রাষ্ট্রহীনতার গ্লানি ও যন্ত্রণা থেকে মানবতার জয় হোক

সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯


আসামের প্রকাশিত নাগরিকপঞ্জিতে ১৯ লাখের বেশি মানুষ বাদ পড়ায় কার্যত তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েছেন। অন্য অনেক রাজ্যের মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এই আতঙ্ক বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে প্রকট। প্রকট কেরালায়ও। কারণ দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে- আসামের পর পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় এনআরসি প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া হবে। তাই নিজ দেশে পরবাসী হওয়ার আতঙ্ক ও আশঙ্কায় সেখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে মাত্রাবিহীন উদ্বেগ বিরাজ করছে। এই উদ্বেগ ও আতঙ্ক বুকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একদিকে চলছে নাগরিকত্ব প্রমাণের পুরনো কাগজপত্র জোগাড়ের চেষ্টা আর অন্যদিকে প্রকাশিত নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মহলে চলছে প্রতিবাদ। কিন্তু এই প্রতিবাদ এখনো পর্যন্ত সাধারণের আতঙ্ককে খুব বেশি প্রশমিত করতে পারেনি। নাগরিকপঞ্জির ভিত্তিবর্ষ ধরা হয়েছে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ। তাই ১৯৭১ বা তার পূর্ববর্তীকালের ভোটার লিস্ট অনুসন্ধানে অনেকেই বেপরোয়া হয়ে পড়েছেন। আবার এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখে অর্থাৎ পুরনো দিনের ভোটার লিস্ট পাইয়ে দিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একশ্রেণির দালালচক্রও। বেলা শেষে আসাম কিংবা অন্যান্য অঞ্চলে সম্ভাব্য রাষ্ট্রহীন হতে যাওয়া মানুষগুলো তাদের জন্মভূমির বুকে শেষ আশ্রয়টুকু পাবেন কি?

আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়েছেন সেখানকার ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন। বিগত ৩১ আগস্ট শনিবার ভারতের অনলাইন এবং এনআরসি সেবা কেন্দ্রগুলো থেকে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়। কর্তৃপক্ষ বলেছেন, চূড়ান্ত তালিকায় মোট আবেদনকারী ৩ কোটি ৩০ লাখ ১৭ হাজার ৬৬১ জনের মধ্য থেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে স্থান পেয়েছেন ৩ কোটি ১১ লাখ ২১ হাজার ৪ জন। অর্থাৎ ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন অনাগরিকে পরিণত হয়েছেন। এর অর্থ হলো, বাদ পড়াদের সবাই এখন বৃহৎ ভারতে ‘বহিরাগত’, ‘উদ্বাস্তু’ কিংবা ‘রাষ্ট্রহীন’! পাশাপাশি ভারত তথা আসামেরই বহু পত্রিকা এই বিপুল সংখ্যাকে ‘মাত্র’ বিশেষণেও বিশেষায়িত করে সংবাদ প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ কোনো কোনো গণমাধ্যম ১৯ লাখ মানুষের রাষ্ট্রহীন হওয়াতে খুশি হতে পারেনি। তাদের প্রত্যাশা ছিল এ সংখ্যা হবে আরো অনেক বেশি! গণমাধ্যমের সচরাচর একটি ‘মানবিক’ চারিত্র্য থাকে। কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক মানুষ এনআরসি থেকে বাদ পড়ার পরও এসব গণমাধ্যম ‘মাত্র’ শব্দের উল্লেখের মধ্য দিয়ে তালিকাচ্যুত অসমীয়াদের হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। এতে সেসব গণমাধ্যমের অমানবিক চরিত্রের প্রকাশ উন্মোচিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষ কোনো গণমাধ্যমের কাছেই আশা করে না। বলা হয়েছে, ১৯৫১ সালের পর এই প্রথম আসামে নাগরিকপঞ্জি প্রণীত হলো। নাগরিকপঞ্জি প্রণয়নের নামে আসামে বসবাসরত মানুষের ৬০ থেকে ৭০ বছরের যাপিত জীবনকে বিশাল এক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এসব মানুষের নাগরিকত্বহীনতার আড়ালে এনআরসি নীরব ভাষায় যে কথাটি প্রকাশ করতে চায় তা হলো- উদ্বাস্তুরা বাংলাদেশের মানুষ! কথিত উদ্বাস্তুরা বাংলা ভাষাভাষী বলে বাংলাদেশের এক ধরনের অস্বস্তি বোধ থাকাই স্বাভাবিক। আর ইতোমধ্যে আসামসহ বিভিন্ন স্থানের বিজেপির নি¤œ ও মধ্য সারির নেতারা তো বলতে শুরু করেছেন যে, তারা বাংলাদেশকে অনুরোধ করবেন যেন এদের ফেরত নেয়া হয়। অবশ্য ভারতের ক‚টনৈতিক ভাষ্য, আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রণয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু আমরা এ ধরনের বক্তব্যকে ‘ক‚টনৈতিক বিবৃতি’র অতিরিক্ত কিছু মনে করতে পারি না। যদিও সমস্যাটি একান্তই ভারতের তবুও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার নানামুখী কার্যকারণ থেকেই যায়। কারণ নাগরিক তালিকায় যাদের নাম ছাপা হয়নি তাদের মধ্যে অধিকাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক হলেও মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকও কম নয়। আবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ধর্মের ভিন্নতা থাকলেও সদ্য উদ্বাস্তু বা রাষ্ট্রহীন হওয়া মানুষের ভাষা একই। অর্থাৎ তারা বাঙালি। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি তাদের। আর তা হলো বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি। আসামের অসহায় মানুষদের দুর্ভাগ্য এই যে, তাদের মুখের ভাষা বাংলা। উপরন্তু হাজার বছরের প্রায় একই সাংস্কৃতিক ¯্রােতধারায় বাহিত তাদের জীবন সংগ্রাম। রাষ্ট্রহীন হয়ে যাওয়া এসব অসহায় মানুষের পক্ষে যে আইনি ‘সুযোগ’-এর কথা বলা হচ্ছে তার ফল পেতে যে ভোগান্তি হবে তার কোনো সীমা-পরিসীমা থাকবে না। নাগরিকপঞ্জি প্রকাশকালে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য বলা হয়েছে, তালিকায় যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তারা ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে’ আপিলের সুযোগ পাবেন। ট্রাইব্যুনালে আপিল করে ব্যর্থ হলে এসব নাগরিকের উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ থাকবে। আরো বলা হয়েছে, হাইকোর্টে ব্যর্থ হলে তারা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবেন। এতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যায়ে তারা ‘বিদেশি’ বলে গণ্য হবেন এবং ভারত সরকার তখন তাদের আটক করাসহ নানা প্রকার আইনি ব্যবস্থার অধীনে এনে বিচারসহ নানা প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আমাদের বিশ্বাস এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ থেকে ধারণা করা যায়, বস্তুত যেসব নাগরিক আসামে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন তাদের অধিকাংশেরই আপিলের জন্য মহামান্য হাইকোর্ট কিংবা সুপ্রিম কোর্টের বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছানোর সাহস, সঙ্গতি, মানসিক ও আর্থিক জোর নেই। তাই ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষের দাঁড়ানোর জন্য পায়ের নিচে আজ মাটি নেই! সেই মাটি- যে মাটিতে তাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা; সেই মাটি। সেই মাটি- যে মাটিতে তাদের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকা; সেই মাটি। নাগরিকপঞ্জির বঞ্চিত এই মানুষরা ভালোবাসা ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর ধরে উদযাপন করে আসছিল তাদের সঙ্গে যারা নাগরিক তালিকায় পেয়ে গেলেন গৌরবের স্থান। আর অগৌরবের গøানি নিয়ে অনেকেই রয়ে গেলেন ‘রাজনীতি’র নামে প্রণীত তালিকায় নামহীন, গোত্রহীন এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রহীন ও উদ্বাস্তু পরিচয়ে! এই পরিচয় কারো কাক্সিক্ষত নয় কোনো কালেই, কোনো দেশে কোনো সম্প্রদায়ের কাছে। ‘উদ্বাস্তু’ পরিচয় কি কোনো পরিচয়? এরচেয়ে গøানিকর মানবজীবনে আর কি হতে পারে!

কী ভবিতব্য হবে এই ১৯ লাখ ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের? কেনইবা এই বিরাট সংখ্যক মানুষকে উদ্বাস্তু ও রাষ্ট্রহীন ঘোষণা করতে হবে ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রের, স্বাধীনতার ৭২ বছর পরে? নাগরিকপঞ্জি প্রণয়নে যে রাজনীতির গভীর কুটিলতা ছিল তা আমরা বুঝি না। কিন্তু এ ঘটনা থেকে মানবিক যে সংকট সৃষ্টি হতে পারে সে সম্পর্কে আমরা কিঞ্চিৎ অনুমান তো করতেই পারি। আমরা কেবল ঘটনার মানবিক দিকটির প্রতিই বেশি মনোযোগ দিতে আগ্রহী। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষের কল্যাণের মধ্যেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য চরিতার্থ হয়। বলাবাহুল্য, কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শেরও শেষ কথা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই কল্যাণ। কোনো প্রকার মানবিক সংকট সৃষ্টি করে মানবতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ইতোমধ্যে অনেকে নাগরিক তালিকা বা নাগরিকপঞ্জি প্রকাশে বিজেপির একপ্রকার সুপ্ত আকাক্সক্ষার কথা প্রকাশ করছেন। তারা বলতে চাইছেন নাগরিকপঞ্জি প্রকাশে বিজেপির বেশি আগ্রহ ছিল, কারণ তাদের ধারণা ছিল প্রকাশিত নাগরিক তালিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে মুসলমানদের পরিমাণ থাকবে সর্বোচ্চ। কার্যত তালিকা থেকে বাদ পড়াদের মধ্যে হিন্দু বেশি হওয়ায় ইতোমধ্যে দলটির মানসিক শক্তি কিছুটা হোঁচট খেয়েছে। নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর ধর্মভিত্তিক বাঙালি জনগোষ্ঠীর এই সংখ্যানুপাত দলটিকে একপ্রকার বিপদেও ফেলেছে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। আসামকে ‘বিদেশিমুক্ত’ করার পরিকল্পনা থেকেই বিজেপির নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের উদ্যোগ। নাগরিকপঞ্জি প্রকাশসহ সব কিছু বিজেপির চাওয়া হলেও এখন দলটির স্থানীয় শীর্ষ নেতারা ভাবিত হয়ে উঠেছেন অন্য কারণে- সেটি হলো এনআরসির তালিকা ও তাদের প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধান অনেক বেশি। তাই এনআরসি বাস্তবায়নকারী রাজনৈতিক দল ও ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ভাবছে ভিন্ন কথা। তাদের হিসাব ঠিক মিলেনি বলে সুরটিও পাল্টাচ্ছেন। নেতাদের সেই সুরের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে নানা ‘রাজনীতি’র ব্যর্থ কৌশল। বিজেপি শিবিরেই এখন রোষের আগুন দেখা যাচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যানুপাতের উপরোক্ত পরিমাণদৃষ্টে। বিজেপিরই কোনো কোনো নেতা এখন সুর বদলিয়ে বলছেন যে, মুসলমানদের সুবিধা দিতে গিয়ে হিন্দুদের বিপদে ফেলে দেয়া হয়েছে। তারাই আবার প্রকারান্তরে নাগরিকত্ব বিলে সংশোধনী আনতে সক্রিয় হচ্ছেন। কৌশলী অবস্থান নিয়ে তারা আবার প্রচার করছেন যে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে নির্যাতিত সংখ্যালঘুদের ভারতে নাগরিকত্ব দেয়ার প্রতিশ্রæতি বিজেপির আগেই ছিল। আর নাগরিকত্ব বিল সংশোধনীর মাধ্যমে এনআরসিতে বাদপড়া বাঙালি হিন্দু ও অসমীয়াদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে। উল্লেখ্য, এই বিল দ্রুত আনারও প্রতিশ্রæতি দিচ্ছেন আসামের স্থানীয় বিজেপি নেতারা। নাগরিকত্ব বিল কবে কীভাবে আসবে জানি না। অনেক প্রশ্ন থাকলেও নাগরিকপঞ্জির বাইরে থাকায় ভারতীয় নাগরিকত্ব হারিয়ে যারা উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছেন বাঙালি বলে ভারত তাদের সঙ্গে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অত্যাচারের ন্যায় কোনো অমানবিকতার প্রকাশ ঘটাবে না আশা করি।

জন্মভূমি ও মাতৃভূমি ভারত অথচ আশ্চর্য দালিলিক পরিচয়ের কারণে ১৯ লাখের বেশি মানুষ মুহূর্তেই হয়ে গেলেন রাষ্ট্রহীন, উদ্বাস্তু! ‘জননী, জন্মভূমিশ্চঃ, স্বর্গাদপি গরিয়সী!’ বহু-শ্রæত ও বহু-চর্চিত এবং ভারতভূমি থেকে উদ্ভূত কোনো এক অমর কবির শাশ্বত এই বাণী এখন কীভাবে এবং কতটা নিষ্ঠুর ও মর্মবিদারী যন্ত্রণা হয়ে ভারতবর্ষেই হঠাৎ রাষ্ট্রহীন ও উদ্বাস্তু হওয়া সেই সব মানুষকে পীড়িত করছে সে খবর রাজনীতির ফেরিওয়ালাদের কেউ অনুধাবন করতে পারছেন কি? আমরা নিশ্চিত রাজনীতিকরা এ নিয়ে মোটেই ভাবিত নন। রাষ্ট্রহীন ও উদ্বাস্তুর গøানিকর জীবনের যন্ত্রণা থেকে মানুষের মুক্তির জন্য, মানবতার বিজয় ও কল্যাণ নিশ্চিতের জন্য সংগঠিত শুভবুদ্ধির রাজনীতি জয়লাভ করুক।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj