ডেঙ্গু জ্বরের প্রতিকার

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

ডা. মনিরুজ্জামান খান

ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাস এক ধরনের ফ্লাভি ভাইরাস। এডিস প্রজাতির মশার কামড়েই সাধারণত ডেঙ্গু জ্বর হয়। এডিস মশার প্রজাতি হলো এডিস ইজিপটাই এবং এডিস এলবোপিকটাস।

এডিস মশা দেখতে গাঢ় নীলাভ কালো রংয়ের। এই মশার সারা শরীরে সাদা সাদা ডোরা কাটা দাগ থাকে এবং পাগুলো লম্বা। এডিস এলবোপিকটাসকে বলা হয় টাইগার মশা।

এডিস এলবোপিকটাস : এই প্রজাতির মশা সাধারণত গ্রামাঞ্চলে থাকে, তবে শহরেও থাকতে পারে। এডিস ইজিপটাই প্রজাতির মশা শহরাঞ্চলে বেশি থাকে এবং এর প্রকোপই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়।

এডিস মশা সাধারণত ঘরেই বসবাস করে। দুই প্রজাতির এডিস মশার ডিম পাড়ার আচরণ একই রকম। অনেক দিন কৃত্রিম পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশা ডিম পাড়ে। কৃত্রিম পাত্রের মধ্যে রয়েছে ফুলের টব, অব্যবহৃত কৌটা ও টায়ার, ডাবের খোসা, খোলা মুখ পানির ট্যাংক, পলিথিন ব্যাগ ও প্লাস্টিকের প্যাকেট, কোমল পানীয় ও জলের বোতল, ফ্রিজের পানি জমার পাত্র, এয়ার কন্ডিশনের পানি জমার পাত্র প্রভৃতি। তবে প্রাকৃতিক পাত্র যেমন- গাছের কোটর, বাঁশের গিঁটের গর্ত, বড় আকারের পাতার বোঁটা প্রভৃতিতে এই মশা ডিম পাড়তে পারে। তবে প্রবহমান পানি তথা ড্রেন, নদী ও পুকুরের পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে না।

এই দুই প্রজাতির স্ত্রী মশা মূলত ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস বহন করে এবং এদের মাধ্যমেই ডেঙ্গু জ্বর একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড়ায়। বিশেষ করে সকাল বেলার প্রথম দিকে এবং বিকেল বেলার শেষ দিকে অর্থাৎ সন্ধ্যার শুরুতে এডিস মশা বেশি কামড়ায়।

এডিস মশা কামড়ালেই ডেঙ্গু জ্বর হবে এমন কথা নেই। অবশ্যই এডিস মশাকে ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হতে হবে এবং আক্রান্ত মশার মানুষকে কামড়াতে হবে। মানুষ এ রোগের বাহক। এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ৮-১০ দিনের মধ্যেই কামড়ের মাধ্যমে মানুষকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত করার যোগ্য হয়। এডিস মশা ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত না হলে সেই মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হবে না।

আবার ডেঙ্গু জ্বরে ভুগছে এমন কোনো ব্যক্তিকে আক্রান্ত হওয়ার ৬ দিনের মধ্যে যদি কোনো সাধারণ এডিস মশা (যে ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু বহন করছে না) কামড়ায় তা হলে সেই মশাটিও ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়বে এবং এই আক্রান্ত এডিস মশাটি পরবর্তীতে যে মানুষকে কামড়াবে তিনিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবণুবাহী হয়ে আক্রান্ত হবেন। একবার ডেঙ্গু জ্বর হলে পুনরায় সেই ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। পরবর্তী সংক্রমণ সাধারণত আগের তুলনায় তীব্র হয়।

তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিতে হবে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ-

১. প্রত্যেক বাড়ির আঙ্গিনা ও চারপাশের পরিবেশ নিয়মিতভাবে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

২. পারিবারিক ও কর্মস্থলের বর্জ্য নিষ্কাশন, পয়ঃনিষ্কাশন পদ্ধতি উন্নয়ন করে এবং প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ করা।

৩. এডিস মশার প্রজনন স্থান নষ্ট করতে হবে।

৪. নিয়মিতভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে বসতবাড়ির ভেতরে ও বাইরে, ছাদে ফুলের টব, আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোসা, গাড়ির অব্যবহৃত টায়ার, প্লাস্টিকের প্যাকেট ও বোতল, পলিথিন, এয়ার কন্ডিশনারের নিচে এবং ফ্রিজের নিচের দিকে পানি জমার স্থান এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে দেয়া যাবে না।

৫. ব্যবহারযোগ্য পাত্রগুলোতে কোনোভাবেই যাতে একনাগাড়ে ৫ দিনের বেশি পানি জমে না থাকে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে।

৬. বাসার দরজা, জানালা, ভেন্টিলেটরে নেট লাগানো যেতে পারে।

৭. দিনের বেলায়ও মশারি খাটিয়ে ঘুমাতে হবে। টাইগার মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।

৮. দিনের বেলায় বাসা কিংবা অফিসে ছেলেরা ফুল প্যান্ট, ফুলহাতা শার্ট, মোজা এবং মেয়েরা পাজামা, ফুলহাতা কামিজ বা ফুলহাতা ব্লুাউজ, মোজা; এক কথায় বলতে গেলে সারা শরীর ঢেকে থাকে এমন কাপড় পরিধান করলে এডিস মশার কামড় থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া সম্ভব।

৯. ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে রোগীকে সর্বক্ষণ মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে রোগীকে কোনো মশা কামড়াতে না পারে।

১০. জ্বরে আক্রান্ত রোগীকে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

আজ পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগের কোনো প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার হয়নি। সুতরাং এর জন্য সচেতনতা এবং প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে এডিস মশার প্রকোপ কমানোর জন্য আল্ট্রা-লেপ-ভলিউম ম্যালাথিয়ন ব্যবহার করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে এডিস নিয়ন্ত্রণের কথা আমাদের বিশেষ বিবেচনায় এনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মেডিকেল সেন্টার, মতিঝিল।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj