‘মেড ইন বাংলাদেশ’ : সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রবিন শামস

বাংলাদেশের দুই যুগের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমশক্তি ৯০ ভাগই নারী। অভাব-অনটনে জর্জরিত নারীদের সামাজিকভাবে মূল্যায়ন কম বলে তাদের শ্রমবাজারও সস্তা। গার্মেন্টস শিল্পের উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখা এই নারীদের জীবন চলে অতিশয় সংকটের মধ্যে। বঞ্চিত হয় আইনানুগ অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে। প্রতিবাদ করলে গালাগালিসহ দৈহিক নির্যাতন পর্যন্ত করে থাকে মালিকপক্ষ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হারাতে হয় চাকরিও।

বাংলাদেশে নারীদের ক্ষমতায়নে ও আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে পোশাকশিল্পের যে ভূমিকা তারই আলোকে দৃঢ়চেতা নারী পোশাক শ্রমিকদের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প মেড ইন বাংলাদেশ। ঢাকা শহরের নাগরিক জীবনের পটভূমিতে রচিত এই কাহিনীর মূল চরিত্রের নাম শিমু। ২৩ বছর বয়সী শিমুকে ঘিরেই আবর্তিত এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সমাজ জীবনের বাস্তবধর্মী এক চিত্র।

প্রথম ছবি মেহেরজান এবং দ্বিতীয় ছবি আন্ডার কনস্ট্রাকশনের পর মেড ইন বাংলাদেশ রুবাইয়াত হোসেনের তৃতীয় ছবি।

সদ্য শেষ হওয়া টরেন্টো চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, মেড ইন বাংলাদেশের আগে বাংলাদেশের তিনটি ছবি প্রদর্শিত হয়েছে এ উৎসবে। যার মধ্যে গোলাম রব্বানী বিপ্লবের স্বপ্নডানায় (২০০৭) ও বৃত্তের বাইরে (২০০৯) এবং জাহিদুর রহিম অঞ্জনের মেঘমল্লার (২০১৫)। কিন্তু ৪৪তম উৎসবটি একটু ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য। ছবিটির প্রিমিয়ার হওয়ার পর ছবিটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খনা টকিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায় বিদেশিদের পাশাপাশি ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ ছিল প্রবাসী বাংলাদেশিদের। প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেয়া সাংবাদিকদের একজন বলছিলেন, ছবিটি আমার ভালো লেগেছে।

কারণ এই সিনেমা পোশাক শ্রমিকদের মৌলিক মানবাধিকার পাওয়ার সংগ্রাম বড় পর্দায় তুলে ধরেছে।

ইন দ্য সিটস সাইটে প্রকাশিত এক রিভিউতে পাওলো কাগাওন লিখেছেন, এটাই যে রুবাইয়াত হোসেনের স্টাইল, তা ছবি দেখেই বোঝা গেছে। ছবিতে তিনি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন নারীবাদী বিচক্ষণতা। এই বিচক্ষণতা প্রকাশ করতে রুবাইয়াত গল্পের পাশাপাশি আস্থা রেখেছেন অভিনেত্রী শিমুর ওপরও। এই চরিত্রটিই রুবাইয়াতের চিৎকারের ভাষা। নারীর বঞ্চনার ঘটনা অনেকের মতো রুবাইয়াতকেও আহত করে, রুবাইয়াত প্রতিবাদ করতে চায় এবং তিনি করলেন সিনেমার মাধ্যমে, শিমু চরিত্রের সংলাপ, ভঙ্গি তথা এগিয়ে চলার মাধ্যমে।

সিনেমাস্কোপ অনলাইনে প্রকাশ হওয়া একটি বিশ্লেষণে ডানা রিনোস লিখেছেন, রুবাইয়াত তার দৃশ্যকল্পের মাধ্যমে সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন যে নারীরা কতটা সহিংসতার স্বীকার। কিন্তু সেই সংগ্রামে জয়ী হওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে। চাইলে তারা লড়াইও করতে পারে। বাংলাদেশের দর্শকদের জন্য এই সিনেমার ঘটনা বা গল্প অপরিচিত নয়। কিন্তু সিনেমার সংলাপ, মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ আবারো ভাবনায় ফেলে দিতে পারে দর্শকদের।

আর টরেন্টো উৎসবের সিনেমা বিবরণীতে ছবিটির উচ্ছ¡সিত প্রশংসা করেছেন উৎসব পরিচালক ক্যামেরন বেইলি। বাংলাদেশের একজন নারী নির্মাতার ছবি টরেন্টোর মতো বড় উৎসবের অফিশিয়াল সিলেকশনে থাকা বাংলাদেশের সিনেমার জন্য সুসংবাদই।

টরেন্টো দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও আগামী মাসে ছবিটির যুক্তরাজ্য প্রিমিয়ার হতে যাচ্ছে ৬৩তম বিএফআই (ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট) লন্ডন চলচ্চিত্র উৎসবের ডিবেট বিভাগে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য রুবাইয়াত হোসেন ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ছবিটি একটি বড় সাফল্য। যার গল্প শুরু হয় ২০১৬ সালে। লোকার্নো চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ওপেন ডোরস’-এ অংশ নিয়ে চিত্রনাট্যের জন্য জিতে নেয় আর্টে ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার। এ ছাড়া ছবিটি নির্মাণের জন্য পেয়েছেন ফ্রান্স সরকারের সিএনসি ফান্ড, নরওয়ে সরকারের সোরফন্ড প্লাস, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ইউরিমাজ ফান্ড, ডেনমার্কের ডেনিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট ফান্ড ও টোরিনো ফিল্ম ল্যাবের অডিয়েন্স ডিজাইন ফান্ড। অনুদান ছাড়াও ছবিটির পরিবেশক ও আন্তর্জাতিক বিক্রয় প্রতিনিধি ফ্রান্সের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশক পিরামিড ফিল্মস অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

ছবিটিতে অভিনয় করেছেন রিকিতা নন্দিনী, নভেরা হোসেন, দীপান্বিতা মার্টিন, পারভীন পারু, মায়াবি মায়া, মুস্তাফা মনোয়ার, শতাব্দী ওয়াদুদ, জয়রাজ, মোমেনা চৌধুরী, ওয়াহিদা মল্লিক জলি ও সামিনা লুৎফা প্রমুখ। দুটি অতিথি চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিতা চৌধুরী ও ভারতের শাহানা গোস্বামী। রুবাইয়াত হোসেন অবশ্য মনে করছেন বড় উৎসবের সঙ্গে তার ছবিটি বাংলাদেশের দর্শকদের দেখানো খুব জরুরি।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj