সূচনার সোনালি আঁশের স্বপ্নযাত্রা

সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অন্যপক্ষ প্রতিবেদক

সূচনা হোসেন। পাটের প্রেমে মজেছেন আগেই। এবার সংসার বাঁধলেন রীতিমতো! সোনালি আঁশ পাটকে আরো জনপ্রিয় করতে, মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছেন ইউজুট.কম নামের বহুমুখী পাটপণ্যের প্রথম ই-কমার্স প্লাটফর্ম।

বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কেউ যাতে পাটপণ্য কিনতে পারেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে দেশের অভ্যন্তরে পাটপণ্যের যে একটা বড় বাজার আছে, সেটা এক্সপ্লোর করা যাবে বলে সূচনার মত। এ ছাড়া বাংলাদেশে পাটপণ্য উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা পাটপণ্যের বিপণন। সূচনা জানান, বছরে কয়েকটা পাটপণ্য মেলা হয়, এটাই যা ভরসা! কিন্তু এই জায়গাটা বদলানো না গেলে পাটশিল্প এগুবে না। উদ্যোক্তারা বেড়ে উঠবেন না। তাই যাতে পাটপণ্য উদ্যোক্তারা বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়, সে জন্যই ইউজুটের যাত্রা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের উৎপাদিত পণ্য আমরা ইউজুটে রাখব, যাতে যে কেউ সেই পণ্য কিনতে পারে। এতে পাটের যেমন প্রচার-প্রসার হবে, তেমনি আমাদের মতো ছোট ছোট পাটপণ্য উদ্যোক্তারাও উপকৃত হবেন। পাটপণ্য ছড়িয়ে পড়বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার বাড়বে। পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারে আমাদের সুযোগ তৈরি হবে।

সূচনা হোসেন ২০১৬ সালে পাটপণ্যের প্রচার, প্রসার, উদ্যোক্তা উন্নয়নে সহপ্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পাটের লড়াই নামের একটি উদ্যোগের সঙ্গে যাত্রা শুরু করেন। শিশুদের কাছে পাটপণ্যকে পরিচিত করার জন্য ‘শিশুর জন্য পাটপণ্য’ শীর্ষক ক্যাম্পেইন করেন। পাটের প্রচার-প্রসারে যুক্ত হন আরো নানান সৃষ্টিশীল আয়োজনে। সূচনা বলেন, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে আমরা টেকসই ভোগের কথা বলছি, অথচ প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করছি। ইউজুটের মাধ্যমে আমরা অল্প খরচে সুন্দর নান্দনিক পণ্য ভোক্তাদের কাছে তুলে দিতে চাই। মানুষকে পরিবেশবান্ধব পণ্য ব্যবহারের সুযোগ করে দিতে চাই।

সূচনা জন্মেছেন মাদারীপুর জেলার চরগোবিন্দপুর গ্রামে। ছোটবেলা থেকেই ঘরের আশপাশে, বাড়ির পাশের জমিতে দেখেছেন পাটের রাজত্ব। কখনো কখনো ঘরের চাচি-মামিদের সঙ্গে পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেছেন। দাদার সঙ্গে নৌকায় বসে পাট ধোয়ার কাজে সহযোগিতা করেছেন। সূচনা বলেন, পাট আমাদের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অংশ। আমি, আমার মতো অনেকেই পাটের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। ‘পাটের লড়াই’র সঙ্গে সম্পৃক্ততা আমাকে পাটকে নতুন করে আবিষ্কার করতে শিখিয়েছে। বহুমুখী পাটপণ্য একটি বড় সম্ভাবনা। আমি ইউজুটের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করতে চাই।

প্রযুক্তি অনেক কিছু সহজ করে দিয়েছে। দেশে ই-কমার্স ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে গড়ে উঠছে। আমাদের দেশের নারীরা তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসছেন। সূচনাও তাদের মতোই একজন হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বহুমুখী পাটপণ্যকে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দিতে চান। সূচনা জানান, দেশে উদ্যোক্তাবান্ধব সংস্কৃতি গড়ে ওঠা দরকার। ২০১৮ সালের গ্লোবাল এন্টারপ্রেনারশিপ ইনডেস্কে বাংলাদেশের অবস্থান একদম তলানিতে। ১৩৭টি দেশের মধ্যে ১৩৪তম। দেশের সামগ্রিক এন্টারপ্রেনারশিপ ইকোসিস্টেম নিয়ে কাজ করতে হবে। সরকারকে আরো আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও যথাযথ জ্ঞান বাড়ানোর কাজ করতে হবে।

পাটকে ভালোবেসে সূচনা আরো অনেকদূর যেতে চান। সারাদেশের শিক্ষিত নারীদের পাটপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে যুক্ত করতে চান। গড়ে তুলতে চান পাটপণ্য নারী উদ্যোক্তাদের একটি নেটওয়ার্ক। যেখানে সবাই মিলে একই সঙ্গে বাংলাদেশের পাটশিল্পকে এগিয়ে নেয়ার পাশাপাশি নারীর ক্ষমতায়নের জায়গাটা পোক্ত হবে। বাংলাদেশের পাটশিল্পের নানা সীমাবদ্ধতার বিষয়টিতে সরকার আরো আন্তরিকভাবে কাজ করবে বলে সূচনার মত। সহজে পাটপণ্য তৈরির কাঁচামালপ্রাপ্তি নিশ্চিতের পাশাপাশি পাটপণ্য উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষায়িত সাপোর্ট সেন্টার তৈরি করা জরুরি। সূচনা মনে করেন, পাটপণ্য তৈরির পাশাপাশি সেগুলোকে তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় সঠিকভাবে বিপণন করতে পারাটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এখানে দক্ষতা আর জানাশোনার পরিসর বাড়ানোর বিকল্প নেই। সরকারের বিভিন্ন দক্ষতা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান এ কাজে এগিয়ে আসবে বলে সূচনার বিশ^াস।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj