ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক : এক অনন্য বাঙালি মনীষা

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এম আর মাহবুব

আহমদ রফিক। সংগ্রামে, সৃজনে ও মননে এক অনন্য বাঙালি মনীষা। তাঁর সৃষ্টিজগৎ বিশাল এবং বহুমাত্রিক। বাল্যকাল থেকেই রাজনীতি ও সাহিত্যচর্চা শুরু। মুক্ত ও প্রগতিশীল চেতনার ধারক ও বাহক হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম ও খাঁটি বাঙালিত্ব অর্জনের সাধনাই ছিল তাঁর একমাত্র ব্রত ও আজন্ম স্বপ্ন। জীবন সায়াহ্নে এসে আজো মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। অর্থ, ক্ষমতা, লোভ-লালসার প্রতি বরাবরই ছিলেন নির্মোহ। মানবকল্যাণ ও সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ আহমদ রফিক রাজনীতি শুরু করেছিলেন স্কুলজীবনে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনে যোগদানের মাধ্যমে। ষাটের দশকে এসে রাজনীতি থেকে বিদায় নিলেও তিনি কখনো রাজনীতিবিমুখ হননি বরং আজো তাঁর জীবনের অন্যতম অবলম্বন রাজনীতি ও সমাজ ভাবনা।

নীতিহীন রাজনীতির বিরুদ্ধে সারা জীবনই সোচ্চার ছিল তাঁর কণ্ঠ ও কলম। সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম তথা রাজনৈতিক কারণে বহুবার বিপর্যস্ত ও বিপন্ন হয়েছে তাঁর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবন। প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি যে ত্যাগ ও সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।

রাজনীতির বাইরে লেখালেখি ও সাহিত্যচর্চাকে জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছেন। মেধাবী চিকিৎসক হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেননি। মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ করার চেয়ে জাতির মনের রোগ প্রতিরোধ করতেই তিনি বদ্ধপরিকর। নিরন্তর লেখালেখির মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। পেশাগতভাবে ওষুধ ও শিল্প ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত থাকলেও সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মনন চর্চাতেই তিনি ব্যাপৃত ছিলেন আজীবন। আজো পুরোপুরিভাবে সাহিত্যকর্মে সক্রিয় আছেন।

রবীন্দ্র গবেষণা, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষণা এবং সাহিত্য গবেষণায় আহমদ রফিকের তুলনা আহমদ রফিক নিজেই। আলোচ্য বিষয়গুলো নিয়ে তিনি এত বিশাল, ব্যাপক, পূর্ণাঙ্গ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণা করেছেন যা বাংলাদেশের গবেষণা জগতের ইতিহাসে এক অনন্য ও বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রাবন্ধিক, কবি ও কলামিস্ট হিসেবেও তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন। তাঁর সৃষ্টিসম্ভার বিশেষত রবীন্দ্র গবেষণা ও মননশীল গদ্য রচনা সমগ্র বাংলা সাহিত্যে আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। বিষয়বৈচিত্র্য ও গভীরতার দিক থেকে প্রবন্ধ সাহিত্যে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তিনি যেসব গ্রন্থ রচনা করেছেন সেগুলো পাঠ করলেই আমার উপর্যুক্ত বক্তব্যের যথার্থতা প্রমাণিত হবে।

আহমদ রফিককে চিনতে এবং বুঝতে হলে তাঁর জীবনব্যাপী সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম, সৃজনশীল ও গবেষণাধর্মী রচনা এবং গ্রন্থপঞ্জির সাথে পরিচিতি একান্ত আবশ্যক। তাঁর প্রথম রচনা দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্য বিষয়ক একটি প্রবন্ধ। স্কুলে পড়ার সময় তিনি এ প্রবন্ধটি লিখে দেশ পত্রিকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘শিল্প সংস্কৃতি জীবন’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। বর্তমানে তাঁর রচিত ও সম্পাদিত পুস্তকের সংখ্যা প্রায় ১০০। আরো বেশ কিছু গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।

সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, রাজনীতিসহ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আহমদ রফিকের প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা বাংলা ও বাঙালির জীবনের অনন্য সম্পদ। তাঁর মূল্যবান ও উচ্চমানসম্পন্ন রচনাবলি বাংলা ভাষীদের কাছে অবিনশ্বর হয়ে থাকবে।

বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক তিনি। একুশের অমর শহীদদের স্মরণে ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের এক রাতের যৌথ শ্রমে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারেরও তিনি অন্যতম স্থপতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি রয়েছে তাঁর অগাধ বিশ্বাস। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন এবং একুশের স্মৃতি রক্ষা আন্দোলনেরও তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৭৬ সালে তাঁরই উদ্যোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজে সর্বপ্রথম গঠিত হয় ‘একুশে পরিষদ’ এবং ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর’। তাঁরই সক্রিয় উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় ১৯৮৬ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশে রবীন্দ্র বিষয়ক গবেষণার প্রথম প্রতিষ্ঠান ‘রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র ট্রাস্ট’। সম্প্রতি তিনি গড়ে তুলেছেন ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার পীঠস্থান ‘ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র’। বর্তমানে তিনি একুশে চেতনা পরিষদ, শওকত ওসমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত।

আহমদ রফিক একাধারে একজন দক্ষ সংগঠক এবং অপরদিকে তিনি তাত্তি¡ক, গবেষক, লেখক ও বহুগ্রন্থ প্রণেতা। একজন মানুষের মধ্যে সাধারণত এত গুণের সমাবেশ ঘটে না, আহমদ রফিক এদিক থেকে ব্যতিক্রম। দলীয় রাজনীতির সমর্থক না হয়েও এবং বর্তমানে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন শুধু তাঁর মেধা, মনন, অক্লান্ত শ্রম ও যোগ্যতার বলে। প্রচারবিমুখ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পরিচিতি সীমিত পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়াও দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। সাহিত্য ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৫ সালে একুশে পদক, রবীন্দ্র বিষয়ক গবেষণার জন্য ২০১১ সালে বাংলা একাডেমি কর্তৃক রবীন্দ্র পুরস্কার (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক প্রদত্ত) লাভ করেন। ২০১২ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন আহমদ রফিকের নামে ঢাকা শহরে একটি সড়কের নামকরণ করে। সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি অসংখ্য সম্মাননা, সংবর্ধনা ও স্বর্ণপদক লাভ করেন। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভও তাঁকে গৌরবদীপ্ত করেছে। কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে পেয়েছেন ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি (১৯৮৭)। ভারতের ত্রিপুরা সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর কর্তৃক পেয়েছেন সম্মাননা ও সংবর্ধনা। তাঁর মেধা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কারে ভূষিত করার জন্য সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj