ইন্টেরিয়র

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সাদিকুল নিয়োগী পন্নী

তোর অধিকাংশ বন্ধুরা বিসিএস দিচ্ছে। অনেকেই ভালো ভালো চাকরি করছে। আবার কেউ কেউ চাকরি নিয়ে বিদেশ যাচ্ছে। তুই সারাদিন রুমে বসে কি সব আঁকাআঁকি করিস। এভাবে জীবন চলবে?

বুয়েট থেকে আর্কিটেকচার বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করা ইরফানকে বলছিলেন তার মা আয়েশা বেগম।

ইরফান বলল, মা আমার পক্ষে চাকরি করা সম্ভব না। আমি নিজেই একটা ফার্ম দিবো। তোমার ইঞ্জিনিয়ার ছেলে বেকার থাকবে না। আমাকে নিয়ে তোমার এত চিন্তা করতে হবে না।

তোর বাবা নেই। কতো কষ্ট করে তোকে পড়াশুনা করিয়েছি। এখন যদি ভালো কিছু না করতে পারিস আমার সব প্ররিশ্রম বৃথা যাবে।

আমি বললাম তো ভালো কিছুই করবো। তোমার এই ছেলে বসে থাকার মানুষ না। দেখবে আমার এখানেই অনেকে চাকরি করবে। একটু সময় দাও আমাকে।

তোর যা ভালো মনে হয় তাই কর বাবা। এখন বড় হয়েছিস নিজের ভালো-মন্দ নিজেই বুঝিস।

ইরফান মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার ছেলে বখে যায়নি। তুমি দেখবে সারা দেশে তোমার ছেলের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে। তখন তোমার মনে আর কোনো কষ্ট থাকবে না।

আর ঢং করতে হবে না। খাবার দিচ্ছি। খেতে আস বলে চলে গেলেন আয়েশা বেগম।

দুই.

এমবিএ শেষ হলো গত মাসে। আত্মীয়স্বজনরা বিয়ের কথা বলছে। তুমিও কোনো চাকরি-বাকরির চেষ্টা করছো না। বাসার মানুষকে কতোদিন আর আটকে রাখবো। বিকেলে টিএসসিতে বসে দৃষ্টি এসব কথা বলছিল ইরফানকে।

ইরফান বলল, মেয়ে বড় হলেই বিয়ে দিতে হবে। ঘরের মানুষের চিন্তা না থাকলেও পরের মানুষগুলো অস্থির হয়ে পড়ে। মনে হয় বিয়েই সব সমস্যার সমাধান। সমাজের এই একটা সমস্যা যতদিন দূর না হবে ততদিন মেয়েরা এগিয়ে যেতে পারবে না।

তোমার জ্ঞানী কথা রাখো। পড়েছো ইঞ্জিনিয়ারিং, কথা বলছো দার্শনিকের মতো। দৃষ্টি রাগান্বিত হয়ে ইরফানকে বলল।

রাগ করো না দৃষ্টি। আমি বাস্তববাদী মানুষ। যারা আজকাল তোমার বিয়ে নিয়ে অস্থিরতা দেখাচ্ছে তারা কাল তোমার সংসারে কোনো সমস্যা হলে দেখেও না দেখার ভান করবে। তখন বলবে পড়াশুনা করে মেয়েটা চাকরি না নিয়ে বিয়ে করতে গেল কেন।

পাকা পাকা কথা বলছো কিন্তু নিজেও তো চাকরির জন্য কোনো চেষ্টা করছো না। তোমার অপেক্ষায় থাকলে তো না খেয়ে মরতে হবে।

শোন রাগারাগি করে কোনো লাভ নেই। সমাধানের রাস্তা দুজনকে মিলেই করতে হবে।

চাকরি ছাড়া সমাধানটা কীভাবে? জানতে চাইল দৃষ্টি।

ইরফান বলল, আমরা দুজনে মিলে আর্কিটেকের একটা ফার্ম দিবো। তুমি মার্কেটিং সাইডটা দেখবে। বাকিগুলো আমি সামলাবো। ব্যবসার উন্নতি হলে সহযোগিতার জন্য লোকজন নিবো। তবে শুরুতে দুজনের একটু কষ্ট করতে হবে।

তোমার পেন্সিল কেনার টাকা নেই। ফার্মের চিন্তা করো। দৃষ্টি হাসতে হাসতে বলল ইরফানকে।

আমি সিরিয়াসলি বলছি। তুমি বিষয়টাকে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছ। ইচ্ছা আর পরিশ্রমের মানসিকতা থাকলে টাকা পয়সা কোনো ব্যাপার না। তুমি আমার সাথে থাকবে কিনা সেটা বলো।

আছি তো পাঁচ বছর ধরেই। এখন আর যাবার পথ কোথায়? কাটাতে পারলে কবেই তো চলে যেতাম।

আবেগী কথা বাদ দাও। আমি কোনো মজা করছি না। সামনের সপ্তাহেই আমরা কাজ শুরু করতে চাই।

গাছের নিচে বসে আর্কিটেকের কাজ করবা নাকি। পাশে সাইনবোর্ডে ঝুলানো থাকবে বুয়েট পাস করা আর্কিটেক্টকে দিয়ে কম খরচে ইন্টেরিয়রের কাজ করানো হয়।

ধুরু, তুমি এখনো ফাজলামি করছো। আমি কিন্তু সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলছি। শোন, অফিস ভাড়া নেয়ার মতো আমার কাছে টাকা নেই সেটা ঠিক। কিন্তু শুধুমাত্র অফিসের জন্য আমি বসে থাকতে চাই না। আমার পড়ার রুমই হবে অফিস। প্রাথমিকভাবে টুকটাক কাজকর্ম সেখান থেকে করবো। পরে টাকা পয়সা হলে বাইরে অফিস ভাড়া নেয়া যাবে।

দৃষ্টি বলল, তুমি যদি সিরিয়াস কাজ করতে চাও তাহলে আছি। তবে তোমার মতো খামখেয়ালিপনা মানুষকে বিশ^াস করা কঠিন।

চলো নীলক্ষেত যাই। আজকেই কিছু লিফলেট ও ভিজিটিং কার্ড ছাপাবো। আমি চাই আজ এখান থেকেই আমাদের কাজের যাত্রা শুরু হোক। বলল, ইরফান।

আমার কোনো আপত্তি নেই। চলো তাহলে।

দৃষ্টি ও ইরফান নীলক্ষেত গিয়ে হ্যান্ডবিল এবং ভিজিটিং কার্ডের অর্ডার দিল।

তিন.

ইরফান সকাল থেকে ব্যস্ত তার পড়ার রুম গোছানো নিয়ে। টেবিলের সব বইপত্র সে একটা সেলফে সাজিয়ে রাখলো। ড্রয়িং রুম থেকে চেয়ার-টেবিল এনে রাখলো তার রুমে। সকাল থেকে ইরফানের কর্মব্যস্ততা দেখে মা বললেন, আমি তো কিছুই বুঝতেছি না বাবা। তুই আসলে কী করতে চাচ্ছিস?

ইরফান হেসে বলল, তুমি শুধু দোয়া করো মা। দেখবে অল্প সময়ের মধ্যেই আমি সফল হবো।

ইরফানের মা আয়েশা বেগমও তাকে সহযোগিতা করছেন। সন্তান কোনো কাজ করলে কোনো মা বসে থাকতে পারেন না। নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি ছেলের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।

দুপুরের মধ্যে মা-ছেলে মিলে রুম গোছগাছ করলো। তারপর দুজনেই গোসল করে খাবার খেতে বসলো।

আয়েশা বেগম বললেন, এই যে এত বড় একটা কাজের পরিকল্পনা করছিস। তুই একা সব সামলাতে পারবি?

তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না মা। আমি চিন্তা করেই কাজে নেমেছি। দৃষ্টি নামে আমার এক বান্ধবীর কথা তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম। সেও আমার পার্টনার হিসেবে থাকবে। দুজনে মিলে প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করবো।

দৃষ্টি মেয়েটা বেশ ভালো। দোয়া করি বাবা তোরা সফল হ।

খাওয়াদাওয়া শেষে মা সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ইরফান তার নতুন অফিস রুমে বসে আর্ট পেপারে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন করছে।

এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। ইরফান দরজা খুলল।

এই সময়ে তুমি।

দৃষ্টি রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, নীলক্ষেতে একটা কাজে গিয়েছিলাম। ভাবলাম আমাদের অর্ডারের জিনিসগুলোর একটু খবর নেই। সব রেডি হয়ে গেছে দেখে নিয়ে আসলাম।

ইরফান হ্যান্ডবিল এবং ভিজিটিং কার্ডগুলো দৃষ্টির কাছ থেকে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখলো। তারপর বলল, কেমন হলো অফিস?

দৃষ্টি এদিক তাকিয়ে বলল, আমার ধারণার চেয়েও সুন্দর হয়েছে। এখন বুঝতে পেরেছি আসলেই তুমি বেশ সিরিয়াস।

তুমি তো সারাজীবন আমাকে অবহেলার দৃষ্টিতেই দেখে গেলা। যখন যা বলেছি কোনোটাই সিরিয়াস হিসেবে নাওনি।

তুমি কি এখন আমার সাথে ঝগড়া করবে?

ইরফান বলল, ঠিক আছে বাবা। এত রাগো কেন? একটু ফানও করতে পারবো না। শোন, কাজের কথা বলি।

হ্যাঁ, বল।

এখন আমাদের প্রথম কাজ হবে ছোটখাটো অফিসের কাজ নেয়া। তুমি আজ থেকেই মার্কেটিংয়ে বেরিয়ে পড়। আমি বিভিন্ন শপিংমল এবং হাউজিং কোম্পানিতে হ্যান্ডবিল এবং ভিজিটিং কার্ডগুলো পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। আশা করি সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই কাজ পেয়ে যাবো।

বুঝলাম তোমার প্ল্যান। আমার অন্য কাজ আছে। তুমি আরো চিন্তা করো কীভাবে কী করা যাবে। আজ তাহলে আমি আসি। বলল দৃষ্টি।

তুমি তো দেখছি পুরোপুরি বিজনেসম্যানের মতো আচরণ করছো। কাজের বাইরে একটু ভালোমন্দ কিছু জানতেও যাচ্ছ না।

অফিসে বসে কোনো প্রেমের আলোচনা চলবে না মশাই। যে অফিসে প্রেম হয় সে অফিসের কাজের চেয়ে অকাজ বেশি হয়। আমি অফিসে আসলে মনে করবা জাস্ট একজন বিজনেস পার্টনার এসেছে। তাহলে কাজের মনোযোগ নষ্ট হবে না। আশা করি বিষয়টা বুঝতে পেরেছো। বলল, দৃষ্টি।

ঠিক আছে ম্যাডাম। তবে আমার দিকে আপনার সুদৃষ্টি যেন সব সময় অক্ষুণœ থাকে।

আর ঢং করতে হবে না। আমি গেলাম। তুমি তোমার পরিচিত জায়গাগুলোতে কাজের জন্য নক দাও।

ইরফান বলল, অবশ্যই। তুমি চিন্তা করো না। আমরা ভালো করবো।

কয়েকটা হ্যান্ডবিল এবং ভিজিটিং কার্ড নিয়ে চলে গেল দৃষ্টি। ইরফানও ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজ কাজে।

চার.

প্রথম সপ্তাহে ছোট একটা অফিসের ইন্টেরিয়রের কাজ পেল ইরফান। সফলভাবে কাজটি শেষ হওয়ার পর বেশ কিছু টাকা আয়ও হলো তাদের। দিন দিন তাদের কাজের পরিধি বেড়ে যাচ্ছে। অফিসের পাশাপাশি বিভিন্ন বাসাবাড়ির কাজও আসছে। দৃষ্টি নিয়মিত সকালে ইরফানের বাসার অফিসে আসে। একদিন দৃষ্টি বলল, ইরফান আমাদের বাইরে কোথাও অফিস নেয়া প্রয়োজন। ছোট অফিসে এত কাজ করা যায় না। তা ছাড়া লোকজনও নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। দুজনে সব কাজ করলে কাজের মান কমে যাবে।

ইরফান বলল, আমিও তাই ভাবছিলাম। আর কয়েকজন স্টাফও নেয়ার কথা তোমাকে বেশ কয়েকবার বলতেও চেয়েছিলাম। দুজনে সব দিক সামাল দেয়া কষ্টকর হয়ে পড়ছে।

মগবাজারের দিকে একটা অফিস নেয়া যেতে পারে। আর স্টাফ নেয়ার জন্য পত্রিকায় একটা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাও। বলল দৃষ্টি।

ঠিক আছে। আজ বিকালে দুজনে অফিস দেখতে বের হবো। তখন ওই দিকের কোনো পত্রিকা অফিসে বিজ্ঞাপন দিয়ে আসবো।

হঠাৎ কিছু সময়ের জন্য চুপ হয়ে গেলো দৃষ্টি। মায়াভরা চোখে সে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলল, ইরফান আর কতো বছর আমরা এভাবে চলবো? বয়স তো দুজনেরই বেড়ে চলছে। তা ছাড়া এখন সংসার চালানোর মতো আমাদের সামর্থ্যও হয়েছে। তুমি তো বিয়ের ব্যাপারে সব সময় উদাসীন।

ইরফান বলল, দৃষ্টি সংসার আর ব্যবসা একসাথে হয় না। আগে ব্যবসাটা প্রতিষ্ঠিত হোক তখন বিয়ের কথা ভাবা যাবে। দুজন সকাল থেকে দৌড়ের ওপর থাকি। সংসার করলে দুদিন পর হয়তো বাচ্চা আসবে। তখন তাকে নিয়ে আরেক ঝামেলা। আগে নিজেরা প্রতিষ্ঠিত হই। তারপর পরবর্তী প্রজন্মকে পৃথিবীতে আনার ব্যবস্থা করবো। আর আমরা তো কোনো অংশে খারাপ নেই।

তারপরও বিষয়টা গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত। হয়তো এক সময় আমাদের সব হবে। কিন্তু সংসারের স্বপ্নটা অধরাই রয়ে যাবে। বলল দৃষ্টি।

ইরফান বলল, সংসার নিয়ে আরেকদিন আলোচনায় বসবো ম্যাডাম। আপনি এবার কাজে বের হন। আমাকেও কাজ করতে দেন।

পাঁচ.

মগবাজারের একটা তিন রুমের ফ্ল্যাট নিয়ে তাতে অফিস বানিয়েছে ইরফান ও দৃষ্টি। নাম দেয়া হলো ‘দৃষ্টি এন্ড ইরফান ইন্টেরিয়র’। অফিসে সাত-আটজন স্টাফও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। কাজ চলছে পুরোদমে। সকালে অফিসে এসেই টুকটাক কাজ করে দৃষ্টি বেরিয়ে পড়ে মার্কেটিংয়ে। আর ইরফান লোকজন নিয়ে চলে যায় অফিস, বাড়িতে ইন্টেরিয়রের কাজ করতে। পরিচিত-অপরিচিত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন অনেকের বাসাবাড়ি এবং অফিসের কাজ তারা দুজন করে যাচ্ছে নিপুণভাবে। ঢাকা শহরে তাদের ফার্মের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। যাতায়াতের সুবিধার জন্য নিজেরা একটা গাড়িও কিনেছে। কয়েক বছরের মধ্যে নিজেদের কেনা ফ্ল্যাটে অফিস স্থানান্তর করা হয়। কাজের পরিমাণ এত বেড়েছে যে দৃষ্টি আর ইরফান নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো কথা বলার সময়ও পাচ্ছে না।

ছয়.

ইরফান বলো তো আজ কেন তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি? দৃষ্টি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসিতে গিয়ে ইরফানের কাছে জানতে চাইলো।

এখানে তো আমরা প্রায় সময়ই আসি।

আজ একটা বিশেষ কারণ আছে। দেখি তোমার মনে আছে কিনা।

আমার এত কিছু মনে থাকে না। বলো না তুমি কারণটা কী।

ইরফানের পাশে বসে দৃষ্টি বলল, আজ থেকে প্রায় পনেরো বছর আগে এখানে বসে আমরা ব্যবসার পরিকল্পনা করেছিলাম।

বলো কী? এত বছর হয়ে গেল। কিছুই তো টের পেলাম না। মনে হচ্ছে সেদিনের কথা।

সময় এভাবেই চলে যায়। চাইলেই তো আর সময়কে ধরে রাখা যায় না। বলল দৃষ্টি।

দৃষ্টি, এই জায়গাটার কিন্তু আরেকটা বিশেষত্ব আছে। আমি বেশিভাগ সময় ক্লাস শেষে এখানে চলে আসতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এখানে সময় কাটিয়েছি। কাজের ব্যস্ততার কারণে আজ সব কেমন জানি পানসে হয়ে গেছে। বলল ইরফান।

তুমি আমাকে এখান থেকে বকুল ফুলের মালা কিনে দিয়েছিলে। আমি সে মালা শুকিয়ে পড়ার পরও খোঁপায় পরে ক্যাম্পাসে যেতাম। বন্ধু-বান্ধবীরা হাসাহাসি করতো। কিন্তু আমি খোঁপা থেকে সে মালা খুলতাম না।

দুই টাকার বাদাম কেনার আগেও পকেটে হাত দিয়ে দেখতাম টাকা আছে কিনা। টাকার জন্য ইচ্ছে থাকার পরও কত কিছু করতে পারিনি দুজনে। বলল ইরফান।

তুমি তো দুই টাকার বাদাম দিয়ে দুই বছর পার করে দিতা। একটু রসাত্মক ভঙ্গিতে বলল দৃষ্টি।

দুই টাকার বাদামের মধ্যে দুটো বাদামও তো আপার কপালে জুটতো না। খোসা ছাড়ানোর আগেই তুমি হাঁ করে থাকতে কখন মুখে দিবে।

এই বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু। এই বলে দৃষ্টি ইরফানের পিঠে দুই-তিনটা চড় দিল।

এই ব্যথা পাচ্ছি কিন্তু। বাবারে…

এমন সময় ইরফানের বন্ধু সাজ্জাদ তার পরিবারসহ এদিক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। ইরফানকে দেখে সে থামল। কিরে বন্ধু এই বয়সেও তো তোদের রোমান্টিকতার কোনো কমতি দেখছি না। দেখে মনে হচ্ছে টিনএজ প্রেম।

হা হা হা। অফিসে মারামারির সুযোগ পায় না তো। তাই বাইরেই মনের ঝাল মিটিয়ে নিচ্ছে। বলল ইরফান।

তোদের এই ছেলেমি দেখে ভালো লাগছে। বলল সাজ্জাদ।

ইরফান বলল, বাদ দে এসব কথা। তোর খবর কী বল। আর হঠাৎ এই দিকে আসলি কী মনে করে?

আর বলিস না। বাসায় থাকতে থাকতে সবাই অস্থির হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই ভাবলাম বউ-বাচ্চা নিয়ে একটু ঘুরে আসি।

ভালোই করেছিস।

আরে আমিতো কারো সাথে তোদের পরিচয় করিয়ে দেইনি। এই হলো আমার স্ত্রী মিলি। আর মেয়ে ইসফা।

মিলি সালাম দিয়ে কুশলাদি বিনিময় করলো।

ইরফান বলল, তোর মেয়ে তো অনেক কিউট হয়েছে।

আর বলিস না। যা দুষ্টু হয়েছে। বলল সাজ্জাদ।

হা হা হা…। এই বয়সে তো একটু দুষ্টুমি করবেই। এখন থেকে আরো বেশি করে দুষ্টুমি করবে মা মণি।

সাজ্জাদ বলল, ইরফান তোর ইন্টেরিয়রের প্রশংসায় তো সবাই পঞ্চমুখ। এত সুন্দর ঘর সাজাতে পারবি আমি নিজেও ভাবিনি। আমার শ^শুরবাড়ির লোকজন হয়তো এই ঘর দেখেই মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল।

সবকিছুতেই ঠাট্টা করিস।

আসলেই ভাইয়া আপনার হাতের কাজ অনেক সুন্দর। আমার বান্ধবীরাও খুব প্রশংসা করেছে। বলল মিলি।

ধন্যবাদ ভাবী। আমি ঘর সাজাই। আর মানুষ সে ঘরে সুন্দরী বউ নিয়ে থাকে। বলল ইরফান।

তুই সারা জীবন অন্যের ঘরই সাজিয়ে যাবি। এবার নিজের ঘরের দিকে একটু নজর দে। বয়সও তো আর কম হয়নি। আর কত দেরি করবি।

দেখি বন্ধু কী করা যায়। বলল ইরফান।

ভালো থাকিস। এই বলে সাজ্জাদ তার পরিবার নিয়ে চলে গেল।

সাজ্জদের কথাগুলো দৃষ্টি আর ইরফানের বুকে তীরের মতো আঘাত করলো। ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার করে দুজনের বয়স এখন চল্লিশ ছুঁই ছুঁই।

ইরফান ভাবছে, সত্যিই তো কতজনের ঘর সাজিয়ে দিলাম। শুধু নিজের ঘরের দিকে কখনো খেয়াল করিনি। সময়মতো বিয়ে করলে সাজ্জাদের মতো তার সংসার থাকতো। হয়তো বউ সন্তান নিয়ে সেও এভাবে ঘুরতে বেড়াতো। দৃষ্টির সাথে গন্তব্যহীন এই চলা আর কতো দিন।

ইরফান হঠাৎ কাতর কণ্ঠে বলল, আমাদের কি আর সংসার করা হবে না দৃষ্টি!

তোমার এই প্রশ্নটা আরও অনেক আগে করার প্রয়োজন ছিল। জীবনের প্রায় শেষ বিকেলে এসে এমন প্রশ্নে আমি কী উত্তর দিবো বলো?

ইরফান আর দৃষ্টি চুপচাপ বসে আছে। বিকেলের সূর্য অস্ত গিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। রাস্তার ল্যাম্প পোস্টগুলো জ¦লে উঠেছে। কর্মব্যস্ত মানুষগুলো ব্যস্ত হয়ে বাড়ি ফিরছে। অধিকাংশ মানুষের জন্য বাসায় হয়তো কেউ না কেউ অপেক্ষা করছে। শুধু তাড়া নেই ইরফান আর দৃষ্টির। কারণ দীর্ঘ বছর একসাথে কাজ করলেও তাদের দুজনের গন্তব্য এখনো দুদিকে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj