চা’র দোকানের চাচা

শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

টিউশনি শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। মোড়ের কাছে আসতেই পেছন থেকে ডাক এল- ‘কেঠা নিলয় ভাই যায় নাকি? অ নিলয় ভাই আসেন এককাপ চা খাইয়া যান।’ যিনি আমাকে ডাক দিলেন তিনি আমার বাবার বয়সী একজন বয়স্ক মানুষ। তবুও তিনি আমাকে ভাই বলে ডাকেন। তার নাম সবুর মিয়া। মোড়ে তার একটি চায়ের দোকান আছে। আমাকে তিনি অত্যন্ত পছন্দ করেন। কেন পছন্দ করেন সেটা আমার জানা নেই।

আমি ব্যাচেলর। লেখাপড়ার জন্য শহরে এসেছি। নিজের লেখাপড়া চালানোর জন্য আমাকে টিউশনি করতে হয়। প্রতিদিন টিউশনি কিংবা কলেজ শেষ করে এসে সবুর মিয়ার দোকানে চা খাই। তার দোকানে আমার বহু বাকি হয়েছে, তবুও তিনি আমাকে অগ্রাহ্য কিংবা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন না। মানুষের একটা স্বভাব আছে- দেনাপাওনা হয়ে গেলে অবিশ^াস শুরু হয়ে যায়, নিজের ওপর বিশ্বাস কমে যায়। যে টাকা ধার দিয়েছে সে ভাবে- টাকাগুলো দিলাম, পাব তো? না পেলে আদায় কীভাবে করব? আর যার কাছে টাকা পায় সে ভাবে, এতগুলো টাকা শোধ করব কীভাবে? শোধ করতে না পারলে কি হবে?

সবুর মিয়ার কাছ থেকে আমি বেশ কিছুদিন ধরেই বাকিতে চা খাই। তিনি আমাকে টাকার কথা বলেন না। রাতে ঘুম না এলে বাসা থেকে বেরিয়ে মোড়ের কাছে গিয়ে দেখি তার চা’র দোকান খোলা। তিনি চায়ের কাপ ধুচ্ছেন। আমি কাছে যেতেই চমকে উঠেন। বলেন, ‘নিলয় ভাই আফনে এত রাইতে বাইরে কি করেন? রাইত বেরাইতে বাইরে থাহা ভালো না। চুলা বন্ধ করছি মাত্র। তয় কেতলি এহনো গরম আছে। আফনারে এক কাপ চা দেই? চা খাইয়া বাসায় যান।’ বাসায় যেতে যেতে অনেক দেরি হয়। সবুর চাচা গল্প জুড়ে দেন। গল্প যেন শেষ-ই হয় না। তিনি আবার চায়ের চুলো জ্বালান। আমি সিগারেট টানতে আর চা খেতে খেতে তার গল্প শুনি। মাঝেমধ্যেই বলেন, ‘নিলয় ভাই, চলেন একদিন আমার বাসায়! আফনের ভাবি খুব ভালো কইরা হাঁসের গোশত রান্না করতে পারে। একদিন খাইয়া আফনার মন ভইরা যাইবো। কসম আল্লার! আফনে যদি ঝর্নার মা’র হাসের গোশত রান্না খাইয়া আরেকবার খাইতে না চান তা হলে আমি এই দোকানদারি ছাইড়া দিমু!’ আমি হাসিমুখে বলি, ‘যাব একদিন! আপনি যখন বলেছেন তখন অবশ্যই যাব।’ তিনি খুশি হন। সবুর মিয়ার ওপর আমার এক ধরনের মায়া হয়। কেন এই মায়া হয় আমি নিজেও জানি না।

২.

আজ বেশ কয়েক দিন হলো সবুর মিয়াকে দেখছি না। তার চায়ের দোকানও বন্ধ। তিনি আমার কাছের কেউ নন। তারপরও মনের খচখচানিতে তার খোঁজ নিলাম। জানতে পারলাম, তিনি বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমি হাসপাতালে গিয়ে উপস্থিত হলাম। সবুর চাচা আমারে দেখে খুশি হলেন। তার স্ত্রীকে বললেন- ‘তোমারে বলছিলাম না ঝর্নার মা, উনি আসবো? দেখছো আমার কথা সত্যি হলো।’ সবুর মিয়ার পাশে তার মেয়ে বসা। মেয়েটার বয়স বারো তেরো হবে। সবুর মিয়া তার মেয়েকে বললেন, ‘উনাকে গিয়ে সালাম কর। অনেক বড় মনের মানুষ।’ মেয়েটা আমার কাছে এসে কদমবুচি করল। আমি মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বললাম, ‘নাম কি তোমার?’ মেয়েটা বলল, ‘আমার নাম ঝর্না।’ সবুর মিয়া বললেন, ‘ওর মা’র লগে আমার বিয়া হওয়ার পরে ওর মা আমারে ঝর্না দ্যাখবো বলছিল। তাই শখ কইরা মাইয়াডার নাম রাখছি ঝর্না। তয় আমি গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। ‘ঝর্না’ হওনের পর আমগো পাহাড়ি ঝর্না দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। এহন অসুস্থ হইয়া গেছি। শইল্যে বল পাই না। আল্লাহপাক যদি আমারে সুস্থ করেন। তাইলে আমি এইবার ওগো লইয়া ঝর্নার পানি দিয়া গোসল কইরা আমু।’

আমি পকেটে হাত দিলাম। সবুর মিয়া কাছে আমার বেশ কিছু টাকা বাকি ছিল। আমি তার থেকে পাঁচশ টাকা অতিরিক্ত দিলাম। সবুর চাচা বললেন, ‘আরে ভাই আপনে রাখেন তো। আমার যা আছে তাই নিয়া চইলা যাইবো।’ আমি তার কথা শুনলাম না। টাকা দিয়ে বেরিয়ে এলাম হাসপাতাল থেকে। মাঝেমধ্যে হাসপাতালে যেতাম। সবুর মিয়ার খোঁজ খবর নিতাম। তার শ্বাসকষ্ট যেন দিন দিন বাড়ছেই।

একদিন বাড়ি থেকে ফোন এল। আমার খালাতো বোনের বিয়ে। সেখানে যেতে হবে। আমি ব্যাগ গুছিয়ে রওনা হলাম।

৩.

বেশকিছু দিন পরে বাড়ি থেকে ফিরলাম। সবুর মিয়ার চায়ের দোকান এখনো বন্ধ। ভাবলাম একটু খোঁজ নেয়া দরকার। সবুর মিয়া বাড়িতে নেই। বাড়ি তালাবদ্ধ। হাসপাতালের দিকে ছুটলাম। সেখানেও পেলাম না। আরো কয়েকদিন একটু খোঁজখবর নিলাম, কিন্তু সবুর মিয়াকে আর পেলাম না।

আজ সোমবার। কটকটে রোদ উঠেছে। কলেজ থেকে ফিরছি। হঠাৎ থমকে যাই মোড়ে এসে। সবুর মিয়ার দোকান আবার খুলেছে। দোকানের দিকে এগোলাম। সবুর মিয়াকে দেখতে পেলাম না। তার স্ত্রী চা বানাচ্ছেন। পাশে ছোট্ট মেয়েটা চায়ের কাপ ধুচ্ছে। রাবেয়া বানু আমাকে দেখে অবাক হলেন। চা বানানো রেখে বললেন, ‘আরে ভাইজান? আফনে? চা খাইবেন? চা দিমু?’

সবুর মিয়া মারা গিয়েছেন আজ থেকে দুই মাস আগে। মারা যাওয়ার আগে তার স্ত্রী রাবেয়া বানুকে বলেছিলেন- তিনি শেষবারের মতো আমাকে দেখেতে চান। রাবেয়া বানু আমার খোঁজ পাননি। সবুর মিয়া মারা যাওয়ার পর রাবেয়া বানু তার বড় ভাইয়ের কাছে আশ্রয় নেন। কিন্তু বড় ভাই আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় তাকে সে স্থান ত্যাগ করতে হয়। এখন পেটের দায়ে সবুর মিয়ার দোকান চালাচ্ছেন তিনি। মা’কে সাহায্য করছে ফুটফুটে শিশুটা।

আমি চা খাচ্ছি। মানুষ ছুটছে তাদের গন্তব্যে। রাস্তার ঐ পাড়ে প্রেমিক যুগল দাঁড়িয়ে কথা বলছে। মেয়েটা খিল খিল করে হাসছে। গাড়ি ছুটছে, রিকশার টুং টুং আওয়াজ কানে আসছে। রাবেয়া বানু চা বানাচ্ছেন। ঝর্না নামের ফুটফুটে মেয়েটি চায়ের কাপ ধুচ্ছে। কাপ ধোয়ার সময় তার মাথার এলোচুল মুখের ওপর পড়ছে। কপাল ঢেকে যাচ্ছে। একহাত দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে আবার চায়ের কাপ ধুচ্ছে। রাবেয়া বানু হাঁক তুলছেন ‘এই চা গরম, চা গরম!’

:: বাংলাবাজার, সদর, বরিশাল।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj