ফেরত

শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

এ এইচ আজহার

হোস্টেলেই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই পরিবার পরিজন ছেড়ে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় থাকতে হয়েছে হোস্টেলে। অবশ্য হোস্টেলের নিয়মগুলো থেকে মুক্তি পেয়েছি মাধ্যমিকের পর। এরপর থেকে গেল কয়েক বছর মেসে থাকা হয়। মেসের জীবনটাও হোস্টেলের খুব কাছাকাছি একটা জীবন। তবে এখানে নিজের স্বাধীনতা আছে। তাই অনেকটা স্বস্তিও আছে।

হোস্টেলে খাবারের সংকটে পড়তে হতো খুব বেশি। নিয়ম অনুযায়ী তিন বেলা খাবার দেয়া হলেও অধিকাংশ সময় খাবারগুলো খাওয়ার অযোগ্য বলে মনে হতো। তবুও পেটের ক্ষুধায় খেয়েছি কত অখাদ্য। আবার অনেক সময় পড়া না পারায় খাবার বন্ধ করে দিতেন শিক্ষকরা। তখন অখাদ্য কুখাদ্য কিছুই জুটত না কপালে। কারণ, বাকিদেরও বলে দেয়া হতো যাতে আমাকে কিছু খেতে না দেয়। এটাই নাকি পড়া না পারার শাস্তি। তাই কখনো কখনো কারো কাছে হাত পেতেছি। কখনো অনেক কষ্টে কারো মন জয় করে এক পিস বিস্কিট কিংবা একমুঠো ভাত খেয়েছি।

অনেক সময় তিন বেলা খাবার খেয়েও বিকেলের নাস্তার জন্য মনটা হাহাকার করত। কারণ, দুপুর ২টায় ভাত খাওয়ার পর রাত ১০টার আগে হোস্টেল থেকে আর কোনো খাবার দেয়া হতো না। মাঝখানে বিকেলের ছুটির সময় সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে নাস্তা করে নিতো। অধিকাংশ সময় নাস্তা থাকত না আমার। কিন্তু খিদেটা তো আর আমার মর্জিতে চলত না। তাই কখনো নিরুপায় হয়ে সারাটা বিকেল হাত পেতে থাকতাম হোস্টেলের সহপাঠীদের দিকে। কখনো একজনের কাছে না পেয়ে দশজনের কাছেও গিয়েছি। হয়তো সবাই ফিরিয়ে দিয়েছে। কারণ, সবাই জানত আমার কাছে অধিকাংশ সময় নাস্তা থাকে না। তাই আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করেও লাভ নেই। আমার বাড়ি থেকে ভালো-মন্দ কোনো খাবার আসবে না কখনো। তাই অনেক ক্ষুধার্ত বিকেল পার করেছি কেঁদে কেঁদে। যে চোখের পানি সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো দৃষ্টিগোচর হয়নি তখন।

নিজেকে নিতান্তই এতিম মনে হতো তখন। কাঁদতে কাঁদতে কখনো শপথ নিতাম, যেদিন আমার নাস্তা থাকবে, সেদিন যাদের নাস্তা নেই তাদের সঙ্গে ভাগ করে খাবো। আবার কখনো শপথ নিতাম, যারা এতবার হাত পাতার পরেও ফিরিয়ে দিয়েছে, তাদের সঙ্গে আর কখনোই কথা বলব না। কত অভিমান বুকে নিয়ে রাতে ঘুমাতাম পরিবার পরিজন ছাড়া। সেটা সেই ছোট্ট বয়সে কিভাবে সহ্য করেছিলাম আজও ভেবে পাই না।

মনে আছে, কখনো কখনো অনেকের প্লেটবাটি ধুয়ে দেয়ার শর্তে তার বাড়ি থেকে আসা মাছ-মাংসের একটু ঝোল অথবা এক টুকরো আলু পেয়ে সেদিনের খাবারটা খুব তৃপ্তিসহ খেয়েছিলাম। কিন্তু কখনো কখনো সব শর্ত পূরণ করেও মন জয় করতে না পারায় খালি হাতে ফেরত এসেছি।

আজ যখন গরিব প্রতিবেশীদের অপমানিত হয়ে খালি হাতে ফিরে যেতে দেখি, যখন রেললাইনের ছোট্ট বাচ্চাটাকে হাত পেতে বসে থাকতে দেখি; তখন সেদিনের মতো আজও নীরবে চোখের কোণে জল জমে। সত্যি খুব অসহায় হয়ে না পড়লে পৃথিবীর কেউই কারো কাছে হাত পাতে না। প্রতিটি মানুষের আত্মসম্মানবোধ থাকে। শুধু নিরুপায় মানুষ সেটা বিলিয়ে দেন। একটু সহায় খোঁজেন তারা। তাই নিজের সামর্থ্য না থাকলে হাত পাতা মানুষটাকে অন্তত একটু সুন্দরভাবে ফিরিয়ে দিন। একটু হেসে কথা বলুন তার সঙ্গে। এমনো হতে পারে, আপনিই তার শেষ চেষ্টা। এরপর হয়তো বা সে কিছু সময়ের জন্য সবার আড়ালে গিয়ে কাঁদবে। না হই কারো কান্নার কারণ। হয়তো কোনো একদিন এই কান্না আমার আপনার কাছেও ফেরত আসবে ভিন্ন কোনো রূপে।

:: শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj