শাড়িতে ঝড়

সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

সেলাইবিহীন বারো হাত লম্বা এক পোশাকের নাম শাড়ি। যাকে ঘিরে যেমন রয়েছে বিস্ময় তেমনি রয়েছে বন্দনা। যুগে যুগে শাড়ি নিয়ে লেখা হয়েছে গল্প কবিতা। নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দসহ বাংলার কবি, সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতে বহুবার নারী প্রসঙ্গে উঠে এসেছে শাড়ির মাহাত্ম্যর বর্ণনা। অনেক কবি, সাহিত্যিক বাঙালি নারীর শাড়িকে নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। নদীর যেমন দুই পাড় থাকে তেমনি থাকে শাড়িতেও। নদী যেমন বাংলার আদি প্রতীক, শাড়িও তেমন হাজার বছরের শাশ্বত বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। শাড়ি বাঙালি নারীর ভূষণের অবিচ্ছেদ্য ও অনিবার্য অনুষঙ্গ।

সম্প্রতি একটি বাংলা পত্রিকায় শাড়ি নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি নিবন্ধন প্রকাশিত হয়। যা নিয়ে দেশজুড়ে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল বিতর্কের ঝড় তুলে। সেখানে তিনি শাড়িকে পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথবা শালীন ও রহস্যময় পোশাক হিসেবে উল্লেখ করেন। এ ছাড়া শাড়ি কীভাবে মেয়েদের শরীরের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে শাড়ির সঙ্গে পশ্চিমা বা অন্যান্য পোশাকে মেয়েদের দেখতে কেমন দেখায় তার তুলনা এবং মেয়েদের শারীরিক গঠনের সঙ্গে শাড়ির সম্পর্ক ইত্যাদি নানা বিষয় এসেছে।

নিবন্ধনের শুরুতে তিনি লিখেছেন; ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথবা শালীন পোশাক। শুধু শালীন নয়, রুচিসম্মত, সুস্মিত ও কারুকার্যময় পোশাক।….’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘শাড়ি একটা রহস্যময় পোশাক। নারী দেহকে কতটা প্রদর্শন করলে আর কতটা অপ্রকাশিত রাখলে তা শারীরিক মোহ বজায় রেখেও দর্শকের চোখে অনিন্দ্য হয়ে উঠবে, তা পোশাকটি যেন সহজাতভাবেই জানে।’

তিনি লিখেছেন, ‘আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ। শাড়ি তার রূপের শরীরে বইয়ে দেয় এক অলৌকিক বিদ্যুৎ হিল্লোল। পৃথিবীর কোনো কোনো এলাকার নারী শরীরেই কেবল শাড়িতে এ অলীক রূপ ফুটে ওঠে, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রিয়দর্শিনী সুকুমারী তন্বীদের দেহবল্লরীতে সে বাংলা, পাঞ্জাব বা উত্তর ভারতের যেখানকারই হোক।’ আর শেষটায় তিনি লিখেছেন, ‘… আমার মনে হয়, এ রকম একটা অপরূপ পোশাককে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বাঙালি মেয়েরা সুবুদ্ধির পরিচয় দেয়নি।’

বাঙালি নারী আর শাড়িকে যেমন আলাদা করে দেখা যায় না। তেমনি বিশাল এ শাড়ি কোন গড়নের নারীকে ভালো লাগবে কি লাগবে না তা চিন্তা করা বাতুলতা মাত্র

মুক্তিযোদ্ধা ও মানবাধিকারকর্মী রোকেয়া কবীর

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে চান অথচ তিনি নিজেই আলোকিত হননি। তাই নারীকে তিনি মানুষ হিসেবে নয় ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেখেছেন।

বোধজ্ঞানসম্পন্ন একজন মানুষ এমন কথা বলতে পারেন না। যে ভাষা তিনি তার নিবন্ধে ব্যবহার করেছেন তা কোনো শিক্ষিত রুচিশীল মানুষের বক্তব্য হতে পারে না। তিনি হীনমন্যতায় ভোগেন। এ ছাড়া তিনি একজন রেসিস্ট। মানুষের উচ্চতা, গায়ের রং, দেহের গড়ন নির্ভর করে আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। নারীর পোশাক কেমন হবে তা নারীর কর্মপরিবেশের ওপরও নির্ভর করে। সবার আবু সাঈদের বর্ণিত উপায়ে শাড়ি পরা সম্ভব নয়।

জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিন

আমি বাঙালি তাই শাড়ি পরি। কারো মনোরঞ্জনের জন্য পরি না। ওই লেখায় শাড়ি পরার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে নারীর শরীর নিয়ে নানাবিধ উপমা ব্যবহার করেছন, যা নারীকে হেয় করেছে। নারীকে পণ্য হিসেবে দেখেছেন। লেখায় লেখকের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হয়েছে। উনার মতো একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন লেখা প্রত্যাশা করিনি।

নাট্যকার-নির্দেশক মাসুম রেজা

তার লেখা তিনি লিখেছেন.. তবে এই লেখার নিচে একটা ফুটনোট দেয়া উচিত ছিল যে, শাড়ি কীভাবে সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ শালীন পোশাক, তা দেখার ছলে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না.. শাড়ি পরলে নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো কেমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, তা দেখারও চেষ্টা করবেন না.. শাড়ি কীভাবে শরীরের অসম অংশগুলোকে লুকিয়ে ও সুষম অংশগুলোকে বিবৃত করে বা নারীর শরীরে সৌন্দর্যের প্রতিটি ঢেউ আর সরণিকে আঁকাবাঁকা, উঁচু-নিচু ভঙ্গিতে বিন্যস্ত করে তা অনুসন্ধানের চেষ্টা করবেন না..।

কবি ও সাংবাদিক শান্তা মারিয়া

বাঙালি নারীকে শাড়িতে খুবই সুন্দর লাগে। উৎসবে, অনুষ্ঠানে, পালা-পার্বণে শাড়িই হতে পারে বাংলাদেশের মেয়েদের পরিধেয়। কিন্তু যখন হাটে-বাজারে যাই, পাহাড়ে চড়ি, সাগর-সৈকতে যাই কিংবা যে কোনো দূরপাল্লার ভ্রমণে আমি কখনো শাড়ি পরি না। শাড়ি পরে পুরুষের নয়নমোহিনী হওয়ার চেষ্টার মানসিকতার বিরোধী আমি। আর শাড়ি পরা বাঙালি নারীর যৌন আবেদন এবং পাশ্চাত্যের পোশাক পরা খর্বাকৃতি বাঙালি নারীর যৌন আবেদনে ঘাটতি ইত্যাদি নিরর্থক আলোচনা চিন্তার দৈন্য ও পুরুষতান্ত্রিক পশ্চাৎপদ মানসিকতাকেই প্রকাশ করে। এর বেশি কিছু নয়।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj