এনআরসির আধুনিকীকরণ প্রসঙ্গে

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯


ইতিহাস নিষ্ঠুর। অনেকেই হয়তো স্বীকার করবেন না, তবে ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল, তার ফল আজো ফলছে। আসামে সদ্য সমাপ্ত নাগরিক তথ্যপঞ্জি (ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন্স) বা এনআরসির আধুনিকীকরণ তারই একটা উদাহরণ। তবে এ ঘটনা ঘিরে খবরকাগজের প্রতিবেদনগুলোতে বেশিরভাগই সেই কাকে কান নিয়ে যাওয়ার গল্পের মতো আবেগ ও রাজনীতি বেশি, যুক্তি কম। বহিরাগতদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী আসাম আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। আগুনটা পুরনো। অসমীয়ারা স্বাধীনচেতা ও যুদ্ধে পারদর্শী জাতি। পাঠান, মোগল কাউকে এলাকায় ঢুকতে দেয়নি। ব্রিটিশ এসে তেল, চা, কাঠ উৎপাদনের জন্য সারা ভারত থেকে শ্রমিক আনে। এদের মধ্যে বাঙালি, বিহারি, নেপালি ছিল অনেক। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গ ও আসামজুড়ে শরণার্থীর ঢল নামে। নেহরু-লিয়াকত চুক্তির (১৯৫০) পরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে অনেকে ফেরত এলেও, ভারত থেকে ফেরত যাওয়ার তেমন নিদর্শন নেই। অসমীয়ারা এই পরিবর্তনে খুশি ছিল না। বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো ষাটের দশকের মধ্যভাগ থেকে পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা জনসংখ্যার চাপে আসাম ফেটে পড়ে।

আন্দোলনের চাপে কেন্দ্রের তদানীন্তন ইন্দিরা গান্ধী সরকার ১৯৮৩ সালে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্তকরণের জন্য একটি আইন (আইএমডিটি) আনেন। ইন্দিরা মারা যান ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে। ক্ষমতায় আসার দশ মাস পরে ১৯৮৫ সালের আগস্টে রাজীব গান্ধী আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আসাম চুক্তি স্বাক্ষর করেন, তাতে সব থেকে বড় প্রতিশ্রæতি ছিল এনআরসির আধুনিকীকরণ বা হালনাগাদ করতে হবে। ১৯৫১ সালে জনগণনার পর দেশে নাগরিকদের নাম-ঠিকানা দিয়ে এনআরসি তৈরি হয়েছিল। তারপর আর সে নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। আসাম চুক্তিতে বলা হলো, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ অবধি যারা রাজ্যে বসবাস করেছেন তাদেরই নাগরিক বলে গণ্য করা হবে।

ইন্দিরা ও রাজীবের আসাম সিদ্ধান্তে অনেক গলদ ছিল। ১৯৮৩-এর অনুপ্রবেশবিরোধী আইন রাজ্যের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল। অন্যদিকে রাজীবের চটজলদি চুক্তি নাগরিকত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশ ও আসামের মধ্যে অসাম্য তৈরি করেছে। অনুপ্রবেশ ভারতের একটা সমস্যা। ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নানা কারণে এই অনুপ্রবেশ মূলত বাংলাদেশ থেকেই হয় বা হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে গেলে সেটা দেশজুড়ে হওয়া উচিত। নাগরিক তথ্যপঞ্জির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। আসাম চুক্তিতে এগুলো কিছুই মানা হয়নি। এদিকে রাজীব গান্ধীর পরে যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা সমস্যাটা মনে হয় জানতেন। কিন্তু ভোটের লোভে এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসেননি, খালি চুক্তির বাস্তবায়নে গড়িমসি করেছেন। তার ফল আরো বিষময় হয়েছে।

গণতন্ত্রে, সরকার ও বিচারব্যবস্থার আলাদা দায়িত্ব। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নির্বাচিত সংসদ ও সরকারের দায়িত্ব। বিচারব্যবস্থা শুধু দেখবে যাতে সে কাজ সংবিধান মতে হয়। মুশকিল হলো, রাজনীতি সদর্থক না হলে কোর্ট সেই শূন্যস্থান পূরণে নেমে পড়ে। এতে অনেকে হয়তো খুশি হয়, কিন্তু গণতন্ত্রের ভালো হয় না সে কথা বলাই বাহুল্য। আসাম চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে নির্বাচিত সরকারগুলো যখন গড়িমসি করেছে, তখন কোর্ট একের পর এক রায় দিয়েছে। ১৯৮৩ থেকে ২০১৯-এর আগস্ট অবধি ৩৬ বছরে ১.১৭ লাখ লোক ট্রাইব্যুনালে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ঊর্ধ্বতন কোর্টের জামিনে দেশে বাস করছে। আরো ২.০৭ লাখ মানুষের নামে ট্রাইব্যুনালে কেস ঝুলছে। অর্থাৎ এদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এদিকে ১৯৯৭ সালের এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে কারো নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয় তৈরি হলে তার ভোট অগ্রাহ্য হতে পারে বা হওয়া উচিত। এর ফলে এক লাখের বেশি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছে।

বাবা বা মা যদি অবৈধ নাগরিক হয় তাহলে সন্তানের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হবে এ কথা বলাই বাহুল্য। ২০১৭ সালের এক রায়ে গৌহাটি হাইকোর্ট জানিয়েছে যে অবৈধ নাগরিকের সন্তানদের অবৈধ নাগরিক হিসেবে গণ্য করা উচিত। সে কেস এখন সুপ্রিম কোর্টে। অর্থাৎ হিসাব করলে দেখা যাবে, এনআরসি আধুনিকীকরণের আগেই ৯ থেকে ১০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে কড়া প্রশ্ন উঠেছিল। বলে রাখা দরকার এই দশ লাখ মানুষকে কিন্তু কোনো জেলে ভরে রাখা হয়নি। যে যার ঘরেই বসবাস করেছে ও করছে। খালি ১ হাজার ৬০০ লোক যারা নানাভাবে আইনের হাত এড়িয়ে পালানোর চেষ্টা করেছে তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।

এর মাঝেই ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল যে সরকারকে আসাম চুক্তি অনুযায়ী এনআরসি আধুনিকীকরণ করতে হবে। আসাম ও দিল্লিতে তখন কংগ্রেস সরকার। দুজনেই নানা টালবাহানা করতে থাকায় ২০১৫ সালে কোর্ট এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে নিজে এনআরসি অধীক্ষক নিয়োগ করে ও সরাসরি রায় বাস্তবায়নের কাজে হাত দেয়। গত ৪০ বছর ধরে আসামের রাজনীতি ‘বহিরাগত’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে চলেছে। নির্বাচনী গণতন্ত্রের নিয়ম মেনেই বিজেপি সে হাওয়াকে নিজের পালে টেনে এনেছে এবং ২০১৬ সালের মে মাসে আসামে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এনআরসির লিস্ট বেরোবার পর সে হাওয়া ফুস। রাজ্যের ৩.৩ কোটি মানুষ নাগরিক পঞ্জিতে নাম ওঠাবার জন্য আবেদন করেছিলেন তার মধ্যে ১৯.০৭ লাখ অর্থাৎ ৫ শতাংশ ছাড়া সবাই নাগরিক হিসেবে গণ্য হয়েছেন। যারা গণ্য হলেন না তাদের বিচার করবে ট্রাইব্যুনাল তার পরে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট তো আছেই।

তাহলে মানেটা কী দাঁড়াল? প্রায় ১০ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব আগেই প্রশ্নের মুখে ছিল। স্বাভাবিকভাবেই আশা করা যায় যে এদের মধ্যে একটা সামান্য অংশ ছাড়া বাকিদের নাম এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অর্থাৎ নতুন করে ৯ লাখ মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয় হয়েছে। কিন্তু এ হিসাবে জল আছে। তিন কোটি মানুষের ৭০ বছরের পুরনো তথ্য মিলিয়ে দেখতে গেলে কিছু ভুল হবেই। খবরকাগজেও দেখা যাচ্ছে বাবার নাম আছে, ছেলের নেই। কত ভুল আছে সে কথা এখন বলা মুশকিল, তবে ০.৫ শতাংশ ভুল হলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ১.৫ লাখ। তা ছাড়া প্রায় ৩.৩৬ লাখ অসমীয়া শেষ দফায় ঠিক করে কাগজপত্র জমা দেয়নি। অর্থাৎ দুইয়ে মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ খাঁটি নাগরিক হিসেবের ফাঁকে পড়ে গেছেন। ট্রাইব্যুনালের কাজ শুরু হলে এদের নাম খাতায় উঠবেই নইলে সামনের ভোটে কংগ্রেস, বিজেপি, অগপ সবার কপালে দুঃখ নাচছে।

অর্থাৎ যা বোঝা গেল তা হলো প্রায় লাখ দশেক লোক আগে থেকেই সমস্যায় ছিল। এনআরসির ফলে নতুন করে আর লাখ চারেক লোক ঘোর সমস্যায় পড়তে পারে। এনআরসি অফিস এদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করেনি। অনেকে মনে করেন এনআরসির ফলে যে বাড়তি লাখ চারেকের নাগরিকত্ব নিয়ে সমস্যা হতে পারে, তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ হিন্দু। অর্থাৎ আসামের বহিরাগত সমস্যাটাকে শুধু ধর্মের চোখ দিয়ে দেখা ভুল হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, এদের কী হবে। প্রথমত, কাউকে জেলে ভরা হবে না। কিছু লোক গা-ঢাকা দেয়ার চেষ্টা করবে, এটা ধরে নিয়ে আরেকটা ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে তাতে মোটে ৩ হাজার লোক থাকতে পারে। সেখানে হাসপাতাল, স্কুল সবই থাকবে। দ্বিতীয়ত, ট্রাইব্যুনালে লাখ লাখ লোকের বিচার করতে সময় লাগবে। সরকারি সময়সীমা বলছে ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া এক বছরের মধ্যে শেষ হবে। কিন্তু উকিলবাবুরা বলছেন এত জজসাহেব কোথায় পাওয়া যাবে?

অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক দশক লাগবে। কিন্তু রাজনীতি বোধহয় আগের মতো হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। এনআরসি আসামে বহিরাগত নিয়ে যাবতীয় বিতর্ক ও ধোঁয়াশা শেষ করে দিয়েছে। রাজনীতিকে এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে নইলে বিপদ আছে। নানা রকম প্রস্তাবের কথা শোনা যাচ্ছে, কিন্তু ঠিকঠাক না জেনে সে নিয়ে কথা বলাটা সেই কাকে কান নিয়ে যাওয়ার মতো হবে। একটা কথা অবশ্য বলাই যায়, যারা শেষমেশ বিদেশি চিহ্নিত হবে তাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি পাঠানো যাবে না আর মুজাহিরও বানানো যাবে না। এর একটা কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের সুসম্পর্ক। কিন্তু তার থেকেও জরুরি বিষয় হলো, ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র- একদলীয় বা সেনাচালিত নয়। এশিয়ার বড় শক্তি হিসেবে পৃথিবীর কাছে তাকে নিজের ইমেজ ঠিক রাখতে হয়। নির্বাচনী প্রচারে কে কী বলছে, সরকার তাই দিয়ে চলে না।

প্রতিম বসু : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
জোবাইদা নাসরীন

ছিঁচকে চুরির ত্রিশূল

কাজী নুসরাত শরমীন

ছাত্রলীগনামা

Bhorerkagoj