চজেপ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আড্ডা ; অবাক শক্তির উৎসে

শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মো. বোরহান উদ্দিন

৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সকাল বেলা।

চট্টগ্রাম যাচ্ছি। চট্টগ্রাম আমার জেলা শহর; আমার বিকাশ সময়ের নগরী। যাচ্ছি বিশেষ কাজে। সকালের সোনার বাংলা ট্রেনে আমার সঙ্গী পাঠক ফোরাম সতীর্থরা। আমাদের বটবৃক্ষ ভোলা নাথ পোদ্দার আছেন পুরোভাগে। পেছনে আমি, দন্ত্যস সফিক ও রেজাউর রহমান সবুজ। তুখোড় পাফো সংগঠক সরফরাজ উদ্দিন পারভেজ অগ্রবর্তী হিসেবে চাটগাঁয় পৌঁছেছে আগের রাতেই। এ যাত্রায় স্মৃতি উসকে দিয়েছে আমার মনন সংগঠন পাঠক ফোরাম চট্টগ্রাম জেলা পরিবারের বন্ধুরা। ২২ বছরের আবর্ত শেষে এই পরিবার পা দিয়েছে ২৩ বছরের ঘরে। তাদের আয়োজন ‘প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আড্ডা’টা নিতান্তই অনাড়ম্বর আনুষ্ঠানিকতা। কোনো নিমন্ত্রণ ছিল না আমাদের। যেচে পড়ে আমাদের যাওয়া। বলা যায় ‘ঐক্যে অবাক শক্তি’- প্রত্যয়টাকে আবারও অনুভব করতেই এই ছুটে চলা।

২.

রেলস্টেশনে অপেক্ষায় জোটন সোম এবং ‘সোম জুনিয়র’ অরিত্র সোম সূর্য। ওদিকে বারবার খবর নিচ্ছেন পুরনো পাফোস বন্ধু মোহাম্মদ আলী আকবর। ভোকার চার তলার ‘নিয়মিত বান্দা’ আকবর এখন চাটগাঁইয়া। ব্যবসাপাতি জমিয়ে ভালোই আছেন চট্টলায়। সোনার বাংলা চাটগাঁ পৌঁছার অনুমিত সময় ফেল করল প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা। ততক্ষণে দুপুর গড়িয়েছে। নামাজ শেষে ভরদুপুরেই আতিথ্য নিলাম বন্ধু জোটন সোমের বাসায়। দুপুরের খাবার আয়োজন না করার পূর্বশর্তেই তার বাসায় যাওয়া। দুপুরের খাবার আয়োজন হয়নি সত্য; পরিবর্তে যা হয়েছে তা অভাবনীয়। ভাদ্রের তালপাকা গরমে শরবত দিয়ে শুরু। তারপর একে একে মিষ্টি, দধি, মিক্সড ফ্রুট, চা-নাস্তা… কত কী আয়োজন! খাব না, খাই না, কিছুক্ষণ বাদেই তো দুপুরের খাবার খাব, ডায়বেটিস তাই নিষিদ্ধ- নানান বাহানা তুলছিলাম এক একজন। কিন্তু আখেরে দেখা গেল সবকিছুই সাবাড়! সোম পরিবারের আতিথেয়তার তৃপ্তি নিয়ে বের হলাম; ঘড়ি তখন তিনটার ঘরে।

পরবর্তী গন্তব্য বাঙালিয়ানায়। এবার সত্যি সত্যি দুপুরের খাবার খাওয়ার পালা। এখানে আরেক দফা ভূরিভোজন। আমাদের হাপুস-হুপুসের ফাঁকে বিপরীত দিকের টেবিলে চুপিচুপি পাপন বড়ুয়া শাকিল অবস্থান নিলেন। তিনিও সুযোগ নিতে চাইলেন গৃহস্থ হওয়ার। শেষ পর্যন্ত আলী আকবরের কাছে তাকে হার মানতে হলো। এই আয়োজন শেষে এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আড্ডার ভেন্যুতে হাজির হওয়ার পালা। ওখানে আমাদের জন্য যে অপেক্ষা করে আছে বন্ধুত্বের অপার বিস্ময়!

৩.

টেন ইলাভেন লাউঞ্জ আগে থেকে প্রস্তুত ছিল বন্ধু প্রকৌশলী পাপন বড়ুয়া শাকিলের তৎপরতায়। চজেপ যাদের হাতে পুনর্জন্ম পেয়েছিল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাজমুল হুদা সিমু, প্রকৌশলী রূপক বড়ুয়া ও জালালউদ্দিন সাগর। সবাই মিলে ভালোবাসায় পসরা সাজিয়ে বসেছেন এখানে। তাদের হার্দিক আলিঙ্গনে আমিও মেপে নিই ভালোবাসার অবিনাশিতাবাদ সূত্র। বন্ধু সৈকত বড়ুয়া আজ লেখালেখি, সাংবাদিকতা বিসর্জন দিয়ে পুরোদস্তুর ব্যাংকার। পাফোর একনিষ্ঠ পাঠক এই বন্ধুটিও আজ উপস্থিত একটি উজ্জ্বল সময়ের সাক্ষী হতে। যেমনটা এসেছেন মাইনুল এইচ সিরাজী, আবু মোহাম্মদ ফারুকী, মামুন মুহাম্মদ- চট্টগ্রাম জেলা পরিবার যাদের হাতে যাত্রারম্ভ করেছিল। তাদের সেই সুবর্ণস্মৃতি আবার ভাগাভাগি করে নেয়ার সুযোগটা পেলাম আমরা। শাহেদা আখতার শিমু এবং কুশিয়ারা মিলে সিরাজী ভাইয়ের উজ্জ্বল পরিবার। তারাও আমাদের এই আনন্দ আয়োজনে সঙ্গী। সঙ্গী হয়েছেন আজ ফাতেমা ইসলাম। এই পরিবার যার কাছে পেয়েছে মাতৃস্নেহ, বোনের ভালোবাসা। সুরাইয়া জামান মিলি, জিন্নাত আরা রোজী, আনোয়ার আবসার এমন নামগুলো পাফো পাতাকে সমৃদ্ধ করে গেছে অনেক অনেক দিন। চাটগাঁর এই মানুষগুলোও আজ হাজির ভালোবাসার ডালি নিয়ে। হাজির অনেক দিনের চেনা মহিউদ্দিন চৌধুরীও। আলাউদ্দিন খোকন সমসময়ে সাড়া জাগানো নাম। তার সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হইনি এবারও। রুবাইয়াৎ বেলালও তেমন একজন মানুষ। অসাধারণ বন্ধুবৎসল মানুষটি আড্ডা জমিয়েছেন এই আয়োজনে। পাহাড়তলী থেকে মোশাররফ ভুঁইয়া পলাশ এসেছেন যথারীতি তার বহর সঙ্গে নিয়ে। সাইফুর রহমান অমি, মো. পারভেজ চৌধুরী, মো. আরিফুল ইসলাম সে বহরের আনন্দসঙ্গী। অসাধারণ এমন কিছু সংগঠক পাহাড়তলী থেকে সমান্তরালে আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। তাদের ভালোবাসার অনুরণনও শুনলাম আবার।

৪.

সামান্য যেটুকু আনুষ্ঠানিকতা ছিল তা মাতিয়ে রেখেছেন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তার সাফ কথা- তিনি আজ সিভিল সার্জন হিসেবে নন; উপস্থিত আছেন কুমিল্লা পাঠক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে। কুমিল্লার পক্ষ থেকেই চজেপকে তিনি শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। সামস সাগর ভাইয়ের নেতৃত্ব আর ইতি ভাবির অনুপ্রেরণা পেয়ে ঋদ্ধ হয়েছিল পাফো ঢাকা পরিবার। এবার চাটগাঁর পালা। ঢাকা পরিবারের এই সাবেক সভাপতি এখন চট্টগ্রাম আছেন কর্মসূত্রে। তারাও আলো করেছেন এই আয়োজন। ভোরের কাগজের চট্টগ্রাম অফিস প্রধান সমরেশ বৈদ্য, রিপোর্টার প্রীতম দাশ, ফটো সাংবাদিক কমল রুদ্র মিলে আনুষ্ঠানিকতার পূর্ণতা দিলেন। আমরাও ভোলাদার নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বন্ধুদের হাতে শুভেচ্ছাডালি তুলে দিলাম ঢাকা পরিবারের পক্ষে।

আয়োজন হৈ-হুল্লোড়ের ফাঁকে ফাঁকে জিন্নাত আরা রোজী আপার কাছে জেনে নিচ্ছিলাম হাল-হকিকত। কাজী তাহমিনা নূরের কাছে পেলাম সেই পুরনো উচ্ছ¡াসের স্মৃতি।

মীরসরাই, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি আছে আমার শারমিন মুস্তারী সুমির সঙ্গে। সেসব পাঠ পরিক্রমা আর লেখালেখির সম্ভাবনাময় নাম শারমিন মুস্তারী আজ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আজো একই রকম চিরসবুজ আছে এই বন্ধুটি। অসাধারণ সাফল্যময় জীবনও তাকে ভুলতে দেয়নি সেই হিরণ¥য় স্মৃতিগুলো। যেমনটি হয়নি মাহমুদা বেগম সোনিয়ার ক্ষেত্রেও (আমি আগে বিদায় নেয়ায় অনুষ্ঠানে দেখা হয়নি)। জালালউদ্দিন সাগর-সোনিয়া দম্পতির সন্তান আলিফ আদনান আদি এদিন মৌন উপস্থিতি দিয়েও মুগ্ধ করেছে আমাকে। আহা, সেই স্মৃতিময় সময়কে কতটা পেছনে ফেলে এসেছি আমরা! তার সাক্ষী যেন কিশোর আদি।

এক ফাঁকে দুটো মিনিট সময় নিয়ে আগাম বিদায় বলে নিলাম ঢাকামুখো হবো বলে।

ঢাকায় পাফোর রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ফাহমিদা হায়দার সোমা; মানে সোমা’পাকে কথা দিয়েছিলাম চাটগাঁ গেলেই তার বাসায় হাজির হবো ঠিক। কথা বরখেলাপের অনুযোগ তুললেন তিনি আমার বিদায় বেলায়। অগত্যা জিভে দাঁত কেটে ক্ষমা চেয়ে তবেই বিদায় নিলাম। ইতি টানতে ঢাকার প্রতিনিধি বটবৃক্ষ ভোলা নাথ পোদ্দার, সরফরাজ উদ্দিন পারভেজ, দন্ত্যস সফিক এবং রেজাউর রহমান সবুজকে রেখে আমি বেরিয়ে গেলাম একটু আগেভাগেই। অনন্যসাধারণ সব ভালোবাসার গল্পকে সঙ্গী করে ঢাকার পথ ধরলাম। উৎসে ফেরার গল্পটা তাই আশা জাগানিয়াই হলো।

:: পাফোস-১০৫০০

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj