আহমদ রফিক : জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আনিসুজ্জামান

আহমদ রফিকের সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের ঝড়ো দিনগুলোতে। তখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র, তৃতীয় বর্ষের। আমি জগন্নাথ কলেজে আইএ প্রথম বর্ষে পড়ি এবং পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের দপ্তর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করি। একুশে ও বাইশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় গুলিবর্ষণ হয়ে গেছে, মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে সরকারি দমন-পীড়নের আশঙ্কা এবং প্রতিরোধের স্পৃহা। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ স্বতঃই ভেঙে গেছে, তার নেতারা ছত্রভঙ্গ। এমন অবস্থায় আন্দোলনের দায়ভার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের কাঁধে তুলে নেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন কলেজ ছাত্র সংসদের সহসভাপতি গোলাম মওলা এবং সাধারণ সম্পাদক শরফুদ্দিন আহমেদ। কলেজের পাশে পাকা মেঝের ওপর বাঁশের তৈরি কতকগুলো ব্যারাকে ছিল ছাত্রদের হোস্টেল। তারই ২০ নম্বর ব্যারাকে প্রতিষ্ঠিত হলো আন্দোলনের কনট্রোল রুম। সেখান থেকেই সিদ্ধান্ত হয় শহীদ মিনার নির্মাণের এবং পরিচালিত হয় পরবর্তী কয়েকদিনের কর্মসূচি। সেই সময়ে যাঁদের সান্নিধ্যে আসি, তার মধ্যে ছিলেন মনজুর হোসেন, কবিরউদ্দিন আহমদ, ওয়ালীউল্লাহ, আবদুস সালাম (পরে এঁরা তিনজনই ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হয়েছিলেন), সাঈদ হায়দার ও আহমদ রফিক। তখন আহমদ রফিকের সঙ্গেই বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও অপার স্নেহে তিনি আমাকে অনুজের মতো গ্রহণ করেছিলেন। তখনই তিনি বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন এবং সেইসঙ্গে অচিরেই হয়ে ওঠেন সাহিত্যসেবী।

পরবর্তীকালে ডাক্তারি পাস করলেও তিনি চিকিৎসা পেশায় যাননি, একটি ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। রাজনীতিতেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেননি, তবে মার্কসবাদে তাঁর আস্থা রয়ে গেছে অবিচল এবং তাঁর সৃষ্টিশীল কর্মেও মার্কসবাদী চেতনার প্রতিফলন আছে। অন্যদিকে সাহিত্যকর্ম শুধু ধরেই রাখেননি, এটিই হয়ে দাঁড়ায় তাঁর সর্বক্ষণের কাজ। তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি তাঁকে দিয়েছে প্রবন্ধ-গবেষণায় পুরস্কার, শিশু একাডেমি দিয়েছে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ রাষ্ট্র দিয়েছে একুশে পদক এবং কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট দিয়েছে রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য উপাধি।

আহমদ রফিক কবিতা লিখেছেন, ছোটগল্প লিখেছেন, প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী রচনা লিখেছেন। এই শেষ ক্ষেত্রেই তাঁর সাফল্য সবচেয়ে বেশি। তিনি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে লিখেছেন, লিখেছেন বাংলা কবিতার আধুনিক ধারা সম্বন্ধে; ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও স্মৃতিকথা লিখেছেন, লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়তাবোধ বিষয়ে; চিত্রকলা বিষয়ে লিখেছেন, বিজ্ঞান বিশেষত চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে লিখেছেন ও অনুবাদ করেছেন। এত বিষয়ে বলার ক্ষমতা রাখেন, এমন মানুষ কোনো দেশেই সুলভ নন। তবে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ও ভাবনা, মনে হয় সবচেয়ে বেশি। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এত সংখ্যক এবং এত বিচিত্রমুখী রচনা বাংলাদেশে কেউ লেখেননি।

আহমদ রফিকের ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ আছেন সমগ্রভাবেই। তবে তিনি বিশেষভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন উনিশ শতকের শেষ দশকে পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্রনাথের অবস্থানকালের দিকে। জমিদার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রজাদের সম্পর্ক এবং পল্লী উন্নয়ন আর কৃষি ও কৃষকের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনার বিশদ পরিচয় তিনি দিয়েছেন, বিশেষ করে, রবীন্দ্রভুবনে পতিসর (১৯৯৮) ও রবীন্দ্রভাবনায় গ্রাম : কৃষি ও কৃষক (২০০২) বই দুটিতে। পূর্ব বাংলার অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের পরিচয় তিনি তুলে ধরেছেন পদ্মাপারের রবীন্দ্রগল্প (১৯৮৭) বইতে (এ যে রবীন্দ্রনাথকে খণ্ডিতভাবে দেখা নয়, তার বাহ্য প্রমাণ পাওয়া যাবে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের সময়ে বিশ্বভারতী-প্রকাশিত পূর্ব বাংলার গল্প নামের সংকলনে)। এর বাইরে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও কর্ম সম্পর্কে আহমদ রফিকের আলোচনা পাই রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ (১৯৮৭) এবং রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প (১৯৯৬) বইতে। রবীন্দ্রনাথ যে বাংলাদেশের জন্য আজো প্রাসঙ্গিক, তিনি তা প্রতিপন্ন করেছেন।

আহমদ রফিক এত প্রচুর লিখেছেন যে তাঁর রচনাসকল আমার পড়া হয়নি। সামগ্রিকভাবে তাঁর পরিচয় তুলে ধরা তাই আমার পক্ষে অসাধ্য। আমি কেবল তাঁর রচনার মাত্র একটি দিকের রেখাচিত্র দিয়ে এই মনীষীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। তাঁর নিরলঙ্কৃত গদ্য এবং নৈয়ায়িক শৃঙ্খলার পরিচয় পেতে হলে পাঠককে মূল বই পড়তে হবে। আহমদ রফিকের ৯১তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি । দীর্ঘতর হোক তাঁর জীবন, পূর্ণতর হোক তাঁর সাধনা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj