বাংলা গানের কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল

শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ফরিদ আহমদ দুলাল

প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, কবি-গীতিকার-সমালোচক-প্রাবন্ধিক ও বাগ্মী আবু হেনা মোস্তফা কামালের জন্ম পাবনা জেলার উল্লাপাড়া উপজেলায় ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ মার্চ। পাবনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৫২-তে ম্যাট্রিক পাস করেন প্রথম বিভাগে ত্রয়োদশ স্থান নিয়ে; ১৯৫৪-তে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন প্রথম বিভাগে সপ্তম স্থান নিয়ে। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে আবু হেনা মোস্তফা কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে ¯œাতক এবং ১৯৫৯-তে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন; দুই পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। প্রথম জীবনে তিনি বেতার ও টেলিভিশনের তরুণ গায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ভাষা ও সাহিত্যের মেধাবী ছাত্র আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে; পরবর্তী সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ, রাজশাহী সরকারি কলেজ এবং গণসংযোগ পরিদপ্তরে কাজ করেন। ১৯৬৩-তে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন, ১৯৬৫-তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং বেশ কিছুদিন কর্মরত ছিলেন; পরবর্তী সময় তিনি ১৯৭৩-এ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ১৯৭৮-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন অধ্যাপক হিসেবে। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ বাংলা একাডেমির মহাপরিচলক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৯-এ বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বরত অবস্থায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর জীবনাবসান হয় মাত্র ৫৩ বছর বয়সে। ১৯৮৭-তে তিনি লাভ করেন একুশে পদক। জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয় তাঁর তিনটি মাত্র কাব্য; ‘আপন জীবন বৈরী’ (১৯৭৪), ‘যেহেতু জন্মান্ধ’ (১৯৮৪) এবং ‘আক্রান্ত গজল’ (১৯৮৮)। শেষোক্ত গ্রন্থটি গীতিকবিতার সংকলন, নামেই বোঝা যায়। মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহর সাথে যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশ করেন ‘পূর্ববাংলার কবিতা’ (১৯৫৪)। বিভিন্ন সময় তাঁর বেশকিছু বই প্রকাশিত হয়েছে, যার কোনোটি ভ্রমণকাহিনী, কোনোটি প্রবন্ধ-গবেষণা, কোনোটি গীতিকবিতা, আবার কোনোটি কবিতাগ্রন্থ। কবি-গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় তাঁর ‘কাব্যসমগ্র’। তাঁর গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কথা ও কবিতা (প্রবন্ধ-গবেষণা ১৯৮১), শিল্পীর রূপান্তর (প্রবন্ধ-গবেষণা ১৯৭৫), ইছামতির সোনালি-রুপালি, জর্জ কার্ভার (ক্রীতদাস পুত্র থেকে কৃষিবিজ্ঞানী), মানবসম্পদ উন্নয়ন : প্রেক্ষিত ইসলাম, মালয় দ্বীপের উপাখ্যান, নেপালের সবুজ উপত্যকায়, বিবশ বিহঙ্গ, পেঙ্গুইনের দেশে, সাহসী সাত বন্ধু, যেমন দেখেছি জাপান, এশিয়ার দেশে দেশে, নিশুতির নোনা জল, আকাশ নন্দিনী, আমি সাগরের নীল, ইকো-ট্যুরিজম ইত্যাদি।

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম মেধাবী কবি আবু হেনা মোস্তফা কামালের কবি খ্যাতিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল তাঁর গীতিকবির খ্যাতি। আমরা জানি, কবি নজরুল তাঁর বাইশ বছরের সাহিত্য জীবনের বারো বছরই নিবেদন করেছিলেন সঙ্গীতে। নজরুল তাঁর সঙ্গীতে এতটাই নিবিষ্ট ছিলেন যে, সাহিত্যের অন্যান্য শাখা থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিয়েছিলেন। ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ গ্রন্থের ভূমিকায় ১৯৩৩-এ তিনি বলেন, ‘কাব্যলোকের গুলিস্তান থেকে সঙ্গীতলোকের রাগিনী দ্বীপে আমার দ্বীপান্তর হয়ে গেছে। সঙ্গীত-লক্ষী, কাব্যলক্ষী দুই বোন বলেই বুঝি ওদের মধ্যে এত রেষারেষি। একজনকে পেয়ে গেলে আরেকজন বাপের বাড়ি চলে যান। দুজনকে খুশি করে রাখার মতো শক্তি রবীন্দ্রনাথের মতো লোকেরই আছে। আমার সে সম্বলও নেই, শক্তিও নেই।’ ১৯৩৬-এ ফরিদপুর জেলার মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে সভাপতির অভিভাষণে নজরুল বলেছিলেন- ‘আমি বর্তমানে সাহিত্যের সেবা থেকে, দেশের সেবা থেকে, কওমের খিদমদগারি থেকে অবসর গ্রহণ করে সঙ্গীতের প্রশাস্ত সাগর দ্বীপে স্বেচ্ছায় নির্বাসন দণ্ড গ্রহণ করেছি।’ ১৯৩৬ সালে নজরুল কবি জসীমউদ্দীনকে এক চিঠিতে লেখেন- ‘আমি সাহিত্যলোক হতে যাবজ্জীবন নির্বাসন দণ্ড গ্রহণ করেছি; কাজেই আমাদের সমাজের সমস্ত সুনাম, যশ, গৌরব নির্ভর করছে তোমার কৃতিত্বের ওপর।’ কবি নজরুলের এসব কথা কিন্তু তাঁর অভিমান-প্রসূত নয়; বরং সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আচ্ছন্নতা। প্রকৃত প্রস্তাবে গানের-সুরের এমন এক সম্মোহনী শক্তি আছে, যা সঙ্গীত¯্রষ্টাকে ঘোরগ্রস্ত করে রাখে। আবু হেনা মোস্তফা কামালকেও সঙ্গীত এবং সুর সেভাবে আচ্ছন্ন করেছিল কি-না জানি না; কিন্তু তিনি যে তাঁর কাব্য প্রতিভাকে কিছুটা হলেও অবহেলা করে সঙ্গীতে মনোনিবেশ করেছিলেন, তা বলা যায় সহজেই। বাংলা সঙ্গীত ভাণ্ডারে তিনি যোগ করেছিলেন অসাধারণ সব গান। বাংলাদেশের গীতিকবিদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় আবু হেনা মোস্তফা কামাল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কালজয়ী গান যোগ করে গেছেন। তাঁর সেসব গান আজো আমাদের আন্দোলিত করে। আবু হেনা মোস্তফা কামালের গান নিয়ে কিছু বলার আগে তাঁর কবিতা সম্পর্কে দুটি কথা বলে নিতে চাই।

একজন সচেতন কবি হিসেবে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বাঙালির যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর কবিতা নিয়ে সরব থেকেছেন, বাঙালির ভাষা আন্দোলনের পর তিনি রচনা করেন-

আজ আমি কোথাও যাবো না। আমি কিছুই করবো না, আজ

সূর্যের পিয়ন এসে দরোজায় যতো খুশি কড়া নেড়ে যাক, ¯œান ঘরে

অবিরল ঝরুক শাওয়ার, ভেসে যাক প্রভাত ফেরির গান

ক্যাম্পাসের সমস্ত আকাশে, সুগম্ভীর শহীদ মিনারে

ছাত্রদের প্রগাঢ় প্রগাঢ় অঞ্জলি থেকে পড়–ক অজ¯্র ফুল,

মেয়েদের সুললিত হাতে

লেখা হোক নতুন আলপনা, পৃথিবীর সমস্ত বেতার কেন্দ্র থেকে

উৎসারিত হোক রবিঠাকুরের গান, আমি তবু

কোথাও যাবো না আজ আমার নিজস্ব জন্মদিনে।

(আজ আমি \ আবু হেনা মোস্তফা কামাল)

কবির রোমান্টিকতা আর সমাজ সচেতনতার স্বাক্ষর পাই তাঁর নিচের দুই কবিতায়-

যখন তিনি থাকবেন না তখনো মেয়েরা অষ্টাদশী হবে

এই কথা ভেবে গালিব খুব কষ্ট পেয়েছিলেন,

এবং তিনি স্বর্গে যেতে অনিচ্ছুক ছিলেন এই অজুহাতে যে

সেখানে কোনো যুবতী হুরী নেই

সকলেরই বয়স হাজার বছর।

(গালিবের ইচ্ছা-অনিচ্ছা \ আবু হেনা মোস্তফা কামাল)

বাঘ মানেই অরণ্যের অজেয় অধিকার

তাজা টাটকা ডোরা

সমস্ত শরীরে উচ্চারিত শক্তি সাহস সৌন্দর্য

হয় বাঘ কিংবা বাঘ নয়

শৌখিন বাঘ বলে কিছু নেই

কখনো থাকে না

তেমনি কবি…..

(কবি \ আবু হেনা মোস্তফা কামাল)

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় তাঁকে রাজশাহী বেতারে পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলতে হয়েছিল; অসহায় অবস্থার প্রেক্ষাপটে অনিচ্ছাকৃত সে অপরাধের জন্য তাঁকে মূল্যও দিতে হয়েছিল; সে অপরাধেই ১৯৭২-এ কিছুদিন তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছিল; কিন্তু মননে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন মনে হয় না। বিশেষ করে যখন তাঁর ‘ছবি’ কবিতাটি পড়ি, তখন টের পাই বাংলাদেশের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা। আমরা নিচে তাঁর সে কবিতাটি পড়ে নিতে পারি-

আপনাদের সবার জন্যে এই উদার আমন্ত্রণ

ছবির মতো এই দেশে একবার বেড়িয়ে যান।

অবশ্য উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো মনোহারি স্পট আমাদের নেই,

কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না- আপনার স্ফীত সঞ্চয় থেকে

উপচে পড়া ডলার মার্ক স্টার্লিঙের বিনিময়ে যা পাবেন

ডাল্লাস অথবা মেম্ফিস অথবা কালিফোর্নিয়া তার তুলনায় শিশুতোষ।

(ছবি \ আবু হেনা মোস্তফা কামাল)

আমাদের কবিদের অনেকেই গীত রচনা করেছেন, সহজেই স্মরণ করতে পারি আজিজুর রহমান, ফররুখ আহমদ, শামসুর রাহমান, কেজি মোস্তফা, সৈয়দ শামসুল হক, ফজল শাহাবুদ্দিন, মুহম্মদ নূরুল হুদা, জাহিদুল হক, আবিদ আনোয়ার, নাসির আহমেদ, ইকবাল আজিজ প্রমুখের নাম; আবার যাঁরা কবি হিসেবে সে অর্থে পরিচিত নন, কিন্তু গীতিকার হিসেবে যথেষ্টই পরিচিত তারাও যে কবি নন তা-ও বলতে পারি না। খান আতাউর রহমান, গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মুকুল চৌধুরী, শহিদুল ইসলাম, আবদুল হাই আল হাদী, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান, মনিরুজ্জামান, নজরুল ইসলাম বাবু, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল; এমনি অনেক গীতিকারের গানই আমাদের মুগ্ধ করেছে। কারো কারো কোনো কোনো গান যুগ পেরিয়ে যুগান্তর হয়েছে। সহ¯্র গানের দু’চার দশটি হয়তো সমকালে জনপ্রিয় হয়েছে সর্বকালের হয়েছে কম গানই। আবু হেনা মোস্তফা কামাল সেই বিরল প্রতিভাধরদের অন্যতম যাঁর গান গীত হচ্ছে যুগের পর যুগ। তাঁর প্রেমের গান তো বটেই, বিষয়ভিত্তিক গানগুলোও হয়ে উঠেছিল শিল্পোত্তীর্ণ। আসুন আমরা তাঁর কয়েকটি গানের কথা স্মৃতিতে আনি।

প্রথমেই স্মরণ করছি রুনা লায়লার গাওয়া একটি প্রেমের গান-

অনেক বৃষ্টি ঝ’রে তুমি এলে

যেন একমুঠো রোদ্দুর

আমার দু’চোখ ভরে তুমি এলে \

(কথা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল \ সুর : আবদুল আহাদ)

আমরা যদি একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করি, দেখতে পাবো আবু হেনা মোস্তফা কামাল তাঁর প্রায় প্রতিটি গানেই সঞ্চারীর ব্যবহার করেছেন; যা বাংলাদেশের অধিকাংশ গীতিকবিই সাম্প্রতিক সময়ে করেন না। তাঁর আরো একটি কালজয়ী প্রেমের গান, যা ‘দর্পচূর্ণ’ চলচ্চিত্রে যুগল কণ্ঠে গেয়েছিলেন শিল্পী মাহমুদুন্নবী ও সাবিনা ইয়াসমীন-

তুমি যে আমার কবিতা আমার বাঁশির রাগিনী

আমার স্বপন আধো জাগরণ

চিরদিন তোমারে চিনি \

আমি কে তোমার যদি জানতে তবে কি আমায় কাছে টানতে

হয়তো সুদূরে যেতে গো সরে (২)

(কথা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল \ সুর : সুবল দাস)

আমাদের মিডিয়া, প্রচার মাধ্যমের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখতে পাই, যখন কোনো গান তারা প্রচার করেন, কিংবা গানের কথা লেখা হয়, সেখানে শিল্পীর নামটিই উচ্চারিত হয়; গীতিকার বা সুরকারের নামটি সহজে উচ্চারিত হয় না। একটা গান সৃষ্টিতে যেন গীতিকারের সামান্য অবদানও নেই। এমনকি ইউটিউব বা গুগলে যদি সার্চ দিয়ে গান খোঁজা যায়, সেখানেও গীতিকারের নাম সহজে উচ্চারিত হয় না; যারা গান আপলোড করেন তাদের যেন এ বিষয়ে ন্যূনতম সচেতনতা নেই! চলচ্চিত্রেও দেখা যায়, এক ছবিতে হয়তো ছয়টি গান আছে, যা রচনার দায়িত্ব পালন করেছেন দু’জন গীতিকার; আপনার আমার বোঝার সাধ্য নেই কোন গানটি কার রচনা। ধরা যাক একটি গান, ‘শূন্য হাতে আজ এসেছি নেই তো কিছু আর…..’ গানটি কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘উপহার’ চলচ্চিত্রের জন্য সৈয়দ আবদুল হাদী গেয়েছেন; ‘উপহার’ চলচ্চিত্রটি ইউটিউবে নেই, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভেও পাওয়া গেল না; গুগল এবং ইউটিউবে অবশ্য গানটি পাওয়া গেল বিভিন্নজনের কণ্ঠে এবং আবু হেনা মোস্তফা কামালের প্রোফাইলে; কোথাও লেখা হয়েছে গানটির গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবার কোথাও গাজী মাজহারুল আনোয়ার; আপনি কোন দিকে যাবেন? চলচ্চিত্রটি পাওয়া গেলে আমরা হয়তো জেনে নিতে পারতাম, উপহার ছবিতে কে গান লিখেছিলেন; সে ক্ষেত্রে হয়তো আপনাকে গানের বাণীর শৈলী থেকে গীতিকারের নাম ঠিক করে নিতে হবে; যা কিছুতেই যৌক্তিক নয়। বিষয়টি সম্পর্কে মানুষ কবে সচেতন হবে জানি না। এ গানের গীতিকার হিসেবে আমার পক্ষপাত অবশ্য গাজী মাজহারুল আনোয়ার-এর দিকেই। ‘রাজলক্ষী-শ্রীকান্ত’ চলচ্চিত্রের টাইটেল থেকে জানা যায়, সে ছবিতে গীতিকার হিসেবে আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং গাজী মাজহারুল আনোয়ার গান লিখেছেন; কিন্তু সাবিনা ইয়াসমীনের গাওয়া কালজয়ী গানটির গীতিকার যে আবু হেনা মোস্তফা কামাল, তা জানতে, নিশ্চিত হতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে আমাকে। বিশেষ করে গানটিতে সঞ্চারী না থাকায় আমাকে আরো সংশয়ে পড়তে হয়েছে। আসুন আমরা বরং গানটি স্মরণ করি-

শত জীবনের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে

কত সাধনায় এমন ভাগ্য মেলে (২) \

এই মধুমিলনে মালা আর চন্দনে

হৃদয়ের সবটুকু সুবাস দিয়েছি ঢেলে \

জীবনে ও মরণে মমতার বন্ধনে

চিরদিন কাছে রবে আমায় যাবে না ফেলে \

(কথা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল \ সুর : খন্দকার নূরুল আলম)

এবারে আমি যে গানের কথা উল্লেখ করতে চাই, সম্ভবত এটি আবু হেনা মোস্তফা কামালেরও বিশেষ প্রিয় গান; হয়তো সে কারণেই গানটির প্রথম তিন শব্দে তিনি একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন। এ গানে আমরা তাঁর চিত্রকল্প বুননের দক্ষতা প্রত্যক্ষ করবো, প্রত্যক্ষ করবো তাঁর উপমা-উৎপ্রেক্ষা নির্মাণকলা।

আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি

এই চৈতালী রাতে ফুল-কঙ্কন পরেছি দখিন হাতে \

বনলতা দিয়ে দোলনা বেঁধেছি আর

কণ্ঠে পরেছি গানের অলংকার।

অঙ্গ ভরেছি তোমার প্রেমের অপরূপ তন্দ্রাতে \

(কথা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল \ সুর : আবদুল আহাদ)

আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা, শিল্পী বশির আহমেদের গাওয়া যে আধুনিক গানটি আমার পছন্দের তালিকায় প্রথম সারিতে ছিল না; কিন্তু আমি শ্রোতা জরিপে জানলাম, গানটি অনেকেরই পছন্দের। কার্যকারণ খুঁজতে গিয়ে দেখলাম গানের বাণীর ঋদ্ধি; রবীন্দ্রনাথের গানে সুর-বৈচিত্র্যের ঘাটতি কখনো কখনো বাণীর অতুল ঐশ্বর্যে ঢাকা পড়ে যায়। গানের বাণী যে আমাদের আপ্লুত-আচ্ছন্ন করে তা রবীন্দ্রনাথ পাঠ করে সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। প্রণয়াকুতি প্রকাশে প্রেমিক হৃদয়ে যে আকুলতা তা আমরা সহজেই খুঁজে নিতে পারবো নিচের গানটিতে-

তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে

এই রাত এমন মধুর

তোমার হাসির রঙ লাগলো বলে

দোলে ঐ মনের মুকুর \

(কথা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল \ সুর : আহাদ আলী; আমার সন্দেহ এ গানের সুরকার হয়তো বা আবদুল আহাদ হবেন।)

আবু হেনা মোস্তফা কামালের গানে চিত্রকল্পের ব্যবহারে যে মুন্সিয়ানা, এক কথায় তা অসাধারণ। আমরা যদি তাঁর নিচের গানটির বাণীর দিকে দৃষ্টি দিই, দেখতে পাই কী সুনিপুণ দক্ষতায় তিনি তাঁর গানে কাব্যশৈলী ফুটিয়ে তুলেছেন-

সেই চম্পা নদীর তীরে

দেখা হবে আবার যদি ফাগুন আসে গো ফিরে \

সেই ঝর্ণাঝরা গাঁয়ের পাশে

নূপুর পায়ে রাত্রি আসে।

হয়তো ফেরে শ্রান্ত পাখি পালকঢাকা নীড়ে \

(কথা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল \ সুর: আবু বকর খান)

বিষয়ভিত্তিক গানে শিল্পশৈলী ফুটিয়ে তোলার মুন্সিয়ানা বুঝতে আমরা তাঁর নিচের গানটিতে মনোযোগ দিতে পারি-

নদীর মাঝি বলে এসো নবীন

মারে কবি বলে এসো নবীন

দেখেছি দূরে ঐ সোনালি দিন (২) \

পেয়েছি সাগরের মাতাল ঘ্রাণ

শুনেছি ফসলের ঐকতান।

জেগেছে বন্দরে এবার প্রাণ (২)

ব্যথা বিহীন \

(কথা : আবু হেনা মোস্তফা কামাল \ সুর : খন্দকার নূরুল আলম)

ষাটের দশকের শেষ দিকে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র ‘যোগ-বিয়োগ’ ছবিটিও ফিল্ম আর্কাইভে পাওয়া গেল না; কিন্তু জানা গেল সে চলচ্চিত্রের জন্যও গান লিখেছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছিলেন কবি; তাঁর চেতনায় বিয়োগের যে যাতনা সে কথাই বিধৃত হয়েছে সৈয়দ আবদুল হাদীর গাওয়া ‘যোগ-বিয়োগ’ চলচ্চিত্রের নিচের গানটিতে-

এই পৃথিবীর পান্থশালায় গাইতে গেলে গান

কান্না হয়ে বাজে কেন বাজে আমার প্রাণ \

কেউ চলে যায় কেউ বা আসে দুদিনের পরবাসে

কেউ বোঝে না কারো হাসি অভিমান \

কবি-গীতিকার আবু হেনা মোস্তফা কামাল অপরিণত বয়সে আমাদের ছেড়ে গেছেন, কিন্তু তিনি তাঁর কবিতায়-গানে আমাদের জন্য রেখে গেছেন অজ¯্র হৃদয়সংবেদী বাণী; যা বাঙালিকে মনে রাখতে হবে দীর্ঘদিন। আমাদের কেবল প্রয়োজন মনোযোগ। আমরা যদি তাঁর কবিতা-গান মনোযোগ দিয়ে পড়ি-শুনি, তাহলেই নিজেকে সমৃদ্ধ করে নিতে পারবো। যারা তাঁর শ্রেণিকক্ষের ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, অথবা তাঁর বক্তৃতা শোনার সুযোগ পেয়েছেন, তারা জানেন কত ঋদ্ধ ছিল তাঁর কথামালা। আসুন আমরা আমাদের গৌরবের প্রতি মনোযোগী হই এবং নিজেদের ঋদ্ধ করে নেয়ার সুযোগ গ্রহণ করি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj