সহিংসতার শিকার নারী কেন বিচার পাবেন না? : এড. মাকছুদা আখতার

সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এগিয়ে গেলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতার যে চিত্র আমরা দেখি তাতে আমরা শঙ্কিত হই। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ নারীরা যেমন যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, তেমনি যৌন নিপীড়ক ও ধর্ষকের তালিকায় রয়েছে কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্ক ব্যক্তিও। এমন চিত্র আমাদের সব অর্জনকে ¤øান করে। নারীর ক্ষমতায়নকে করে প্রশ্নবিদ্ধ।

নারী নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়। কখনো কখনো আসামিরা জেলও খাটে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাঝপথে থেমে যায় মামলার গতি। আমরা জানি বেশিরভাগ ঘটনা পরিবারের ও সমাজের হস্তক্ষেপে গোপন রাখা হয়, কখনো কখনো বেআইনি সালিশে মীমাংসা করা হয়। ধর্ষণকারীর সঙ্গে ধর্ষণের শিকার নারীর বিয়ের মাধ্যমে মামলা থেকে ধর্ষণকারীকে রক্ষা করা হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়, এমনকি সমাজে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। যে কারণে মামলায় যেতে পরিবার বাধা দিয়ে থাকে। তা ছাড়া মামলার দীর্ঘসূত্রতায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। মামলা গ্রহণে পুলিশ কর্মকর্তার গাফিলতি, অদক্ষতা, অসততা, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক প্রভাব, সাক্ষীর সুরক্ষা না থাকা, ডাক্তারের দায়সারা গোছের রিপোর্ট ও আদালতে সাক্ষ্য প্রদানে অনীহা, ভিকটিম পরিবারের লোভ-লালসা, রাষ্ট্র পক্ষের নিয়োজিত আইনজীবীর অসততা, অদক্ষতার সমন্বয়ে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ মামলায় আসামি শাস্তি পাচ্ছে, অন্যরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের কারণে অভিভাবকরা কখনো কখনো কন্যাকে বাল্যবিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। যা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেছেন, বিচার পাওয়া প্রতিটি মানুষের মানবিক অধিকার। নারীরা বিচার ব্যবস্থায় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু কাক্সিক্ষত বিচার পাচ্ছেন না। যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিচার কার্যের সঙ্গে জড়িত সবার মানসিক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। ন্যায্য সমাজ গড়তে হলে নারীর ওপর নির্যাতন বন্ধ করতেই হবে। যতদিন বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় থাকবে, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা দূর না হবে, ততদিন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না।

আরেকটি অনুষ্ঠানে মানবাধিকার কর্মী এড. সুলতানা কামাল বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে অধিকার পেলেও নারীর সমঅধিকারের বিষয়টি সমাজে এখনো অগ্রহণযোগ্য। বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীর সুযোগ খুব সীমিত। আবার নারী যখন বিচার চান, পান না। কিছু কিছু জায়গায় আমরা হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে আছি যেমন- তনু, নিতু, রুনি হত্যার ক্ষেত্রে। অনবরত নারীর ওপর নির্যাতন হয়ে যাচ্ছে। আমরা বিব্রত বোধ করি, কিন্তু এর বিচার হয় না।

গারো নারীকে ধর্ষণের পর মামলা করার বিষয়ে যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তার ভিত্তিতে সমগ্র পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল ধর্ষণের ও সহিংসতার শিকার নারীর বিচারপ্রাপ্তি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা সংবলিত রায় দেন। ওই রায়ে ধর্ষণের শিকার নারীকে সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে যে ১৮টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেগুলো আমাদের জানা দরকার। রায়ে বলা হয়- ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নসহ এ ধরনের আমলযোগ্য অপরাধের ঘটনায় থানার অফিসার ইনচার্জ কোনো বৈষম্য ছাড়াই তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনার স্থান উল্লেখপূর্বক অভিযোগ লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করবেন। অভিযোগকারী যেন অনলাইনে তার অভিযোগ নিবন্ধন করতে পারে সেজন্য ওয়েবসাইট চালু করতে হবে। পুলিশ কর্মকর্তা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকার বা ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে আইনে বিধান থাকতে হবে। প্রতিটি থানায় কনস্টেবল-ঊর্ধ্ব পদবির নারী পুলিশ সদস্য নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার সময় ডিউটি অফিসার নারী পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করবেন। সেই সঙ্গে যৌন নিপীড়নের শিকার নারী ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সব ক্ষেত্রে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের শিকার নারীর পরিচয় গোপন রাখতে হবে। সহায়তা পাওয়া যেতে পারে এমন নারী সমাজকর্মীদের তালিকা সব থানায় সংরক্ষণ করতে হবে। নির্যাতনের শিকার নারীর বক্তব্য রেকর্ড করার সময় তার আইনজীবী অথবা তার মনোনীত ব্যক্তি অথবা একজন সমাজকর্মী অথবা প্রটেকশন অফিসারের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার নারীকে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত তার সুরক্ষার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং এতদসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে চাইলে তা জানাতে হবে। ডিউটি অফিসার কোনো অভিযোগ পাওয়ার পর অনতিবিলম্বে তা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারকে জানাতে হবে। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার নারী বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারীর জন্য প্রয়োজনবোধে ঘটনা বা যে কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান বা অনুবাদ করে শোনানোর ব্যবস্থা করতে হবে। অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার পর তদন্ত কর্মকর্তা কোনো বিলম্ব না করে নারী পুলিশ সদস্যসহ নির্যাতনের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষার ব্যবস্থা করবেন। নির্যাতনের শিকার নারীকে উদ্ধারের জন্য ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার সব সময় সতর্ক থাকবে। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সব প্রকার ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার নারীর ডাক্তারি পরীক্ষার ক্ষেত্রে রাসায়নিক বা ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যৌন নির্যাতনের শিকার নারীর ডিএনএ এবং অন্যান্য নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষাগার অথবা ডিএনএ প্রোফাইলিং সেন্টারে পাঠাতে হবে। নির্যাতনের শিকার নারীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নেয়া অথবা এতদসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহে তদন্ত সংস্থার ব্যর্থতা বা গাফিলতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনার তদন্তে তদন্ত কর্মকর্তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সব প্রকার নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে হটলাইন নম্বর ১০৯২১ চালু করাসহ তা অডিও, ভিডিও এবং ওয়েবসাইটসহ সব ধরনের মিডিয়াতে ব্যাপক প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। মেট্রো পলিটন এলাকায় আলাদা অফিস স্থাপনের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj