আসক্তিই যখন ইন্টারনেট!

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ডা. মুনতাসীর মারুফ

ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে। শুধু কম্পিউটার থেকেই নয়, মোবাইল থেকেও সহজেই ব্যবহার করা যাচ্ছে ইন্টারনেট। সপ্তাহের সাত দিনই, দিনের চব্বিশ ঘণ্টাই ইন্টারনেট তার দ্বার খুলে রেখেছে। মানুষ ভার্চুয়াল মহাসড়কে উঠে যেখানে মন চায় যেতে পারছে, সেখানে যা করা সম্ভব করতে পারছে বিনা বাধায়। তথ্যের অবাধ আদান-প্রদান, নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, বিষয়-বৈচিত্র্য তো রয়েছেই। কাজের পাশাপাশি অকাজে বা বিনা কাজেও নেটে থাকছে মানুষ। একটা সময় ব্যবহারের মাত্রা বাড়তে বাড়তে তা চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে।

আসক্তরা সাধারণত প্রথমে বুঝতে পারেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে তিনি আসক্ত। আশপাশের মানুষরা টের পায়। আসক্ত ব্যক্তি প্রায় প্রতিদিনই ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। ইন্টারনেটে বসার পর সময়জ্ঞান থাকে না আর- কখন ঘণ্টা পেরিয়ে যায়! ভার্চুয়াল জগতে থাকাকালীন বাস্তবের কেউ যদি সেই সময়ে ভাগ বসায়, ধরুন, পরিবারের কেউ কথা বলতে আসেন বা মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে, তাহলে আসক্ত ব্যক্তির মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ওঠে। অন-লাইনে সময় কাটানোর কারণে অফিসের কাজে দেরি হয়, পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাতে সময়মতো উপস্থিত হওয়া যায় না। বাজার করা, লন্ড্রিতে কাপড় দেয়ার মতো বাসার দৈনন্দিন কাজেও অবহেলা শুরু হয়। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে ব্যক্তির উপস্থিতি কমতে থাকে, পাশের বাড়ির বন্ধুটির সঙ্গে বিকালে আর বাইরে বের হওয়া হয় না, ব্যক্তি ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে বাস্তব সমাজ থেকে। ওদিকে ফেসবুক, টুইটার, মাইস্পেসের মতো অন্তর্জালিক সামাজিক ওয়েবসাইটগুলোতে তার সরব পদচারণা; ‘অন-লাইন’ বন্ধুরাই হয়ে ওঠে প্রিয় সঙ্গী। বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারলেও অনেকেই এ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। ‘কতক্ষণ নেটে ছিলে?’ এমন প্রশ্নের উত্তরে সময় কমিয়ে বলেন বা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন।

ইন্টারনেটে এই বাড়াবাড়ি রকমের সময়ক্ষেপণকে এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন- ‘আসক্তি’। অ্যাডিকশন (অফফরপঃরড়হ) বা আসক্তি একটি ব্যাধি। ইন্টারনেটের কারণে ব্যক্তির এই পরিবর্তন কি ব্যাধি? আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অনেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানীর মতে, তা-ই। ‘আসক্তি’ আমরা তখন বলি, যখন মানুষ কোনো কিছুতে, তা ভালো-মন্দ যা-ই হোক, অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে অর্থাৎ কোনো কিছুর প্রতি ‘ডিপেনডেন্স’ (উবঢ়বহফবহপব) তৈরি হয়। একই সঙ্গে তৈরি হয় টলারেন্স (ঞড়ষবৎধহপব), অর্থাৎ একই সমান তৃপ্তির জন্য ধীরে ধীরে ঐ ‘কিছু’র পরিমাণ বাড়াতে হয়। এবং সেই ‘কিছু’র প্রতি এই ‘ডিপেনডেন্স’ এবং ‘টলারেন্স’ যখন মানুষের জীবনের নানাক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলতে থাকে। যেমন- আমরা বলে থাকি মাদকাসক্তির কথা। একই ঘটনা আমরা দেখতে পাই ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও। ইন্টারনেট-আসক্তদেরও তৈরি হয় ‘টলারেন্স’। প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়তে থাকে ইন্টারনেটে কাটানো সময়ের পরিমাণ। মানসিকভাবে এর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তারা। বেশিক্ষণ অফ-লাইন থাকলে তাদের মাঝে অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, খিটখিটে মেজাজসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। মাদকাসক্তদের যেমন কয়েক ঘণ্টা মাদক না নিলে দেখা দেয় শারীরিক-মানসিক নানা উপসর্গ বা ‘উইথড্রল সিম্পটম’- চলতি বাংলায় আসক্তরা যাকে বলে ‘ব্যাড়া ওঠা’। মাদক আবার গ্রহণ করলেই যেমন উইথড্রল সিম্পটম চলে যায়, ইন্টারনেট-আসক্তরা আবার অন-লাইন হলেই স্বস্তি বোধ করেন।

ইন্টারনেট-আসক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের ফ্রেমে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। দৈনিক ‘এত’ ঘণ্টার বেশি অন-লাইন থাকলে তা আসক্তি এরকমটা বলা যাবে না। কারো কারো ক্ষেত্রে নেট তাদের কাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে কেউ কেউ কাজের প্রয়োজন ছাড়াই বা কাজ ফেলে রেখে নেট-সার্ফিং করতে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিষণœতা, উদ্বেগ, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার প্রভৃতি রোগে ভোগেন তাদের আসক্ত হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। একাকিত্ব, অসুখী দাম্পত্য, পেশাগত চাপ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, কর্মহীনতা, শারীরিক আকৃতি নিয়ে হীনমন্যতা, আত্মবিশ্বাসের অভাবও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীকে আসক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। অনেকে অন্য আসক্তি, যেমন মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত হতে গিয়ে ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়ে। বয়ঃসন্ধির কিশোর-কিশোরী এমনকি শিশুদেরও এই আসক্তির ঝুঁকি রয়েছে। যারা বাবা-মার তত্ত্বাবধান ছাড়া অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ পায়, তাদের আসক্তির ঝুঁকি বেশি।

আমাদের দেশেও ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে। জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট। বাড়ছে ব্লুগিং, চ্যাটিং। মোবাইল থেকেই ঢুকে পড়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। অফিসে কাজের সময়ও কেউ কেউ অন-লাইন থাকছেন সর্বক্ষণ, লেকচার ক্লাসে বসে ছাত্রছাত্রীরা মোবাইল ফোনে লগ-ইন করছে চ্যাটিং সাইটে। এই মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার থেকেই বাড়ে আসক্তির ঝুঁকি।

আসক্তির প্রকৃতি গুরুতর না হলে নিজ প্রচেষ্টাতেই তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে, আপনি যে আসক্ত এ ব্যাপারটি আপনাকে অনুধাবন করতে হবে। এরপর দেখুন, এই আসক্তির ফলে আপনি জীবনে কি হারাচ্ছেন বা মিস করছেন। আপনার ওয়েব-সার্ফিংয়ের সময় নির্দিষ্ট করুন। অ্যালার্ম ব্যবহার করুন। অ্যালার্ম বেজে উঠলেই অফ-লাইন হয়ে যান। বন্ধু খুঁজুন বাস্তবে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নিজস্ব প্রচেষ্টায় এ আসক্তি থেকে মুক্তি লাভ কঠিন। তাদের জন্য বিশেষজ্ঞ সহায়তার প্রয়োজন।

সহকারী রেজিস্ট্রার

মানসিক রোগ বিভাগ

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj