনীয় সব খাদ্য উপাদান আছে বলে ৫ মাস বয়স পর্যন্ত অন্য কোনো খাবারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু শিশুর ৬ মাস বয়স থেকে বুকের দুধের সঙ্গে অতিরিক্ত খাবার দিতে হবে। আমিষের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। এই আমিষ ও প্রাণিজ (যেমন- দুধ, ডিম, মাছ, মাংস ও উদ্ভিজ্জ, ফলমূল, শাক-সবজি) এই দুই উৎস থেকে হওয়া উচিত।

খর্বাকৃতি শিশুর জন্ম ও তার বৃদ্ধিহীনতার মূল কারণই হলো অপুষ্টি। আমরা চাই সমাজের ধনী ব্যক্তিরা ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অপুষ্টি দূর করার জন্য এগিয়ে আসবেন এবং অপুষ্টি দূরীকরণে প্রত্যেকটি পরিবারের প্রধানরা সচেতন হবেন।

বাবুল রবিদাস

সভাপতি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ

জয়পুরহাট জেলা শাখা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj