বাবা আমার বাবা

শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯

জয়নব জোনাকি

কেমন আছো বাবা? জানি খুব বেশি ভালো নেই।

কি করছো এখন তুমি! বাবা!

নিশ্চয়ই এখন গাছের সঙ্গে গল্পজুড়ে দিয়েছো আর কড়া জর্দা দিয়ে একটু পরপর পানের খিল খাচ্ছো- তাই না বাবা! জানি এখন আমাদের চাইতেও ওই গাছগুলোই তোমার পরম প্রিয় সন্তানতুল্য। কারণ গাছগুলোই এখন তোমাকে প্রজন্ম বেঁচে থাকার সবুজ শ্যামল স্বপ্ন দেখায়। ওরা তোমাকে নৈসর্গের তৃপ্তি দেয়। টেনে নিয়ে যায় তোমার স্মৃতিময় রঙিন সব শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনায়। অজানা এক ভালোলাগায় রোমাঞ্চিত, শিহরিত হও তুমি!

জানো বাবা! তোমাকে নিয়ে একটা ডায়েরি লিখেছিলাম আমি। কোনো এক অশুভ দুপুরে সেটি চুরি হয়ে গেছে। আর সেই লেখাগুলোও কোনো এক বিশ্বাসী অনুচর আমার অজান্তে পাচার করে দিয়েছে। সে ডায়েরিতে আমার অপ্রকাশিত সব কষ্ট আবেগ জড়ানো কয়েকটি চিঠি লেখা ছিল।

কত কত সুন্দর স্মৃতি আছে আমাদের। সেগুলো কতই না আনন্দের আর খানিকটা বিষাদেরও।

সেই ঝাপি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া টুকরো কিছু স্মৃতিকে কুড়িয়ে এনেছি।

একদিন দাদুভাইকে তুমি বলেছিলে, আমি না বললে দাদুভাইকে এয়ারফোন কিনে দিবে না। তুমি আশা করেছিলে দাদুভাই তোমার এমন কথায় খুশি হবে। নাতনির জন্য আরো ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে কিন্তু হলো ঠিক উল্টোটা, সে দিন দাদুভাই কষ্ট পেয়েছিল। বলল আর কখনোই তিনি এয়ারফোন চাইবে না তোমার কাছে।

সে কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে একটানা দাদুভাইর খেদমতে নিজেকে নিয়োগ করে অবশেষে মুক্তি পাই। আজ দাদুমনি ও দাদুভাই কেউই আর আমাদের মাঝে নেই। তাদের হাঁটাচলার সেই প্রিয় উঠোন, সেই পুকুরের ঘাট এখন অতীতের দখলে। নিঝুম সন্ধ্যায় তাদের কণ্ঠে নীরব কান্নার সুর বাজে। কলকাকলিতে মুখরিত সেই তিনতলা দালানটি এখন শ্যাওলাদের দখলে।

একদিন তুমি আমিও অতীত হবো, চলে যাব সেই হারিয়ে যাওয়াদের দলে।

মনে পড়ে বাবা! ওষুধ খাইনি বলে আলতো করে পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে মসজিদে গিয়ে খুব কান্নাকাটি করেছিলে! কেন এত ভালোবাসতে বলো তো!

দাদির মতো হয়েছি বলে? নাকি জীবনেও কন্যাসন্তান দেখনি বলে? দাদুমনি তাই বলতো।

খাবার একদম খেতেই চাইতাম না। তুমি না খাওয়ালে সে দিন মা পরাজিত হলেও আমার উপোস থাকাই জিতে যেত।

উপোস থাকার এ লুকোচুরি খেলা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আমি খাবার খেলেও তুমি বাসায় এলে আমাকে আবার খেতে হতো। আমাকে না খাইয়ে তুমি ঘুমাতেই না। আমি না খেলে তুমিও অভিমান করে না খেয়ে চলে যেতে অফিসে।

সে ভাত খাওয়ানোর সময়গুলো আর তোমার অনুপস্থিতির সময়গুলো ছিল আমার জন্য ভয়ঙ্কর কষ্টের। ব্যবসার কাজে কোথাও ট্যুরে গেলে তোমার গায়ের কাপড়গুলো তুমি আসা পর্যন্ত মাকে ধুতে দিতাম না। কিছুক্ষণ পরপর নাকে দিয়ে ঘামের নোনাজল মিশ্রিত তোমার গায়ের গন্ধটা শুঁকতাম।

তুমি বুঝতে আমি তোমাকে ভালোবাসি কিন্তু আমি কখনোই তোমাকে বুঝতে দিতাম না কতটা ভালোবাসি তোমাকে। হয়তো আজও না। স্বভাবতই প্রকাশহীন ভালোবাসার সঙ্গেই আমার আজন্মের বসবাস।

বাবা তোমার সবচেয়ে বোকা সহজ সরল মেয়েটি এখনো অপেক্ষায় থাকে- বাবা কাঁঠাল, তরমুজ আর লিচু নিয়ে আসবে।

ওহ বাবা তোমার মনে আছে! আমি তরমুজ খেতে চাইলে তুমি কি বলতে?

তরমুজ কিনতে গেলে তরমুজ বিক্রেতা তোমাকে মেরে পিঠে দাগ ফেলে দিত! ফর্সা পিঠে একটু নখ দিয়ে চুলকালেই লাল লাল দাগ হতো তোমার পিঠে। আর সেটাকেই তোমার বোকা মেয়েটি মারের দাগ বলে বিশ্বাস করত। বলত আর তরমুজ খেতে চাইব না। তুমি আর আমার জন্য কিছু কিনতে যাবে না। তোমার সেই বোকা মেয়েটি আজো সেরকম বোকাই রয়ে গেল।

বাবা, তোমার সাহস ও উৎসাহ আমার মনে সবসময় আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিত। ব্যবসার কাজে খুব একটা সময় পেতে না। কাজের অসম্ভব নেশা ছিল তোমার। অবসর বলে যে শব্দটা আমাদের বাংলা অভিধানে ছিল এবং মানুষের জীবনের অপরিহার্য একটা চাহিদা তার সঙ্গে তোমার সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল। এতটাই কাজে ডুবে থাকতে যে, তখন যদি রোবট আবিষ্কার হতো তাহলে ভাবতাম তুমিই হয়তো সেই যান্ত্রিক প্রথম রোবট মানব।

তবুও এত কাজের ভিড়ে, সামান্য অবসরে খাবার টেবিলে বসে যে গল্পগুলো শোনাতে সেগুলোই আজ আমার চলার পথের গাইড লাইন। তোমার প্রতিটি কথায় আমি খুঁজে পেতাম জীবনের কঠিন ম্যাপের সহজ নির্দেশনা।

তোমার প্রথম কথাই ছিল- টাইম এন্ড টাইড ওয়েট ফর নান। দ্বিতীয় কথা ছিল- ইন্ডাস্ট্রি ইজ দ্যা মাদার অব গুড লাক। পরিশ্রমের সঙ্গে সময়কে গুরুত্ব দিলেই জীবন উন্নত হবে।

অত্যন্ত এলিট ক্লাসের ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে তুমি। তাই মাঝে মাঝে তোমার ইংরেজি ভাষা বুঝতে না পেরে সঠিক রিপ্লে না দিতে পেরে বিব্রত হতাম।

পরিপাটি, গুছানো পরিবেশ পছন্দ করতে। তাই কলিংবেলের আওয়াজ শুনে ডোর হোল দিয়ে তোমাকে দেখা মাত্রই সবাই ঘর গুছিয়ে নিতাম।

জীবন একটা উঁচু পাহাড়ের নাম আর সেই পাহাড়ে ওঠার সমতল মসৃণ সিঁড়িটাই হলে তুমি!

বাস্তবতার মায়াজালে আটকে যাওয়া এক নির্ভতার হাতছানি তুমি। রোদ/বৃষ্টির পরোয়া না করে দিন শেষে যার কষ্টগুলো, অনুভূতিগুলো এক নিমিষেই মিলিয়ে যায় কিছু অবুঝ নিষ্পাপ হাসির মাঝে সে মানুষটিই হলে তুমি বাবা।

বাবা সন্তানের জীবনের এমন এক সূর্য, যা কখনো অস্ত যায় না। বাবা এমন এক শক্তি, যা শত আঘাতেও ভেঙে পড়ে না। বাবা এমন এক ছায়া যা চৈত্রের প্রখর তাপেও মিলিয়ে যায় না।

বাবা এমন একটি শব্দ ও শক্তির নাম, যা জীবনের তপ্ত মরুভূমিতে একটি ছায়া দানকারী গাছের মতো। যেখানে পথিক বিশ্রাম নেয়ার পর আবার নতুন উদ্যমে সামনে ছুটে চলে।

বাবা, তুমি এমন এক প্রহরীর নাম যে সুরক্ষিত প্রাচীরের মতো সবসময় সন্তানের নিরাপদ জীবন বেষ্টনী তৈরিতে নিয়োজিত থাকে। তবুও কেন জানি না তোমাদের জন্য এ সমাজে এখন তৈরি হচ্ছে স্বজনহারা নিষ্ঠুর অমানবিক বৃদ্ধাশ্রম? জন্মদানের দায় নিয়ে বিনিময় না চেয়েই চুপচাপ মাথা নুয়ে চলে যাও সেই একাকী নির্দয় বন্দি ঘরে।

সেখানে গিয়েও সন্তানের কল্যাণের জন্য হাত তুলে দোয়া কর। সেখানেও থাকে সন্তানের মাথার ওপর তোমাদের গোপন ছায়া।

প্রতিদান কখনো ফিরিয়ে দিতে পারব না বাবা! কিন্তু প্রতিটি প্রার্থনায় তোমার জন্য কিছু বর্ণহীন অশ্রæর ধারা ছুটে বের হয়ে যায়। বাবা নামের সুশীতল ছায়াটি যেন আমায় সবসময় ছায়াদান করে।

শুধু এটুকু দোয়া করো বাবা! তোমার যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে এ বসুন্ধরায় যেন তোমাকে স্মরণীয় করে যেতে পারি।

:: নিকেতন আ/এ, গুলশান, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj