লতিফ জোয়ার্দারের কবিতা : চেতনাপ্রবাহ ও জীবনতৃষ্ণা

শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কবি লতিফ জোয়ার্দার। তাঁর রচিত কাব্য এ পর্যন্ত ছয়টি। ছোটগল্পের বই চারটি। উপন্যাস এগারোটি। শিশুতোষ গ্রন্থ একটি। প্রকৃতার্থে তিনি কবিতার চাষি। কবিতা তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরেছে। কবিতার সাথে তাঁর বাস, তাঁর প্রেম, তাঁর ঘর, তাঁর বাসর, তাঁর খেলা। কখনো কবিতা তাঁকে বৈরাগী করে তোলে, কখনো আনমনা আবার কখনোবা বাউণ্ডুলে শব্দের চাষিতে পরিণত করে। দেশের প্রকৃতি কবিকে নতুন এক স্বপ্নরাজ্যের ঠিকানায় নিয়ে যান। এ দেশের নদী, সাগর, পাহাড়, সবুজ ধানক্ষেত কবিকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নেন। কখনো তিনি দেশকে যৌবনাবতী সরিষা ক্ষেতের সাথে তুলনা করেছেন। দেশের মায়ায় আচ্ছন্ন কবি ভালোবাসার প্রগাঢ় বন্ধনে দেশপ্রেমিকের মতোই আবিষ্ট হন। কবির কাছে সাদাকালো স্বপ্নগুলো রঙিন হয়ে নিজের দেশের আঙিনায় ভেসে বেড়ায় হৃদয় কার্ণিশে। কবির বুকের আগুনে স্বপ্নে পোড়া একটি মানচিত্র বুকে চেপে আঁকড়ে ধরেছেন। কবি স্বúœচারী। এ দেশ নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন। তাইতো তিনি ‘বাংলাদেশ’ কবিতায় অকাতরে বলেছেন-

আর এভাবেই একদিন আমাদের সাদাকালো স্বপ্নগুলো রঙিন হলো। আর সেদিন

থেকে তুমি হলে, আমার প্রেম আমার ভালোবাসা আমার প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

নিঃসঙ্গতা কবিকে কখনো কখনো আঁকড়ে ধরে। কবির জগতটা ছোট হতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে কবির মনোজগৎ ছোট হয় না। মনোজগতে খেলা করে অবিরল আলোর ফোয়ারা। সেখানে কালিমা থাকে না, অন্ধকার থাকে না। থাকে শুধু স্বর্গীয় বাতাস। অনবরত ভেসে চলে আনন্দ উচ্ছ¡াস। কবিকে ছেড়ে চলে যায় তার চারপাশের বন্ধুবান্ধব। কবি জুলফিকার চরিত্রের মধ্য দিয়ে তাঁর বিশ্বাস, ব্যর্থতা প্রকাশ করে থাকে। তাঁর মনের মধ্যে এক দুঃসহ বেদনা অনাগত ভবিষ্যতের দিকে তেড়ে নিয়ে যায়। পরিশেষে নিয়তির কাছে সঁপে দেয় তাঁর সমস্ত মন-প্রাণ। রেললাইনের ধারে লালরংয়ের আলপনায় আঁকা কবির চিরচেনা এই মাঠ, এই সবুজ ক্ষেত, এই নদী, এই সাগরের উপচে পড়া ঢেউ। চিরচেনা এই চারচালা টিনের ঘর, এক চিলতে উঠোন আর বুড়ো বৃক্ষ। বুড়ো বৃক্ষকেও করাতকলের চোখে ধরেছে। তাইতো কবি ব্যথায় কাতর হয়ে ‘জুলফিকার’ কবিতায় বলে ওঠেন-

কিছু কিছু উচ্চারিত দুঃখ আলপনায় আঁকা যায় না।

নিয়তির কাছে থাকা না থাকার অর্থ জুলফিকার একদিন বুঝেছিল।

যেদিন রেললাইনের ধারে পড়েছিল, কিছু লালরং রক্তের আলপনা।

কবির কাছে কবিতা তো আরাধনা। কবিতা না থাকলে কবির মৃত্যু ঘটে। কবিরা ঘর বোঝে না। সংসারে মায়ামমতা তাদের আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে না। তাদের দেশ থাকে না। তারা দেশান্তরী। বাউলা মনে তারা মনের মধ্যে ঘর বাঁধে। সেই ঘরে পুষে রাখে কবিতা নামের মানসীকে। সেই মানসীকে কবি অতি সযতনে পূজা করে। ভালোবাসে। তাকে সোহাগ করে। মমতায় জড়িয়ে রাখে। তার সাথে প্রেম করে। একাকী একা কবি সকল চাওয়া পাওয়ার বাসনা এই কবিতাকে ঘিরেই। তাইতো তিনি ‘কবি’ কবিতায় বলে ওঠেন-

মন হারিয়ে খুঁজে বেড়ায় মন।

ভেজা ভোরে অদ্ভুত তন্ময়তার ঘোর নিয়ে একাকী একা।

বুকের অনেক রং বদলে যায় বিষণœসন্ধ্যা নামে যখন।

কবি ‘কবিতায় যেন বাঁচি, কবিতায় যেন মরি’ কবিতায়ও একই আরাধনা করেছেন। তিনি কবিতায় স্বপ্ন দেখেন। কবিতায় আগামী দিনের চলার প্রেরণা পান। কবিতার আঁচলে মুখ লুকিয়ে কবি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন। কবি কবিতায় বলে ওঠেন, ‘জলের প্রবাহের মতো ডানাওয়ালা মেঘের কাছে যাই।’ প্রত্যেক কবিরই জীবন দেখার দর্পণ আলাদা।

কবি লতিফ জোয়ার্দার প্রেমকে বেদনার তীর্থভূমির সাথে তুলনা করেছেন। কবির কাছে সকল শূন্যতার নাম ভালোবাসা। চোখের জলে ভিজে ভিজে অনুভব করা যায় প্রেমের ভাষা। প্রেমের অমিয় বাণী। প্রেম তো শাশ্বত অবিনশ্বর। প্রেমের শাশ্বত রূপ স্বপ্নের ঘোরে বিচরণ। সে স্বপ্নের জাল বোনে। বাসা বানায়। ডানামেলে উড়ে বেড়ায়। তাইতো কবি ‘প্রেম ও প্রণয়ের ভাষা’ কবিতায় তুলে ধরেছেন-

অবুঝ দুঃখ বোঝে না হৃদয়ের বিশালত্ব

সুগন্ধি স্বপ্নগুলো উড়ে আসে রোজ রোজ

যদি বলি অন্তর্বর্তী আর কিছু নেই তুমি ছাড়া

সব রহস্য দূরে রেখে করি তোমারই খোঁজ।

কবি পূর্ণিমার চাঁদের প্রেমে পড়ে। চাঁদের আলোয় ¯œান করে। এই আলোর ফোয়ারায় ভাসতে থাকে। এক বিলাসী স্বপ্ন এসে ভর করে কবির মনের গহনে। এই বিলাসী স্বপ্নের একজন ‘মানসী’ কবির সামনে এসে দাঁড়ায়। কবি বলে ওঠেন, কোনো এক পুকুরের জলের ওপর আধখানা চাঁদ দেখে তাকে ভেবেছিল। মনের অগোচরেই ভাবতে থাকেন, অনন্তকাল ধরে আমি তোমাকেই দেখতে থাকবো। তোমার স্বপ্নের কাছে আর কোমল মিষ্টিমধুর আলোর গালিচায় চুমুভরা আদরের কাছে আমি নিজেকে বিলিয়ে দেব। ঘুমের ঘোরে আমি তোমারই ভালোবাসায় সিক্ত হবো আর তোমার আদরের আলোক শিখায় আমি পুড়ে পুড়ে শরীরের ঘ্রাণ নিব। কবির এই ভাবনা আর পাঁচজনের ভাবনা থেকে আলাদা। কারণ, কবি ভাবনার জগতে সাঁতরাতে থাকেন অনন্তকাল, নিরবধি।

তাইতো তিনি ‘লোভাতুর পূর্ণিমার চাঁদ’ কবিতায় অমন করে বলে ওঠেন-

আমি অনন্তকাল ধরে তাকিয়ে থাকবো।

দেখবো অনন্ত পূর্ণিমার চাঁদ আর দেখবো তোমাকে।

কবি অস্তিত্বের সব কথা ধ্বনিত হয় কবিতার শরীরে, কবিতার আত্মায়। কবিতার বোধ বিবেচনায়। কবি লতিফ জোয়ার্দারের কবিতার একটা গড়ন আছে। গড়নটি আমাদের জানা। কোনো কোনো সময় কবিতার বাঁক বদল হয়েছে বা করার চেষ্টা করেছে। কাব্য ভাষায় শব্দের অর্থময়তার সীমা চিরকালই লঙ্ঘনের অধিকার রাখে। সে ক্ষেত্রে লতিফ জোয়ার্দারও তার ব্যতিক্রম নয়। কবি তাঁর কবিতায় তৃষ্ণার সঞ্চার ঘটান ও স্বপ্নের বিস্তারজালে প্রবেশ করানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান। শব্দ কল্পনার রহস্যময়তা ক্রমেই এক আশ্চর্য ও গতিময়তা লাভ করানোর চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে কবি লতিফ জোয়ার্দারের কবিতায় সংবেদনশীল পাঠক সেই গতি, আর্তি আর আহ্বানের মধ্যে অফুরান এক মায়ার জগতে প্রবেশ করেন বা খুঁজে পান। কবিতার মধ্যে চলে চেতনা প্রবাহের ¯্রােত। চলে জীবন তৃষ্ণার অফুরন্ত চাওয়া। না পাওয়ার বেদনা। চলে দ্রোহ, প্রেম, বিরহ, দুঃখবাদ। চলে ঈশ্বরের নিকট আত্মসমর্পণ। কবি লতিফ জোয়ার্দারের কবিতায় এগুলো খুঁজে পাওয়া যায়। তাই কবি লতিফ জোয়ার্দার কাব্য সাহিত্যে কালের পরিক্রমায় স্বমহিমায় টিকে থাকবেন, এই আশা আমরা নিঃসন্দেহে করতেই পারি।

:: আদ্যনাথ ঘোষ

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj