সমীপে ‘মায়াবতী’…

শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ঞড় সধশব ধ মৎবধঃ ভরষস ুড়ঁ হববফ ঃযৎবব ঃযরহমং- ঃযব ংপৎরঢ়ঃ, ঃযব ংপৎরঢ়ঃ ধহফ ঃযব ংপৎরঢ়ঃ. আলফ্রেড হিচককের এই বিখ্যাত উক্তি বড্ড বেশি ব্যবহার করতেন সত্যজিৎ রায়। একটি ছবি নির্মাণে অনেকগুলো অনুষঙ্গ থাকলেও হিচককের মতো সত্যজিৎ রায়ও সবচেয়ে বেশি জোর দেন ভালো চিত্রনাট্যের উপরে। সত্যজিৎ রায় আরো একটা কথা বলতেন, ‘আপনার প্রয়োজন একটা শুভ সমাপ্তি। এই শুভ সমাপ্তির আগে যদি বিষাদময় পরিস্থিতি তৈরি এবং চমক সৃষ্টি করতে পারেন তাহলে বিষয়টা আরো ভালো কাজ করে।’ শুরুতেই বলে রাখা যায় ‘মায়াবতী’ একটা অসম্ভব ভালো গল্পের, ভালো স্ক্রিন প্লের ছবি। মায়াবতীর মতো গল্প একজন গল্পকারের মাথায় প্রতিদিন আসে না। অসম্ভব সুন্দর মন ভোলানো কয়েকটা লিরিকের সুন্দর সুর আর কম্পোজিশন বিমোহিত রাখতে পেরেছে আধুনিক দর্শকদের। থ্রিল, সাসপেন্স, অ্যাকশন আর বাহারি গানে ভরপুর বিনোদনের পাশাপাশি পরিচালক সমসাময়িক বিষয়ের ওপর একটি কঠিন মেসেজ আমাদের কমিউনিটিকে দিতে পেরেছেন। এবার আসছি সে বিষয়ে। বাবা হারানো গ্রামের অভাবী মায়ের সন্তান শিশু মায়ার অকাল বিয়ে রুখতে মায়ার মা মায়াকে বিশ্বাস করে তুলে দেয় কাজী রাজুর হাতে। বিশ্বাসঘাতক কাজী রাজু শিশু মায়াকে বিক্রি করে দেয় দৌলতদিয়ার যৌনপল্লীতে। এই মায়া জন্ম নিয়েছিল ঈশ্বর প্রদত্ত সুরেলা কণ্ঠ নিয়ে। মায়ার এই সুরই তাকে দেহ বিক্রি থেকে বাঁচিয়ে দিলেও আটকে রাখে নিষিদ্ধ এলাকায়। একটা সময় মায়ার জীবনেও আসে প্রেম। প্রেম, আবেগ, রুদ্ধশ্বাস দ্ব›দ্ব নিয়ে এগিয়ে চলা গল্প এক সময় শেষ হয় মুগ্ধতা ছড়িয়ে। ‘মায়াবতী’ মূলত একটা মেয়ের জার্নি। গল্পে এই মায়াবতীই প্রতিনিধিত্ব করে গোটা দেশের নারী সমাজের। এবার আসি অভিনয়ের প্রসঙ্গে। এই প্রথম কোনো চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করা তিশা ছিলেন অসাধারণ। ইয়াশ রোহানের প্রথমদিকের ছবি স্বপ্নজাল যারা দেখেছেন তারা তার পরিবর্তনটা বুঝতে পারবেন। ফজলুর রহমান বাবুর অভিনয় নিয়ে কথা বলার আসলে কিছুই থাকে না। তিনি ছবিটির পুরোটা সময়ই ক্যারেক্টারের মধ্যেই ছিলেন। আব্দুল্লাহ রানা এই ছবিতে একটা বড় ক্যারেক্টার করেছেন। এই ছবিটিতে দিয়ে সম্ভবত তিনি তার ক্যারিয়ারে অন্য একটা মাত্রা যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এ ছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ, দিলারা জামান, মামুনুর রশীদ, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, আফরোজা বানু, অরুনা বিশ্বাস, তানভীর হোসেন প্রবাল, আগুন, নরেশ ভুঁইয়া, অবিদ রেহান যার যার অবস্থান থেকে ভালো করেছেন।

যত বড় আর ভালো বাজেটের ছবিই হোক না কেন সেখানে অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুলত্রুটি থাকবেই। আবহসঙ্গীত একটি সিনেমার বড় একটা অনুষঙ্গ। ছবিটির আবহসঙ্গীত একেবারে খারাপ হয়নি। তবে আরো ভালো করা যেত বলে আমি মনে করি। লোকেশন ও সেট ডিজাইন একটা বড় ফ্যাক্টর। এখানে পরিচালক চেষ্টা করছেন চিত্রনাট্য অনুযায়ী লোকেশন ব্যবহার করতে। তিনি সেটা করতে পেরেছেন এটা বলা যেতেই পারে। গল্পের একটা জায়গায় ছোট মায়াকে (যার আনুমানিক বয়স ছিল ৮ বছর) রেড লাইট এলাকায় নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে মায়ার বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর হলেও সময়টা পেছানোর ১০ বছর আগের। কিন্তু ছোট মায়ার পেছনে লাগানো সিনেমার পোস্টারগুলো ছিল সমসাময়িক। ১০ বছর বা তারও বেশি আগের পোস্টার লাগানো ছিল যুক্তিযুক্ত। বড় মায়া আর তার ওস্তাদ একটা গ্রামে আসে যাত্রাগানের অনুষ্ঠানে গান গাইবার জন্য। এখানে যাত্রাগানের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যাত্রাগানের সেটটা ছিল স্টেজ প্রোগ্রামের মতো। এখানে যাত্রাগানের সেট নির্মাণ করলে ভালো লাগত।

গল্পের শেষের দিকে মায়ার মার সঙ্গে শেষ দেখা অংশ নিয়ে দর্শকদের মনে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। এটা যে মায়ার ইলিউশন ছিল সেটা পরিষ্কার করা যায়নি।

আমি মনে করি শক্তিশালী এই গল্পের সবচেয়ে দুর্বল দিক ছিল বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশে। আমরা দর্শকরা বর্তমান সময়ে ‘বেলাশেষে’ কিংবা ‘পোস্ত’ মতো ছবির জমজমাট বিচারিক প্রক্রিয়া দেখে দেখে অভ্যস্ত। এই অংশে একটা জমজমাট লড়াই হতেই পারত। যুক্তিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হতে পারত আরো কিছু বিষয়- যা এই বিচারকার্যকে জমজমাট করতে পারত। যেমন অবিদ রেহানের আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার আনুমানিক সময়, ফজলুর রহমান বাবুর মৃত্যুর সময়কাল, ফরেনসিক রিপোর্ট, ফজলুর রহমান বাবুর মৃত্যুর আগে আবদুল্লাহ রানা জড়িয়ে ধরা কিংবা আবদুল্লাহ রানার ডিএনএ টেস্ট এসব নিয়ে আরো বেশি লজিক্যাল টুইস্ট তৈরি করার অবকাশ ছিল। সবশেষে একটা কোয়েশ্চেন মার্ক দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই। বাণিজ্যিক ছবি কাকে বলে? এর সংজ্ঞা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। দর্শনীর বিনিময়ে সিনেমা হলে প্রদর্শনের জন্য উপলব্ধকৃত সব ছবি কেন বাণিজ্যিক নয়? আমাদের চলচ্চিত্রের এই দুর্দিনে ‘মায়াবতী’র মতো সিনেমার দর্শক তৈরি করার সাহসী উদ্যোগের জন্য প্রশংসা পেতেই পারেন পরিচালক অরুন চৌধুরী ও প্রযোজক আনোয়ার আজাদ সাহেব। মায়াবতীর মতো ছবির জন্য যত বেশি দর্শক হলমুখী হবেন ততই বিবর্তন ঘটবে আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের।

লেখক : সৌর্যদীপ্ত সূর্য, নাট্যকার ও পরিচালক

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj