সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের দায় নারীর নয় : সেবিকা দেবনাথ

সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু সুমাইয়ার জন্মের পরই জীবনটা বদলে গেল সুন্দরীর। প্রথম সন্তান মেয়ে মেনে নিলেও দ্বিতীয় কন্যা সুমাইয়াকে মেনে নিতে পারেনি সুন্দরীর স্বামী বদিউজ্জামান ও তার পরিবারের সদস্যরা। এ নিয়ে সংসারে শুরু হয় নিত্যি অশান্তি। স্বামীর মারধর হয়ে গেল সুন্দরীর প্রতিদিনের পাওনা। তবে মেয়েকে সে বুক দিয়ে সবসময় আগলে রাখত। এমন করেই কেটে গেল নয় বছর। সুন্দরী ভেবেছিল একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই ঠিক হলো না। ১৩ সেপ্টেম্বর ঝগড়ার এক পর্যায়ে ক্ষোভে বদিউজ্জামান সুমাইয়াকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। ওতেই ক্ষান্ত হয়নি বদিউজ্জামান। বাড়ির পাশের ডোবায় ফেলে দেয় মেয়ের মৃতদেহ। এই ঘটনাটা সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার মুকুন্দগাঁতি গ্রামের।

সৈয়দপুরের মৌমিতা আফরিন পুতুলকেও কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ায় মধ্যযুগীয় বর্বতার শিকার হতে হয়। স্বামী-শ^শুর-শাশুড়ি-ননদ মিলে তাকে প্রাণে মেরে ফেলারও চেষ্টা করে। সন্তান ও নিজের জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়েই নীলফামারীর নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে ৩০ জুন মামলা করে পুতুল।

উপমহাদেশের সময় পরিক্রমায় দেখা যায়, উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত যে কোনো পরিবারেই কন্যা শিশুর জন্ম খুব বেশি স্বাগত জানানো হয়নি। এখানে অর্থনৈতিক সূত্র কিছুটা ভুল প্রমাণিত হয়। নিম্নবিত্ত পিতা কন্যা দায়গ্রস্ত হওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে, কিন্তু উচ্চবিত্তদেরও মুখ মলিন হয়। এটা ভাবনা যতটা আর্থিক তারচেয়ে বেশি মানসিক। পৃথিবীতে অস্তিত্ব লাভের প্রথম প্রহর থেকে কন্যা শিশুর জীবনটা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। সাধারণত টিউমার বা অবাঞ্ছিত কোনো কিছু শনাক্তকরণের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে আবিষ্কৃত হয়েছিল আলট্রাসনোগ্রাম নামক যন্ত্রের। কিন্তু কালের বিবর্তনে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অবাঞ্ছিত অনাকাক্সিক্ষত কন্যা শিশুর আগমন বন্ধে লিঙ্গ নির্ধারণে এর ব্যবহার এখন রীতিমতো শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মাধ্যমে গর্ভের সন্তানের ভ্রƒণ শনাক্ত করা হচ্ছে। কন্যা শিশুদের মাতৃগর্ভেই হত্যা করা হচ্ছে।

কিছু দিন আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন চোখে পড়ল। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের শতাধিক গ্রামে গত তিন মাসে একটিও মেয়ে শিশুর জন্ম হয়নি। দেশটির স্বাস্থ্য দপ্তর জানায়, রাজ্যের উত্তরকাশী জেলার ১৩৩টি গ্রামে গত তিনমাসে জন্মানো ২১৬ শিশুর সবাই ছেলে। এমন বিস্ময়কর ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দেয় প্রশাসন। ধারণা করা হয়, মেয়ে ভ্রƒণ হত্যাই এর পেছনে দায়ী। এর আগে কন্যা সন্তান ভ্রƒণ হত্যা রোধে দেশটিতে হাসপাতালে কন্যা সন্তানের প্রসব বিনামূল্যো করানোর ঘোষণা দিয়েছিল।

কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়ার জন্য কীভাবে মায়েদের দোষী করা হচ্ছে, তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে এমন খবর প্রায়ই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে। অনেক ঘটনা থেকে যায় অজানা। এমনো অনেক পরিবার আছে কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার দায়ে মাকে প্রতিনিয়তই শুনতে হয় নানা ধরনের কট‚ক্তি ও গঞ্জনা। কিন্তু আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগ তো শেষ হয়ে গেছে বহু বছর আগেই। শিক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষ এগিয়ে গেছে অনেক দূর। তবুও কেন সেকেলে ধ্যান-ধারণা? এখনো মানুষ বিশ্বাস করে, কন্যা সন্তান জন্ম দেয়া মানেই তার মাথা নিচু হয়ে যাওয়া। যে কেউ যা খুশি তাকে বলতে পারবে। কন্যাসন্তান অপরের গচ্ছিত সম্পদ। যত তাড়াতাড়ি তাদের বিদায় করে দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে হবে। তাইতো বাল্যবিয়ে আজো বন্ধ হয়নি। আর ছেলে সন্তান মানেই ত সূর্য সন্তান। পরিবারের সম্পদ। বংশ রক্ষার দায়িত্ব পুত্র সন্তানেরই। তই ছেলে জন্ম দেয়ার পর ছেলের গর্বে মায়ের মাথা উঁচুই হয়। সংসারে পাকাপাকি অবস্থান নিশ্চিত হয় ওই নারীর। কিন্তু যে সত্য প্রতিষ্ঠিত যা বিজ্ঞান বলে সে কথা মানতে চান না অনেকেই। তারা স্বীকার করতে চান না শিক্ষায়, দীক্ষায়, কর্মদক্ষতায়, মেধায়, প্রতিভায় ছেলেমেয়েতে কোনো ভেদ নেই। কিছু ক্ষেত্রে মেয়েরা বেশ খানিকটা এগিয়েই।

বিজ্ঞান বলে, প্রত্যেক মানুষের ডিএনএতে এক জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম থাকে। যার একটির নাম ‘এক্স’ অন্যটির নাম ‘ওয়াই’। এক্স ও ওয়াই ক্রোমোজোম দিয়ে গঠিত হয় পুরুষ শরীর। আর নারী দেহে থাকে দুটোই ওয়াই ক্রোমোজোন। তাই নারী-পুরুষের মিলনের সময় সন্তানের ভ্রƒণে বাবার থেকে এক্স ও মায়ের থেকে ওয়াই ক্রোমোজোম নিয়ে এক্স-ওয়াই যুগল অথবা দুজনের থেকে ওয়াই ক্রোমোজোন নিয়ে ওয়াই-ওয়াই যুগল তৈরি হতে পারে। এক্স-ওয়াই যুগলে পুত্রসন্তান আর ওয়াই-ওয়াই যুগলে কন্যাসন্তান হয়। সহজ করে বললে এর সার সংক্ষেপ যা দাঁড়ায় তা হলো; সন্তানের লিঙ্গ গঠনে বাবারই পরোক্ষ অবদান করেছে, মায়ের নয়।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj