ছাত্রলীগনামা

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া সংগঠন। নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ এ দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে দিনে দিনে। দেশের সংকটকালীন সময়ে প্রতিটি যৌক্তিক আন্দোলনে ছাত্রলীগ রাজপথ আঁকড়ে থেকেছে অতন্দ্র প্রহরীর মতো। ১৯৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে যে ছাত্র সংগঠনটির শুরু, ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলন, শিক্ষার অধিকার, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই সংগঠনটি অগ্রপথিকের ভূমিকায় ছিল সবসময়। স্বাধীনতা যুদ্ধে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়। মুক্তি বাহিনী, মুজিব বাহিনীসহ বিভিন্ন নামে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে সংগঠনটি।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটি অবিভক্ত পাকিস্তানের সর্বপ্রথম ছাত্র সংগঠন ছিল। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িকতার এটাও একটা উদাহরণ যে, ১৯৪৯ সালে গঠিত মুসলিম লীগ পরবর্তী সময় দলে অসাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে ১৯৫৫ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামে নামকরণ হয়। একই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ছাত্রলীগের নামেও পরিবর্তন আসে, নতুন নাম হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’। স্বাধীনতার পর দলের নামেও পরিবর্তন আসে। ছাত্রলীগের নাম হয় ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’।

নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, আলো আর আঁধার পথ পেরিয়ে ছাত্রলীগ আজকের অবস্থানে। ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে, অভিযোগের পাহাড় জমেছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের সভাপতি পদে আসেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক হন গোলাম রাব্বানী। পাহাড়সম অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেও।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের সভায় ছাত্রলীগের প্রসঙ্গ তোলেন স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সম্পর্কে নানা অভিযোগ উঠে আসে উপস্থিত নেতাদের কাছ থেকে। ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে বিবাহিত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শিবির কোটাধারীদের স্থান দেয়া, চাকরিজীবীসহ বিতর্কিতদের পদ দেয়া, ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করা, কমিটি দিতে অর্থনৈতিক লেনদেনসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে এই দুজনের বিরুদ্ধে। দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অনুষ্ঠানে দেরিতে যাওয়াসহ আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের সম্মেলনের দুই মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও কমিটি দিতে না পারা, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি করার বিষয়ে অনৈতিক অর্থনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মধুর ক্যান্টিনে মাঝে মধ্যেই অনুপস্থিত থাকা, ছাত্রলীগের সভাপতির বিরুদ্ধে বিবাহিত হওয়ার অভিযোগও প্রমাণিত। দুজনের বিরুদ্ধেই অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ নিয়েও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ে কানাঘুষা রয়েছে। ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দিতে বলেন সংগঠনের সাংগঠনিক নেতা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- এমন খবরও গণমাধ্যমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য গণভবনে গিয়েও প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ পাননি এই দুই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা। গণভবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্থায়ী অনুমতি অর্থাৎ প্রবেশের পাস স্থগিত করা হয়েছে গত মঙ্গলবার।

একটি সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে যদি বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, তার প্রভাব তৃণমূল পর্যন্ত ছাপিয়ে যায়। যে ছাত্রলীগ প্রগতিশীল সব আন্দোলনে বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেছে, গত এক দশকে টেন্ডারবাজি, অনৈতিক লেনদেন, যৌন হয়রানি, ছিনতাই থেকে শুরু করে কী অভিযোগ নেই তাদের বিরুদ্ধে? রাজনীতি ছেড়ে তারা ক্ষমতার চর্চায় লিপ্ত, বেপরোয়া। সংগঠনের আদর্শ-শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির পথ ছেড়ে এ কোন পথে হাঁটছে ছাত্রলীগ? মুক্তিযুদ্ধের গৌরব বহনকারী একটি সংগঠন ক্ষমতার অপচর্চায় আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? দুপুরের আগে ঘুম থেকে না ওঠা, নিয়মিত মধুর ক্যান্টিনে উপস্থিত না হওয়া- এসব অভিযোগও রয়েছে এই কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে! তাদের সঙ্গে যদি ছাত্রসম্পৃক্ততা না-ই থাকে, তবে কী করে তারা আগামীর নেতৃত্ব দেবেন? সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, কোটা-সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন ও ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিতর্কিত ভূমিকা এবং বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছাত্রলীগের প্রশ্নে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

২৮ বছরের বন্ধ্যাত্ব কাটিয়ে ডাকসু নির্বাচন ছাত্ররাজনীতিকে কতটুকু ঋদ্ধ করল, কতটুকু গুণগত পরিবর্তন এলো নেতৃত্বে? এ প্রশ্নে হতাশ হতে হয়। ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে ভর্তি পরীক্ষা না দিয়েই জালিয়াতির মধ্য দিয়ে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স কোর্সে ভর্তি হন ছাত্রলীগের ৩৪ নেতা, যাদের মধ্যে ৮ জন ডাকসু ও হল সংসদের নেতা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদিও বলছেন, তারা নিয়ম মেনেই ভর্তি হয়েছেন। ছাত্রলীগের বর্তমান অবস্থান এতটাই লাগামহীন যে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারাও এ বিষয়ে চিন্তিত। ক্ষুব্ধ স্বয়ং সংগঠনের সাংগঠনিক নেতা শেখ হাসিনা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অরাজক পরিস্থিতির মূলেও রয়েছে ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাস উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা দেবে না, এই প্রতিশ্রæতিতে ছাত্রলীগ নেতাদের দেয়া হয়েছে ২ কোটি টাকা- এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় গত ২৩ আগস্ট থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। আন্দোলনরত (জাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগে জড়িত ছাত্রলীগ নেতা। উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে গত ২৩ অক্টোবর ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা অনুমোদন দেয় একনেক। এতে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে ছাত্রলীগের অন্তঃকলহ আরো প্রকট হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের কমপক্ষে ১০ নেতাকর্মী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ছাত্রলীগের তিনটি অংশকে দেয়া এক কোটি টাকার ভাগ তারাও পেয়েছেন। হলে আবাসন সমস্যা প্রকট, কিন্তু ছাত্রলীগের নেতারা যারা চার সিটের রুম একাই দখল করে রাখেন, এই অভিযোগও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। তাহলে নৈতিকতার বিষয়টি আসলে কোথায়? গত ৩ জুলাই সংবাদের শিরোনাম ‘গায়ে ধাক্কা’ লাগার জেরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের দুই হলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। আহত হয়ে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭০ জনের বেশি নেতাকর্মী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত এগারো মাসে কমপক্ষে সাতটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এবং ঘটনাগুলো ঘটেছে ছাত্রলীগের নিজেদের মধ্যে। কিন্তু কেন বারবার এমন সংঘর্ষ? যেখানে ক্যাম্পাসে তেমন কোনো প্রতিপক্ষই নেই, নিষ্ক্রিয় ছাত্রদলের কোনো কর্মকাণ্ড নেই, সেখানে কেন পিস্তল-দা-চাপাতি নিয়ে সংঘর্ষ? জাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্বের দুর্বলতা, গ্রুপিং, টেন্ডারের ভাগাভাগি, হলো কমিটি না থাকা, চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়াই কি মূলত দায়ী?

ক্যাম্পাসে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন কাজের ভাগ কেন্দ্রিক জটিলতায় জাবি ছাত্রলীগ বারবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। গত ১ এপ্রিল ছিনতাইয়ের অভিযোগে আটক হয় পাঁচ ছাত্রলীগ কর্মী। ফেসবুক পোস্ট, জন্মদিন পালন আর সেলফিবাজির ঘূর্ণাবর্তে যেন পাক খাচ্ছে ছাত্রলীগ। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা কোথায় তাদের? ক্যাম্পাসের দরিদ্র মেধাবী ছাত্রটির পাশে, সব প্রকার হয়রানির বিরুদ্ধে, অনৈতিকতার বিরুদ্ধে, ছাত্রদের দাবি-দাওয়া আদায়ে, শিক্ষার গুণগত সংস্কার প্রশ্নে যাদের নিরলস কর্মী হওয়ার কথা ছিল, কোথায় তারা? জেলা, উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দ্ব›দ্ব-সংঘাতের সহিংস ঘটনা আজ ছাত্রলীগের কমন ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে নৈতিক আর অনৈতিক বলে কিছু নেই। যেখানে নেতৃত্ব শুধুই টাকা উপার্জন আর ক্ষমতার অপচর্চার সুযোগ হিসেবে দেখছে তারা।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মায়ের মমতায় ছাত্রলীগকে সংগঠিত করেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব ছাত্রদের হাতে ছেড়ে দেন। যে ছাত্রলীগ সবসময় লড়াই করেছে সব অশুভের বিরুদ্ধে, আজ আওয়ামী লীগের সে ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনটি দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। যে সংগঠনের সাংগঠনিক নেতা শেখ হাসিনা স্বয়ং, সেই ছাত্রলীগের দিশাহীন হওয়ার সুযোগ নেই। অত্যন্ত সঠিক সময়ে শেখ হাসিনা তার প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, নিশ্চয়ই তিনি সব অনৈতিকতার টুঁটি চেপে ধরবেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালি জাতির ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস’। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ২৮ হাজার নেতাকর্মী শহীদ হন। যে সংগঠন বাংলাদেশের ইতিহাসকে বহন করে সেই নেতৃত্ব কতটা দৃঢ় হওয়া উচিত, সে কথা বুঝতে আরো কত সময় নেবে ছাত্রলীগ?

কাজী নুসরাত শরমীন : কবি ও সাংবাদিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
জোবাইদা নাসরীন

ছিঁচকে চুরির ত্রিশূল

কাজী নুসরাত শরমীন

ছাত্রলীগনামা

Bhorerkagoj