আত্মসম্মান

শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

জোবায়ের রাজু

আজ সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার ঘরে স্বয়ং বাবাকে দেখে অনেকটা অবাকই হলাম। কারণ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বাবা কখনো আমার ঘরে আসেন না। একটা সময়ে ভেবেছিলাম আমার ঘরের দেয়ালে ঝুলানো মোনালিসার ওই তৈলচিত্র দেখে ধর্মপরায়ণ বাবা হয়তো সচরাচর আমার ঘরে উঁকি দেন না। এটা ভাবতেই দেয়াল থেকে মোনালিসার সেই তৈলচিত্র নামিয়ে ফেললাম। তারপরও বাবার আমার ঘরে আসতে বেশ সংকোচ। রোজ ফজরের নামাজের সময় বাবা আমার ঘরের দুয়ারে এসে ঠায় দাঁড়িয়ে কণ্ঠে মিনতির ভাব এনে ডাকতে থাকেন ‘ও দিদার। উঠ এবার। নামাজের সময় হয়ে গেছে। শোন পাখিরা ডাকছে।’

সে বাবা আজ সশরীরে আমার ঘরে এসে চেয়ারে বসে পুরনো পেপার পড়ছেন। আমার ঘুম ভেঙেছে দেখে বাবা কোনো কিছু না বলে সোজা আমার শিয়রে বসে নিচু গলায় বললেন, ‘দিদার, তোকে আজ ধন্যপুরে যেতেই হবে। যা সেলুনে গিয়ে শেভ করে আয়। কালো জামাটা পরিস বাবা। এই সুযোগটা কাজে লাগালে বেশ ভালো হয় আমাদের জন্য।’

ঘটনার বিশ্লেষণে বাবা আমায় যা শোনালেন, তা শুনে আমি অবাক হলাম। ধন্যপুরের অন্যতম ধনবান ব্যক্তি আলী হায়দার তার একমাত্র মেয়ে অদিতির জন্য বাবার এক বন্ধুর মাধ্যমে আমার কাছে বিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। অদিতিকে বিয়ে করলে আমি তার বাবার যাবতীয় অর্ধেক সম্পদের মালিক হব। তখন আর আমাদের পরিবারে অভাব থাকবে না। আমরা এই আধা ভাঙা ঘর ছেড়ে অদিতির বাবার দেয়া নতুন বাড়িতে উঠব। আমার ছোট ভাই রকির আর কোনো দুঃখ থাকবে না। স্কুলে তার বেতন বাকি পড়ে থাকবে না। ভাঙা সাইকেলের বদলে তার একটি দামি বাইক হবে। কাশেম কাকুর মুদি দোকানের বাকি খাতায় বাবার নামে কাড়ি কাড়ি টাকা বাকি থাকবে না এবং টাকার জন্য কাশেম কাকুরও কটুবাক্য বাবাকে শুনতে হবে না। আজকের এই টানাপড়েনের দিন শেষে আমাদের সামনের দিনগুলো হয়ে উঠবে রঙিন। সবই হবে অদিতিকে বিয়ে করলে। অদিতির বাবা কার কাছ থেকে আমার গুনগান শুনে মেয়ের জন্য পাত্র হিসেবে আমাকে পছন্দ করেছেন।

উত্তেজনা মেশানো কণ্ঠে বাবা বললেন ‘দিদার, আলী হায়দারের মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়েটা হলে আমাদের দিন বদলে যাবেরে। দেখিস!’

ধমকের সুরে বাবাকে বললাম ‘আপনার এত লোভ? ছিঃ বাবা।’

নিরস গলায় বাবার সরল জবাব ‘কি করব বাপু, অভাব যে মানুষকে লোভীও বানিয়ে দেয়।’

বাবার এ কথাটা বলার ভঙ্গিমা দেখে আমার বুক ভেঙে গেল। সত্যিই তো অভাব আমাদের রোজ সঙ্গী। ছোটবেলায় টাকার অভাবে কোনো স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার সুযোগ হয়নি। ঠিক একই ব্যাপার নীরবে ঘটছে আমার ছোট ভাই রকির বেলায়ও। প্রাইভেট পড়ার বিষয়ে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। ছাত্র হিসেবে সে বেশ মেধাবী বলে পরীক্ষায় ভালোয় ভালোয় পার পেয়ে যায় সর্বোচ্চ মার্ক নিয়ে। অনেক বছর বাবার গায়ে নতুন শার্ট দেখি না। দেখা গেছে শার্টের কোনো অংশ ছিঁড়ে গেছে, বাবা সে শার্ট পলিথিনে মুড়িয়ে সোজা টেইলার্স দোকানের দিকে পা বাড়ান। ছেঁড়া শার্ট জোড়া দিতে দিতে বাবার পুরনো শার্ট আজ পোস্টমর্টেমের রোগীর মতো সেলাই করা। সব কিছুর কারণ হচ্ছে অভাব।

বাবাকে সাফ জানিয়ে দিলাম- আমার এই মুহূর্তে বিয়ে করা সম্ভব না। বাবা বললেন ‘আলী হায়দার সাহেব তোকে নিজ থেকে পছন্দ করেছেন। এই সুযোগটা হাত ছাড়া হতে দেয়া যায় নারে।’ কোনো কথায় আমাকে গলতে না দেখে শেষে কাঁদো কাঁদো স্বরে তিনি বললেন, ‘এই সংসারের অভাবের বোঝা আমি আর বইতে পারছি না।’ অনেকদিন পর বাবার চোখে জল দেখা গেল। সে জল স্পর্শও করল আমাকে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বাবার ইচ্ছে পূরণ করব। আমি ধন্যপুরে যাব। অদিতির সঙ্গে আমার বিয়েটা হোক। বদলে যাক আমাদের এই কষ্টের জীবন ধারা।

২.

ধন্যপুরের আলী হায়দার সাহেবের প্রকাণ্ড আলিশান বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে আছি আমি। সারা ঘরময় লাখ টাকার আসবাবপত্র। মাথার ওপর কোটি টাকার ঝাড়বাতি। দেয়ালে দেয়ালে ঝুলছে অদিতির বিভিন্ন বয়সের ফটো।

আমার পাশে পাঞ্জাবি পরে আয়েশী ভঙ্গিমায় বসে আছেন অদিতির মামা রফিকুল ইসলাম। তিনি আমার সঙ্গে খোশগল্পে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠলেন। তবে উনার কথাবার্তায় এক ধরনের অহঙ্কারের গন্ধ আছে। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী অদিতির নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। তাদের দান খয়রাতের হাত অনেক লম্বা। গ্রামে অদিতির দাদাজানের নামে স্কুল গড়ার পরিকল্পনা আছে। এমনকি এই আলিশান বাড়িতে নাকি এগারো বছর আগে কোনো এক নাটকের শুটিংও হয়েছে। এসব তথ্য দিতে দিতে রফিক সাহেব আমার কান ঝালাপালা করে দিলেন। আমি এখানে পাত্রী দেখতে এসেছি। পাত্রীর পরিবারের লম্বা লম্বা গল্প শুনতে নয়।

কিছুক্ষণ পর কোট প্যান্ট পরে মধ্য বয়সের একজন হাজির হলেন অদিতির বাবার পরিচয় নিয়ে। আমি অদিতির বাবাকে সালাম দিলাম। হাসি মুখে তিনি সালামের উত্তরও নিলেন। স্বল্পভাষী অদিতির বাবা খুব একটা কথা না বলে ভরাট গলায় বললেন ‘যাও অদিতির ঘরে যাও। সে তোমার সঙ্গে পার্সোনাল কথা বলবে।’

৩.

রূপসী এক মেয়ের ঘরে দামি চেয়ারে বসে আছি আমি। অদিতি যে দেখতে এতই রূপসী হবে, এটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। আমাকে অবাক করিয়ে দিয়ে রিনরিনে গলায় অদিতি বলল ‘ছবিতে দেখে আপনাকে বেশ ভালোই লেগেছে। তবে বাস্তবে আপনি দেখতে ততটা ভালো না।’ অবাক কণ্ঠে বললাম ‘ছবিতে দেখেছেন মানে? আমার ছবি কে দেখাল আপনাকে?’ মৃদু হেসে অদিতি বলল ‘আজকাল ফেসবুকের যুগে কারো ছবি দেখা অত কঠিন কিছু না। যাই হোক, আপনার পরিবারের খোঁজখবর কিন্তু আমি আগেই নিয়েছি।’ ভ্রæ কুঁচকে জবাব দিলাম ‘তাই নাকি? তা কি কি খবর নিয়েছেন?’ তিরস্কারের ভঙ্গিমায় অদিতি বলল, ‘ফকিন্নিদের খোঁজ নিলে ভালো কোনো খবর পাওয়া যায় নাকি?’

প্রচণ্ড ধাক্কার মতো খেলাম। এটা কেমন ব্যবহার! পায়ের পা তুলে আয়েশী ভঙ্গিমায় বসে অদিতি বলল, ‘জানি আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশ ভালো। দেখতেও সুপুরুষ। কিন্তু নিজের পরিবারের দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছেন? কি আছে আপনার? কোন সাহসে আমার মতো ধনীর দুলালিকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেন?’

আমি নার্ভাস হয়ে গেলাম। তারপরও বললাম ‘আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন। আমি স্বেচ্ছায় এখানে আসিনি। আপনার বাবা আমাকে পছন্দ করেছেন আপনার জন্য পাত্র হিসেবে।’

চোখ কপালে তুলে অদিতি বলল ‘ইম্পোসিবল। কে আপনাকে এই ভুল তথ্য দিয়েছে! আমাকে আপনাদের ঘরের বউ করার জন্য আপনার বাবা আমার রফিক মামার পা পর্যন্ত ধরেছে। মামা কত করে বোঝালেন আপনার বাবাকে। তিনি মানতেই চান না। হাত জোড় করলেন। মামা বাবাকে ব্যাপারটা জানালেন। যেহেতু আপনার বাবাকে মানিয়ে রাখা যাচ্ছে না, তাই বাবা বললেন আপনাকে একবার ডেকে পাঠাতে। সে কারণে আপনার আজ এখানে আসা। কিন্তু বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন তার বন্ধুর ছেলে শুভর সঙ্গে। শিল্পপতি বাবার একমাত্র সন্তান শুভ। তার মা টিভিতে ইংলিশ খবর পড়ে। শুনেছি আপনার মা নাকি অভাবের তাড়নায় আপনাদের রেখে কার সঙ্গে পালিয়ে গেছে। হা হা হা। সেই ঘরে বাবা আমাকে পাঠাবেন? অদ্ভুত!’

অদিতির কথায় আমার চোখে পানি চলে এল। এখানে এভাবে অপমানিত হবো, জানতাম না। বাবা বলেছেন, অদিতির বাবা আমাকে নিজের থেকে পছন্দ করে এখানে ডেকেছেন। অথচ এই সংবাদ মিথ্যা। আমাদের সংসারের টানাপড়েনের কারণে আজকাল বাবাকে মিথ্যাও বলতে হচ্ছে। আমার চোখ থেকে সত্যি জল গড়িয়ে পড়ল দেখে অদিতি বলল ‘কান্নার ভান করে আমার মন গলাতে চাইছেন? লাভ হবে না। যান ফিরে যান। আমার মনে এখন বাস করে শিল্পপতির ছেলে শুভ।’

এক বুক বেদনা নিয়ে অদিতিদের প্রাসাদ থেকে বের হয়ে এলাম। বাবা আমাকে মিথ্যে বলে আলী হায়দারের বাড়িতে পাঠালেন। বাবা কি একবারো বুঝলেন না অদিতিদের অবস্থান আর আমাদের অবস্থানের দীর্ঘ তফাৎ! ফকিন্নি বলে অদিতি আজ আমাকে কতই না খাটো করল। ওরা বড়লোক। মানুষকে যা তা বলতে লাজ শরম ওদের নেই। কিন্তু আমাদের আত্মসম্মান আছে। সে কারণে অদিতিকে আজ কিছুই বলিনি। নীরবে তার অপমান সয়ে চলে এসেছি। শুধু কেবল আমার আত্মসম্মানের কাছে নিজেকে ছোট করিনি বলে।

:: আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj