সোনালি আঁশের সম্ভাবনা

শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পাট চাষের শুরু থেকেই এ বছর কৃষক বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েন। সময় মতো বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষককে পাট চাষে ধান চাষের মতো সেচনির্ভর হতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ ও কৃষকের কষ্ট বেড়ে যায়। প্রতি বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে খরচ হয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। আর পাট বিক্রি করে আয় হয় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা। ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে পাটের আবাদ। বীজের নি¤œমানের কারণে অনেক সময় পাটের ফলন কম হয়।

গত মৌসুমে দেশে মোট ৬২ লাখ ১৩ হাজার বেল পাট কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ লাখ ৯ হাজার বেল কিনেছে বেসরকারি খাত। বাদবাকি ১২ লাখ ২২ হাজার বেল কিনেছে সরকারি খাত; বিজেএমসি। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। এ মৌসুমে ৬ লাখ ৯৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৬ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আবাদ কম হয়েছে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। গত বছর ৮৫ লাখ বেল পাট উৎপাদিত হয়েছিল। এবারও একই পরিমাণ উৎপাদনের আশা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। সারাদেশে বিজেএমসির মিলগুলোর পাট সরবরাহকারী এজেন্সির সংখ্যা গত বছর ছিল ৯৮টি, এবার তা কমিয়ে করা হয়েছে ৪৮টি। এতে পাটচাষিদের ভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নানা কারণে দেশে পাটের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। গত দুই বছর ধরে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার হ্রাস ও রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে পাটকলগুলোর গুদামে পড়ে আছে অবিক্রীত পাট পণ্য। এতে গভীর সংকটে পড়েছে দেশের পাট শিল্প। বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুটমিলস এসোসিয়েশন (বিজেএমএ) সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে তাদের মিলগুলোতে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে ৭০ হাজার টন পাটপণ্য, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। গত বছর এই মজুদের পরিমাণ ছিল ৪০ হাজার টন। এ বাস্তবতায় কয়েকটি বেসরকারি পাটকল ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মিলের উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। সরকারি ৯টি জুটমিলে মোটা বস্তা, পাতলা চট, কার্পেট বেকিং ক্লথ ও পাট সুতা উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত এসব পণ্য সিরিয়া, ইরাক, সুদান ও মিসরসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। বিশ্ব বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া ও নতুন বাজার সৃষ্টি করতে না পারার কারণে সরকারি এই মিলগুলোতে অবিক্রীত পণ্যের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ হাজার ৩৬৫ টনে, যার মূল্য ৩০০ কোটি টাকা। এ কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি পাট ক্রয় কেন্দ্রগুলো সময় মতো চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে কৃষক কম দামে ফড়িয়া-দালালদের কাছে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপের কারণেও পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পায়। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে দেশটি বাংলাদেশের পাট পণ্যের ওপর টনপ্রতি ৩৫২ ডলারসহ বিভিন্ন হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কারোপ করে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির মতে, পাট খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার পদক্ষেপ হিসেবে পাটপণ্যসহ বেশ কিছু পণ্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এখন বিশ্ব বাজারে বিভিন্ন ধরনের পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ফলে পাট পণ্যের রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। সোনালি আঁশের এ সম্ভাবনাকে আমাদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে।

নিতাই চন্দ্র রায়

সাবেক মহাব্যস্থাপক (কৃষি) নর্থবেঙ্গল সুগার মিলস লি. গোপালপুর, নাটোর।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj